ইরানের সঙ্গে চুক্তি ইস্যুকে প্রভাবিত করেছে ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ইরানের সঙ্গে চুক্তি ইস্যুকে প্রভাবিত করেছে ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট

ফন্ট সাইজ:

সপ্তাহান্ত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাত সপ্তাহের যুদ্ধ শেষ করার একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তখন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঠিক সেই কাজটিই করলেন, যা তার সহযোগীরা বারবার বলেছেন যে, তিনি করবেন না। সেটা হলো- তিনি যেন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেই আলোচনা চালানোর চেষ্টা করলেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে চলমান আলোচনার বিষয়ে পোস্ট করতে থাকেন এবং শুক্রবার সকালে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার আপডেট দেয়ার সময় কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, ইরান অনেকগুলো শর্তে সম্মত হয়েছে। এগুলো আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো বলছে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তিনি আরও বলেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বিতর্কিত দাবি মেনে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিষয়টিও। তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে যাচ্ছে বলে ঘোষণা দেন।
ইরানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এসব দাবির বেশির ভাগই প্রত্যাখ্যান করেন এবং জানান, তারা নতুন করে আরেক দফা আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন না। ফলে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুত ভেঙে পড়ে। এখন শান্তি আলোচনা কোন দিকে যাবে, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সিএনএনের কাছে স্বীকার করেছেন, প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য মন্তব্য আলোচনার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। তারা বলেন, আলোচনার সংবেদনশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের গভীর অবিশ্বাস বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে আরও একটি সমস্যা যোগ হয়েছে। তাহলো মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, ইরানের আলোচক দলের নেতৃত্বে আছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তাদের সঙ্গে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপসের মতপার্থক্য আছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এই দু’পক্ষের মধ্যে শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে কে অনুমোদন দেবে।

আলোচনার সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি বলেন, ইরানিরা পছন্দ করেনি যে প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চালাচ্ছেন এবং এমনভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করছেন যেন তারা এমন কিছুতে সম্মত হয়েছে, যেগুলো এখনো তারা মেনে নেয়নি। আর যেগুলো তাদের দেশের মানুষের কাছেও জনপ্রিয় নয়। তিনি আরও বলেন, ইরান বিশেষভাবে দুর্বল দেখাতে চায় না।

ট্রাম্প ব্লুমবার্গকে বলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি অসীম সময়ের জন্য স্থগিত করতে রাজি হয়েছে। সিবিএস নিউজকে তিনি বলেন, তেহরান সবকিছুতেই সম্মত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলবে। আবার অ্যাক্সিওসকে বলেন, সপ্তাহান্তে একটি বৈঠক হতে পারে এবং এক-দুই দিনের মধ্যেই চুক্তি হয়ে যাবে।

কিন্তু রোববার পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার একটি ইরানি পণ্যবাহী জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটি জব্দ করে। কারণ জাহাজটি মার্কিন নৌ অবরোধ অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল। ওই জাহাজটি জব্দ করায় ইরান আরও ক্ষুব্ধ হয়। এখন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প আবারও একটি সিদ্ধান্তের মুখে- তিনি কি একটি চুক্তি মেনে নেবেন, তা অসম্পূর্ণ হলেও, নাকি এমন একটি সংঘাত আরও বাড়াবেন, যা তিনি আগে বলেছিলেন ইতিমধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।

সোমবার নাগাদ ইরানের কর্মকর্তারা আরও আলোচনায় অংশ নেয়ার বিষয়ে কিছুটা কম আপত্তিকর মনোভাব দেখিয়েছেন। তবে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট। হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আলোচনার দক্ষতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এতটা ভালো চুক্তির কাছাকাছি আসেনি- ওবামা প্রশাসনের সময়ের খারাপ চুক্তির মতো নয়।
ট্রাম্প আলোচনার জন্য কয়েকটি ‘লাল রেখা’ নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে আছে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। প্রায় বোমা তৈরির উপযোগী এমন মানের উপকরণের মজুদ হস্তান্তর করতে হবে। অন্যদিকে ইরান চায়, তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। প্রথম দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেয়। এর জবাবে ইরান পাঁচ বছরের স্থগিতাদেশের প্রস্তাব দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করে।

সাম্প্রতিক একটি প্রস্তাবে ইরান ১০ বছরের জন্য সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখা এবং পরবর্তী ১০ বছর খুব কম মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ চালানোর কথা বলেছে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো সমৃদ্ধকরণই চান না এবং ২০ বছরের প্রস্তাবের বিরোধিতাও করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানের প্রায় ২০০০ কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার কথাও বিবেচনা করছে। এর বিনিময়ে ইরান তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করবে।

শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ তাদের অবস্থানে কতটা নমনীয় হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে চুক্তি হবে কি না। ট্রাম্পের জন্য একটি বড় বিষয় হলো- এমন কোনো চুক্তি না করা, যা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতো মনে হয়। ২০১৫ সালের চুক্তি থেকে তিনি ২০১৮ সালে সরে এসেছিলেন এবং ওই চুক্তিকে তিনি দুর্বল বলে সমালোচনা করেছেন। তারপরও কমপক্ষে আলোচকরা একটি প্রাথমিক কাঠামো চুক্তি করার আশা করছেন, যা পরে বিস্তারিত আলোচনার পথ তৈরি করবে। তবে সমালোচকরা সতর্ক করছেন, ইরান হয়তো সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে, যাতে তারা যুদ্ধ চলাকালে লুকিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

ট্রাম্প সোমবার বলেন, তিনি কোনো চাপ অনুভব করছেন না, যদিও যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং জ্বালানির দাম বেড়েছে। তিনি ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, আমি কোনো চাপের মধ্যে নেই, যদিও সবকিছু খুব দ্রুতই ঘটবে! সোমবার বিকেল পর্যন্ত এটি পরিষ্কার ছিল না, প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা তাকে তার পোস্টগুলোর কারণে আলোচনায় ক্ষতি হচ্ছে- এমন উদ্বেগ জানিয়েছেন কি না। তবে দুপুরের মধ্যেই তিনি ট্রুথ সোশালে যুদ্ধ নিয়ে ৯০০ শব্দের বেশি লিখেছেন।

তার প্রকাশ্য মন্তব্যগুলো আলোচনার অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
রোববার সকালে এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিরাপত্তাজনিত কারণে এই দফার আলোচনায় অংশ নেবেন না। কিন্তু একই সময়ে তার প্রশাসনের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা- জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এবং জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট টেলিভিশনে বলেন, ভ্যান্সই ইসলামাবাদে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, তারাই ঠিক ছিলেন, ট্রাম্প ভুল ছিলেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতি বদলে গেছে।

পরদিন ট্রাম্প আবার বলেন, ভ্যান্স পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য আকাশপথে রয়েছেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায়, ভ্যান্স হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ে পৌঁছেছেন। এক কর্মকর্তা ব্যাখ্যা দেন, আমরা আশা করছি প্রতিনিধি দল শিগগিরই রওনা দেবে। পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানায়, ভ্যান্স তখন মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। আলোচনাটি বুধবার সকালে ইসলামাবাদে শুরু হওয়ার কথা, যদিও পরিস্থিতি এখনো ‘পরিবর্তনশীল’।

দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। শুরুতে ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬:৩২ (ইস্টার্ন সময়) সময় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, যা মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প পরে বলেন, এটি ওয়াশিংটনের সময় অনুযায়ী বুধবার সন্ধ্যায় শেষ হবে। ফলে আলোচনার জন্য অতিরিক্ত ২৪ ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে।
তবে তিনি এটাও বলেন, যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম।

গত সপ্তাহে তিনি এ বিষয়ে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করেন। একবার বলেন, চুক্তি না হলে যুদ্ধ আবার শুরু হবে। আবার বলেন, প্রয়োজন হলে তিনি সময় বাড়াতে পারেন। আরেকবার বলেন, দেখা যাক, হয়তো প্রয়োজনই হবে না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন