যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আর যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠন তার থেকেও বেশি ব্যয়বহুল। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ৮৯ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। অন্যদিকে ইসরাইল এ পর্যন্ত মোট ১১২০ কোটি ডলার খরচ করেছে। এর মধ্যে প্রথম ২০ দিনেই ব্যয় হয়েছে ৬২০ কোটি ডলার। আর যুদ্ধপরবর্তী খরচ- বিশেষ করে সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো মেরামতে ৬০০০ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে। এর মধ্যে শুধু তেল ও গ্যাস স্থাপনা পুনরুদ্ধারেই লাগবে প্রায় ৫০০০ কোটি ডলার বলে জানিয়েছে রিস্টাড। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুবাইয়ের দ্য ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলের মতো বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি ফুজাইরাহ তেল রপ্তানি টার্মিনালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানির কেন্দ্র ছিল এটি।
ধ্বংসাবশেষ আঘাত হেনেছে অ্যামাজনের দুটি ডাটা সেন্টারেও। ফলে ব্যাংকিং সংক্রান্ত ক্লাউড সার্ভিস ও কম্পিউটিং সুবিধা পুরো অঞ্চলে ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আর্থিক ‘ব্যাকস্টপ’ বা নিরাপত্তা তহবিল নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান খালেদ মোহাম্মদ বালামা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সঙ্গে একটি মুদ্রা বিনিময় চুক্তির প্রস্তাব দেন। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেল-গ্যাস অবকাঠামোর ক্ষতি এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধের কারণে ডলারের আয় কমে যাওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
‘ব্যাকস্টপ’ বলতে বোঝায় এমন একটি আর্থিক সুরক্ষা, যেখানে বড় কোনো অংশীদার, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, তারা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তার নিশ্চয়তা দেয়। আর ‘কারেন্সি সোয়াপ’ বা মুদ্রা বিনিময় হলো এমন একটি চুক্তি, যেখানে এক মুদ্রার মূলধন ও সুদের বিনিময়ে অন্য মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ডলারে ঋণ দিতে পারে এবং আমিরাত দিরহাম বা অন্য কোনো মুদ্রায় তা পরিশোধ করতে পারে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অনুরোধ করা হয়নি, তবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমিরাতের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন- এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই শুরু করেছে। ফলে ক্ষতির দায়ও তাদের নিতে হবে।
যুদ্ধের খরচ কে দেবে?
এই ব্যাকস্টপ প্রস্তাবটি রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক। কারণ ৩০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে যুদ্ধের খরচ আদায়ের বিষয়টি বিবেচনা করছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানান, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এ ধরনের পরিকল্পনায় ‘খুবই আগ্রহী’। এর আগে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে সৌদি আরব ১৬৮০ কোটি এবং কুয়েত ১৬০০ কোটি ডলার দেয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজে মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ ব্যয় বহন করে। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই প্রস্তাব সেই চিত্র উল্টে দিতে পারে। অর্থাৎ এবার যুক্তরাষ্ট্রকেই যুদ্ধের খরচ দিতে বলা হচ্ছে। এটি এমন সময়ে আসছে, যখন ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়ছে। কারণ এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কেও ফাটল ধরিয়েছে।
এতে ওয়াশিংটনের জন্য ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ, যদি যুক্তরাষ্ট্র আমিরাতকে সহায়তা দেয়, তাহলে কাতার, সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও একই দাবি তুলতে পারে। বিশেষ করে ইরানের হামলায় কাতারের প্রায় ১৭ শতাংশ এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এবং সৌদি আরব রাস তানুরা তেল শোধনাগার আংশিক বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার পর এই দাবি উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
এ ধরনের ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক যুদ্ধ খরচ আরও বাড়াবে এবং ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, ডলার বিশ্বে প্রধান মুদ্রা হিসেবে টিকে আছে মূলত তেল-গ্যাস লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হওয়ায়। আমিরাত ইতিমধ্যে চীনা ইউয়ানে লেনদেনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে চীন গত বছর আমিরাতে দ্বিতীয় ইউয়ান ক্লিয়ারিং ব্যাংক চালু করার পর। কয়েক বছরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের আর্থিক সহযোগিতা বাড়ছে। কারণ বেইজিং বিশ্বের প্রধান জ্বালানি অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায়।
ইরানের ২৭০০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি
অন্যদিকে ইরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তেহরান অভিযোগ করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার এবং জর্ডান এই দেশগুলো যুদ্ধে জড়িত থেকে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন করেছে। ইরান ২৭০০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। যা রাশিয়ার আরআইএ নভোস্তি সংবাদ সংস্থাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি এক সরকারি মুখপাত্র উল্লেখ করেন। এর পাশাপাশি ইরান চায়, হরমুজ প্রণালির ওপর তার কর্তৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেতে, যাতে তারা জাহাজ থেকে টোল আদায় করতে পারে। এই কর্তৃত্ব স্বীকৃতি পেলে ইরানের জন্য এটি বিশাল আয়ের উৎস হতে পারে। প্রতি জাহাজে ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ ডলার হিসেবে শুধু তেলবাহী ট্যাংকার থেকেই মাসে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার আয় সম্ভব।
যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনীতির হিসাব
শেষ পর্যন্ত সবকিছুই অর্থনীতির হিসাব। সৌদি অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আলজাদান জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ‘সপ্তাহ নয়, মাসও লাগতে পারে’। তিনি বলেন, ট্যাংকার শিডিউল করা এবং সাম্প্রতিক বিশৃঙ্খলার পর সেগুলো ফিরিয়ে আনা- এসব প্রক্রিয়া জুনের শেষ পর্যন্ত সময় নিতে পারে।’ যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, যা বারবার ভেঙে পড়ার মুখে, তা ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয় দফা এই সপ্তাহে হওয়ার কথা থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলো তাতে বড় অগ্রগতির ব্যাপারে সতর্ক। ওয়াশিংটনে আইএমএফ বৈঠকে আলজাদান বলেন, যুদ্ধের সমাপ্তি এমন হতে হবে যাতে সব পক্ষ, বিশেষ করে শিপিং কোম্পানি ও সামুদ্রিক বীমা সংস্থাগুলো বিশ্বাস করতে পারে যে সংঘাত আবার শুরু হবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আপনাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, আপনাদের অর্থনীতি ও জনগণকে প্রস্তুত রাখতে হবে। কারণ এই পরিস্থিতি আপনারা যতটা ভাবছেন তার চেয়ে বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
