বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা কামাল আহমেদ। আন্দোলন চলাকালে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বিটিআরসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার ৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। মামলায় একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি জুনাইদ আহমেদ পলককে গতকাল ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। অপর আসামি সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক রয়েছেন।
জবানবন্দিতে কামাল আহমেদ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন চলাকালে ১৮ই জুলাই রাত ৯টার দিকে জুনায়েদ আহমেদ পলক ফোন করে আমাকে বলেন, আমি কেন ইন্টারনেট বন্ধ সংক্রান্ত বিটিআরসি’র নির্দেশনা প্রতিপালন করছি না। এ ছাড়াও সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধ করতে কতো সময় লাগবে তা জানতে চান সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। জবাবে আমি তাকে জানাই ১৫ মিনিট লাগবে। তখন পলক আমাকে বলেন, আমি যেন ইন্টারনেট বন্ধ করে তাকে নিশ্চিত করি। তখন আমি আমার অধীনস্থ জেনারেল ম্যানেজার অপারেশনসদের মাধ্যমে কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় সাবমেরিন ক্যাবল দুটো শাটডাউনের জন্য সরকারি নির্দেশনা জানাই। পরে ১৫ মিনিটের মধ্যে সাবমেরিন ক্যাবল দু’টো শাটডাউন করা হয়। এভাবেই ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীর কাঠগড়ায় বসে আন্দোলন চলাকালে ইন্টারনেট বন্ধের কারণ জানিয়ে বিটিআরসি’র তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার জবানবন্দি দিচ্ছিলেন। তখন ট্রাইব্যুনালে আসামির কাঠগড়ায় বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন আসামি জুনায়েদ আহমেদ পলক। জবানবন্দিতে কামাল আহমেদ বলেন, জুলাই আন্দোলন চলাকালে ১৮ই জুলাই সন্ধ্যা ৭টার পর বিটিআরসি কর্তৃক ‘১৮ জুলাই আইটিসি অপারেশনস’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। উক্ত গ্রুপে ১৮ই জুলাই রাতে বিটিআরসি’র তৎকালীন ডিজি মোস্তাফিজুর রহমান একটি ভয়েস কলের মাধ্যমে ইন্টারনেট শাটডাউনের সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে নির্দেশনা প্রদান করেন। সাবমেরিন ক্যাবলের প্রতিনিধি জনাব আব্দুল ওয়াহাব আমাকে বিষয়টি ফোনে অবহিত করেন। এ ছাড়া বিটিআরসি কর্তৃক পূর্বেই ‘আইআইজি অপারেশনস’ নামে একটি হোয়াটসএ্যাপ গ্রুপ চালু ছিলো। যেখানে বিটিআরসির উপ-পরিচালক মেহেরীন আহসান একটি এসএমএসের মাধ্যমে সকলকেই ইন্টারনেট বন্ধ করে ‘ডান’ লিখে জানানোর নির্দেশনা প্রদান করেন। আমি সাবমেরিন এবং আইআইজি দু স্তরেই ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে অবগত হয়ে অনেকটা অবাক হই। আমি জনাব ওয়াহাবকে শুধুমাত্র আইআইজি লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে সম্মতি দেই। সেদিন রাতে আব্দুল ওয়াহাব আমাকে মোবাইলে ফোন করে জানান যে, বিটিআরসি সাবমেরিন ক্যাবল লেভেলে কক্সবাজার এবং কুয়াকাটায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ শাটডাউনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। ইতিপূর্বে আমার জানা মতে, সাবমেরিন লেভেলে কখনো ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি বিধায় নির্দেশনাটি শুনে আমি হতচকিত হই। তিনি আরও বলেন, একইদিন রাত পৌনে ৯টায় বিটিআরসির ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আমাকে ফোন করে সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধ করার নির্দেশনা প্রদান করেন। খানিকটা পর আব্দুল ওয়াহাব আমাকে জানান সকল আইটিসি অপারেটর এবং আইআইজি অপারেটর তাদের ব্যান্ডউইথ শাটডাউন করেছে। আমি তখন বিটিসিএলে কথা বলি। জানা যায়, বিটিসিএলও তাদের আইটিসি এবং আইআইজি ব্যান্ডউইথ শাটডাউন করেছে। তখন শুধুমাত্র সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যান্ডউইথ চালু ছিল এবং আইআইজি অপারেশনস গ্রুপে সাবমেরিনের ব্যান্ডউইথ বন্ধ না করার বিষয়ে বিভিন্ন অপারেটর কমেন্ট করছিল। কিন্তু পরে দু’টো সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। তিনি আরও বলেন, ২৩শে জুলাই বিটিআরসিতে একটি সভা হয়। সভায় বিভিন্ন অপারেটর, বিটিসিএল, সাবমেরিন ক্যাবল, বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইসিটি বিভাগসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার অংশ নেন। সভা শেষে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। ওই সম্মেলনে রাতের মধ্যেই ইন্টারনেট চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন। এরপর ওই রাতে সাবমেরিন ক্যাবল পর্যায়ে ইন্টারনেট চালু করার নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি। রাত পৌনে ৯টায় সাবমেরিনের ব্যান্ডউইথ চালু করা হয়।
এ ছাড়া ৫ই আগস্ট সকাল ১০টার দিকে পুনরায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের নির্দেশনা দেন বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি মোস্তাফিজুর রহমান। ওইদিন বেলা ১১টায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে দুপুর সোয়া ১টার দিকে সাবমেরিন চালু করার নির্দেশনা দেন তিনি। এরপর সঙ্গে সঙ্গে চালু করা হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন বর্তমানে বিটিসিএল-এ কর্মরত এই কর্মকর্তা।
পলক ফোন করে বললেন আমি কেন ইন্টারনেট বন্ধ সংক্রান্ত নির্দেশনা পালন করছি না
স্টাফ রিপোর্টার
২২ এপ্রিল (বুধবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
