বাংলাদেশে সারমাধ্যমেও ভারী ধাতু পরিবেশ দূষণ মারাত্মক হতে পারে

বাংলাদেশে সারমাধ্যমেও ভারী ধাতু পরিবেশ দূষণ মারাত্মক হতে পারে

ফন্ট সাইজ:

সার হলো জমিতে যোগ করা এক পদার্থ যা মাটিকে দূষিত না করে মাটির উর্বরতা ও ফসলের ফলন বাড়ায়।
বাংলাদেশে বিগত ৮০ দশক থেকে ফসলের ফলন বৃদ্ধির আগ্রহ থেকে সার ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। সেই অবস্থায় বিশেষ করে যশোর অঞ্চলে সারে ভারী ধাতুসহ নানারূপ ভেজাল ধরা পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সন্দেহজনক সার বাজেয়াপ্ত করে সারের জাহাজও আটকে দেয়। সার আইন করে সার ও মাটি পরীক্ষা কাজ জোরদার করতে বলা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় এক্ষেত্রে ব্যাপক ভৌত অবকাঠামোগত ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ সম্পাদিত হয়েছে। সার ও মাটির বৈজ্ঞানিক দিক উপেক্ষা করে কেবল ব্যবসা লাভজনক করার ব্যবস্থাপনাতেই মদত জোগানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সার ব্যবহারের কৃষিতত্ত্বে আমরা সেই আশির দশকের কাছাকাছি রয়ে গেছি যা এখানে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো। ফসলের ফলন বাড়িয়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মিটাতে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও প্রায় ৫০% সারের উপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে সারের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ হলো ইউএস ডলার মরক্কো ১২৬৪ ইউএস চীন ৮৫০, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৬৬৫, কানাডা ৬৪৪ ও যুক্তরাষ্ট্র ৫১৭ কোটির ওপরে। আমদানিকারক দেশকে আমদানির পূর্বে রপ্তানিকারক দেশ থেকে রপ্তানির পূর্বে স্ব স্ব দেশকে অবশ্যই সারের মান-তথ্য সার্টিফিকেট দিতে হবে। বাংলাদেশে আমদানি করা সারের মধ্যে রয়েছে ইউরিয়া, টিঁএসপি, ডিএপি, মিউরেট অব পটাশ, মেগসালফ, জিংক চিলেট ও সালফেট, বোরন সার ইত্যাদি। দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন রাসায়নিক সার যার প্রায় অধিকাংশ আমদানি করতে হয়। দেশের ৬টি ইউরিয়া সারকারখানার মধ্যে ৫টি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সার আমদানির মধ্যে রয়েছে ইউরিয়া (ডিএই) ২৬ লাখ টন। দেশে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন ডিএপি বা ড্যাপ সারের চাহিদা রয়েছে। দেশে বিসিআইসি অধীনস্থ ডিএপি ফার্টিলাইজার কো. বছরে প্রায় ১ লাখ টন উৎপাদন করে। বিএডিসি সৌদি আরব, চীন ও মরক্কো থেকে সম্প্রতি প্রায় ৩ লাখ টন ড্যাপ সার আমদানি করেছে। চলতি বছর বিএডিসি প্রায় ২৭ লাখ টন সার আমদানি করবে, যার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ টন ড্যাপ সার, সাড়ে ৮ লাখ টন এমওপি ও সাড়ে ৬ লাখ টন টিএসপি। বাংলাদেশের কৃষিজমিতে বিশেষ করে ফসফেট সারে (ঞঝচ, উঅচ) কেডমিয়াম (ঈফ), সীসা (চন), ক্রোমিয়াম (ঈৎ) ও নিকেলের (ঘর) মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর মাত্রা উদ্বেগের কারণ হয়ে যাচ্ছে। শিল্পবর্জ্য, উপস্থিত সেচের পানি এবং অপরীক্ষিত নিম্নমানের সারের ব্যবহার থেকে এসব ধাতু মাটিতে জমা হচ্ছে, যা মাঠের ফসল ও সবজি-ফলের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে ক্যান্সার, কিডনি বিকল ও স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য প্রধান প্রধান বিষয়সমূহ হচ্ছে:
উৎস: মূলত ফসফেটিক সার বা ফসফেট শিলা, কীটনাশক ও শিল্পবর্জ্য থেকে ভারী ধাতু মাটিতে ছড়ায়। ঝুঁিকপূর্ণ এলাকা: শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন কৃষিজমি, যেমন বৃহত্তর ঢাকা, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা- সিলেট মহাসড়কের আশপাশের এলাকা।
ফসল: সবজি ও ধানে সিসা ও কেডমিয়াম সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁিক: দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশেষ করে কিডনি ও যকৃতের ক্ষতির আশঙ্কা।
আবশ্যক করণীয়
১. সার আইন ভিত্তিতে সারের মান নিয়ন্ত্রণ ও ভারী ধাতুর বিষয়ে বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশন পদ্ধতি চালু করা।
২. জমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে আমদানিকৃত রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো এবং প্রাকৃতিক জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো। শিল্পবর্জ্য পরিশোধন (ঊঞচ) নিশ্চিত করা।
ভারী ধাতুর ঘনত্বমাত্রা
বাংলাদেশে গবেষণা ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, দেশের উপরিভাগের পানিতে গড় ভারী ধাতুর ঘনত্বমাত্রা লোহা > ক্রোমিয়াম >আর্সেনিক > সিসা > কেডমিয়াম > মার্কারি ক্রমানুসারেও এর মাত্রা ৩.৯৮ পিপিএম থেকে ০.০০৪ পিপিএম-এর মধ্যে। (ঊহারৎড়হসবহঃধষ ঈযধষষবহমবং ঠড়ষ ১৩, উবপ ২০২৩, ১০০৭৮৩. অংংবংংসবহঃ ড়ভ যবধাু সবঃধষ ঢ়ড়ষষঁঃরড়হ রহ ংঁৎভধপব ধিঃবৎ ড়ভ ইধহমষধফবংয.)
ভারী ধাতুর ঘনমাত্রা বাংলাদেশ সরকার কৃষক সহায়তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরিয়া, টিএসপি,ডিএপি, এমওপি সারেও ব্যাপক ভর্তুকি দেয়, যার আওতায় ২০২৫-২৬ বছরে ২৬ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া হ্রাসকৃত মূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ১৫০০০-২৫০০০ কোটি টাকারও বেশি ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কেজিতে ভর্তুকি সারভেদে ২১-৪৯ টাকা। সার আমদানি মোটের প্রায় ৮০%। বাংলাদেশের সার (ব্যবস্থাপনা) আইন ২০০৬ এর মূল বিধান- সার লাইসেন্সিং, মান নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতীয় সার মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন, কারখানা ল্যাবরেটরি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং ভেজাল রোধে পরিদর্শকদের ক্ষমতা প্রদান। বলা আছে- সার কারখানাগুলোকে তাদের উৎপাদনের মান পরীক্ষার জন্য নিজস্ব ল্যাবরেটরি রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমদানি করা সার কোথায় কীভাবে পরীক্ষা হবে তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। সার ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন ২০০৯ এবং ২০১০ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও প্রবিধান প্রয়োগ জোরদার করা হয়েছে, সারের বৈজ্ঞানিক মান অবহেলিত থেকে গেছে। ক্রমবর্ধমান কৃষি চাহিদা মিটাতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাল্ক আমদানি অনুমোদন করে, যার মধ্যে একবারে ১ লাখ টনের বেশি সার আমদানি করা হয়, যা অবিশুদ্ধ সার আমদানি উৎসাহিত করতে পারে। সারের গুণমান বিষয়ে সার ডিলারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক। সার কাঁচামাল ফসফেরিট খনিজবাহী রক ফসফেট দ্রব্যে কেডমিয়াম ও সিসার ঘনত্ব ১.৭৫-২৮০ পিপিএম হতে পারে যা মাটি ও ফসলের মাধ্যমে খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে প্রজন্মের মেধানাশ ঘটাচ্ছে। একটি পুনঃব্যবহারযোগ্য লেড বা সিসা শংকর ব্যাটারি যা প্রায় কোটি সংখ্যক ক্ষুদ্র যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে তা ২৫-৩০% সিসা শংকর এবং ৩৫-৫০% লেড গ্রিড ও লেড ডাইঅক্সাইড থাকে। এ ছাড়াও অল্প পরিমাণে কেডমিয়াম ও আর্সেনিক ব্যবহার করা হয়। চামড়া শিল্পের বিষাক্ত উপজাত দিয়ে খাদ্য খাওয়া পোল্ট্রি লিটার সারের তাৎপর্যপূর্ণ পরিমাণে ক্রোমিয়াম, সিসা, কেডমিয়াম ফসল পরিশোষণ করে খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ ঘটায়। প্রধান ভারী ধাতু- লেড বা সিসা অত্যন্ত দূষিত বর্জ্যের পরিস্থিতিতে ১.১৭ গ্রাম/কেজি পর্যন্ত থাকে। বাংলাদেশে অর্গানোফসফেট কীটনাশক বিশেষ করে ডারসবান ও স্টরবানে উচ্চ মাত্রায় সীসা, ক্রোমিয়াম ও কেডমিয়াম পাওয়া গেছে। জিংক সার বিশেষ করে শিল্প উপজাত জিংক সালফেট, জিংক অক্সাইড থেকে প্রাপ্ত ভারী ধাতুর ট্রেস দূষক থাকে, যার মধ্যে কেডমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিক উল্লেখযোগ্য। জিংক সারে ধাতু দূষক কেডমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিক রয়েছে, যেমন প্রতি ১% জিংকের জন্য ১-১.৫ পিপিএম। বাংলাদেশে সারমাধ্যমে ও ভারী ধাতু পরিবেশ দূষণ মারাত্মক হতে পারে” বিষয়টির সার-সংক্ষেপ ব্যাখ্যা করা হলো। এখন এই সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু পরামর্শ উল্লেখ করা হলো, যাতে দেশে সার ব্যবহার কৃষকের জন্য লাভজনক হতে পারে এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য নতুন প্রজন্মের ক্যান্সার, কিডনি ও যকৃত বিনষ্টের কারণ হবে না। প্রাথমিক সুপারিশগুলো হলো:
১. সার ব্যবহারে কৃষিবিদ মাধ্যমে ন্যূনতম মাত্রায় প্রেসক্রিপশন প্রথা চালু করতে হবে। ২. সার বিক্রয়ের জন্য ডিলারকে লাইসেন্স প্রদানের আবশ্যক প্রাকযোগ্যতা হিসাবে আন্তর্জাতিক চাহিদা মানের অনুরূপ ধাপে ধাপে ১৫ দিন থেকে ১ বছর মেয়াদি (সার ডিপ্লোমা) প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। ৩. সার আইনের সার-মাটি-পানি পরীক্ষা কাজ সত্যিকার অর্থে আপডেট কার্যকর করতে হবে। ৪. সার ব্যবহারের উপর কৃষক অরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। এগুলো হলো প্রাথমিক কাজ, পরবর্তী কার্যক্রম চাহিদাভিত্তিক গ্রহণ করতে হবে।




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন