বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হতে পারে মোবাইল নেটওয়ার্ক

সহযোগীদের খবর

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হতে পারে মোবাইল নেটওয়ার্ক

ফন্ট সাইজ:

বণিক বার্তা

দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হতে পারে মোবাইল নেটওয়ার্ক’। প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি তেলের সংকটের পাশাপাশি দেশজুড়ে লোডশেডিংও তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কোনো কোনো স্থানে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।

চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় অনেক এলাকায় জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না। জনজীবনের পাশাপাশি এমন পরিস্থিতিতে সংকটে পড়ার কথা জানিয়েছেন দেশের মোবাইল অপারেটররা। পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর’ ও ‘ক্রমবর্ধমান’ সংকট বলে অভিহিত করেছে দেশের মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগসেবা বজায় রাখা সম্ভব হবে না বলে মনে করছে সংগঠনটি।

পরিস্থিতি তুলে ধরে শনিবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি। অ্যামটবের দেয়া চিঠি প্রাপ্তির বিষয়টি গতকাল বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। অ্যামটব মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়, ‘পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ছাড়া টেলিযোগাযোগসেবা চালু রাখা আর সম্ভব নয়।’ চিঠিতে দেশব্যাপী মোবাইল নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়া ঠেকাতে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সব মোবাইল অপারেটরদের অংশগ্রহণে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভা আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিদ্যুতের সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দিনের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল বেলা ৩টায়। ওই সময় সারা দেশে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন ঘাটতি ছিল। আর গত বৃহস্পতিবার দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯২৩ মেগাওয়াট।

অ্যামটবের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোবাইল বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) চালু রাখতে দেশের প্রধান তিন অপারেটর কোম্পানির দৈনিক ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন প্রয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম অপারেটর গ্রামীণফোনের দরকার হয় ২৮ হাজার ৭৯ লিটার ডিজেল ও ৯ হাজার ২৫৪ লিটার অকটেন। রবি আজিয়াটার ১৩ হাজার ১৪০ লিটার ডিজেল ও ৫ হাজার ৬১০ লিটার অকটেন এবং বাংলালিংকের প্রয়োজন হয় ১১ হাজার ২০৬ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৯৯৫ লিটার অকটেন।

পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনা বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং মোকাবেলায় আমাদের বেস স্টেশনগুলো সচল রাখতে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এজন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন। কিন্তু এ সমাধান দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও পরিচালনাগতভাবে টেকসই নয়। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম ও মাঠপর্যায়ে পরিবহন জটিলতা নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ফিডারগুলোতে টেলিকম অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে না, যা সেবা সচল রাখাকে আরো কঠিন করে তুলছে। ফলে নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং সেবার মানে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ অবস্থার উন্নতি না হলে নেটওয়ার্কের মান কমে যাওয়া বা সাময়িক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি রয়েছে। আমরা নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাই।’

বর্তমানে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে মোবাইল অপারেটরদের ডিজেলচালিত জেনারেটরের সাহায্যে বিটিএস সাইট ও ডেটা সেন্টারগুলো চালু রাখতে হচ্ছে। অ্যামটব জানিয়েছে, জেনারেটর চালিয়ে একটি ডেটা সেন্টার চালু রাখতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০-৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এভাবে লোডশেডিংয়ের কারণে বর্তমানে প্রতিদিন একটি ডেটা সেন্টার সক্রিয় রাখতে প্রায় ৪ হাজার লিটার ডিজেল দরকার হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় জ্বালানি স্টেশনগুলো এ পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করতে পারছে না।

ডেটা সেন্টার/সুইচিং সেন্টার সচল রাখতে প্রতিদিন দেশের মোবাইল অপারেটরদের প্রয়োজন হচ্ছে ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের প্রয়োজন হচ্ছে ১১ হাজার ১৮৪ লিটার, রবির ৯ হাজার ৭৩২ লিটার এবং বাংলালিংকের ৮ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন টেলিকমসেবা বজায় রাখতে সময়োপযোগী এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। টেলিকম অবকাঠামোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি। এর মধ্যে রয়েছে ডেটা সেন্টার, সুইচিং ফ্যাসিলিটিজ এবং বেস স্টেশনগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি সরবরাহের প্রক্রিয়া সহজতর করা। এছাড়া জরুরি কার্যক্রমের জন্য জ্বালানি পরিবহনে সহায়তা প্রদান—যাতে কোটি কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় এ সেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে।’

দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে (ফেব্রুয়ারি) ১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের। আর মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে প্রায় ১১ কোটি মানুষ।

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান বলেন, ‘চলমান জ্বালানি সংকট নেটওয়ার্ক পরিচালনার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। বাস্তবে টেলিযোগাযোগকে একটি অগ্রাধিকারমূলক পরিষেবা হিসেবে গণ্য করতে হবে, যেখানে জরুরি অবকাঠামোর জন্য নিশ্চিত বিদ্যুৎ এবং সহজলভ্য জ্বালানি সরবরাহ থাকবে। নেটওয়ার্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অর্থনীতির ডিজিটাল মেরুদণ্ডকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এটি অপরিহার্য। বর্তমানে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’

বিটিআরসিকে দেয়া অ্যামটবের চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের পরিচালনগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার আসন্ন ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের অচলাবস্থা জরুরি পরিষেবা, দুর্যোগ মোকাবেলা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়, আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

অ্যামটব আরো জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং ব্যাকআপ সিস্টেমের জন্য নিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে অপারেটররা মারাত্মক পরিচালনগত সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড় পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করেছে। ঝড়ের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দীর্ঘ হচ্ছে।

অ্যামটবের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকদিন ধরে বাণিজ্যিক গ্রিডের ডাউনটাইম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ডিজেল জেনারেটরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় অ্যামটব বিটিআরসি চেয়ারম্যান বরাবর চিঠিতে কিছু বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্যে আছে প্রধান এমএনও ডেটা সেন্টার এবং জরুরি স্থাপনাগুলোয় পরিষেবা প্রদানকারী সংযুক্ত ফিডারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সংকটের সময়ে দেশব্যাপী সব মোবাইল বেস স্টেশনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা, প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ডিপো থেকে এমএনওদের নির্ধারিত পয়েন্টে সরাসরি ও জরুরি জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা এবং জরুরি টেলিকম অপারেটরদের জন্য বাধাহীন জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া।

জানতে চাইলে অ্যামটব মহাসচিব লে কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ বা জ্বালানির অভাবে মোবাইল অপারেটরদের ডেটা সেন্টার বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে এর প্রভাব খুব দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে। নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ হলে কল, ইন্টারনেট, এসএমএসসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। ইন্টারনেট ডাউন বা খুব স্লো হয়ে যেতে পারে। কারণ ডেটা সেন্টার থেকেই ট্রাফিক রাউটিং ও কন্ট্রোল হয়। ওটিপি, ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স সেবা ইত্যাদি অর্থাৎ যেসব সেবা মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় সেসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অপারেটরদের ব্যাকআপ থাকে কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে কতটুকু ব্যাকআপ দেয়া সম্ভব হবে তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ডেটা সেন্টারই নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর মস্তিষ্ক—এটা বন্ধ মানে সমগ্র নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া।’

দেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগসেবা বজায় রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে সরকারের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘টেলিকমিউনিকেশন একটি জরুরি সেবার অংশ হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং সেখান থেকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। কীভাবে এ সমন্বয় জোরদার করে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে। সব মিলিয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’


প্রথম আলো

‘পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ছে’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ানোর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন খাতে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীমুখী পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাকভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও ট্রাকভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও ভাড়া বাড়াতে দর-কষাকষি চলছে।

এর ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে এবং জীবনযাত্রার খরচ আরেক দফা বাড়বে।

প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম গতকাল রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।

গতকাল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে দাম বাড়ল ২১২ টাকা। চলতি মাসে এ নিয়ে দুবার দাম বাড়ানো হলো।

মূলত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরোক্ষ শর্তে দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ানো হয়।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে গতকাল রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে নিজ দপ্তরে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, না-ও বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম যতটুকু বেড়েছে, সেটি বেশি নয়, মূল্যস্ফীতির ঝুড়িতে জ্বালানি তেলের অংশ সামান্য।’

পরিবহনভাড়া বাড়ানো শুরু

দেশের অন্যতম প্রধান পণ্য পরিবহন রুট হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে সারা দেশে পণ্য পরিবহন হয়।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানিসংকটের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহনভাড়া ট্রাকপ্রতি এমনিতেই গড়ে ১০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। গতকাল থেকে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকরের ফলে পণ্য পরিবহন খরচ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি অনিল চন্দ্র পাল।

অনিল চন্দ্র গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিল। কিছুদিন ধরে সংকট চলায় এই ভাড়া ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে রোববার থেকে ডিজেল পাওয়া যাবে। এ খবরে ভাড়া ২০-২২ হাজার টাকার আশপাশে নেমেছে। তবে তেল পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বলা যাবে পরিবহন খরচ কত হবে।’

কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে সারা দেশে চাল আসে। এত দিন খাজানগর মোকাম থেকে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জে ট্রাকভাড়া ছিল ১৮-২০ হাজার টাকা। গত শনিবার পর্যন্ত এই ভাড়ায় রাজধানীতে চালের ট্রাক এসেছে। গতকাল থেকে ট্রাকপ্রতি ভাড়া দেড় হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রথম আলোকে বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বাড়বে।

বগুড়ার মহাস্থান হাট হলো দেশের অন্যতম বড় সবজির পাইকারি হাট। সেখান থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে সবজির চালান যায়। বগুড়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৫ টনের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৬-১৮ হাজার টাকা। গতকাল ট্রাকভাড়া ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি চাওয়া হয়েছে। আজ সোমবার থেকে বর্ধিত ট্রাকভাড়া কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

মহাস্থান হাটের সবজির পাইকারি আড়তদার মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর ট্রাকভাড়া এখনো বাড়ানো হয়নি। তবে সোমবার থেকে বর্ধিত ট্রাকভাড়া কার্যকর হবে।

বগুড়ার ট্রাকমালিক উজ্জ্বল শেখ বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। তবে বর্ধিত ভাড়া এখনো কেউ দিচ্ছেন না। বর্ধিত ভাড়া চাইলে পণ্য পরিবহনে কেউ রাজি হচ্ছেন না।

এদিকে যাত্রী পরিবহনের জন্য বাসভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত না হলেও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে যাত্রীবাহী লঞ্চভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থা। গতকাল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘পাম্পে তেল সরবরাহ বাড়ছে আজ থেকে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশাখের তীব্র গরমে তেলের জন্য রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা গতকালও ছিল আগের মতোই। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর যারা তেলের নাগাল পেয়েছেন তাদের বাড়তি দামেই তা কিনতে হয়েছে। তবে দুর্ভোগ লাঘবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আজ থেকে সারা দেশে পাম্পে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যমান জ্বালানি সরবরাহের চেয়ে বাড়তি ২০ শতাংশ অকটেন এবং ১০ শতাংশ পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

এর ফলে সরবরাহ বেড়ে দাঁড়াবে অকটেন ১৪২২ টন, পেট্রোল ১৫১১ ও ডিজেল ১৩০৪৮ টন। বর্তমানে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি প্রতিদিন গড়ে ডিজেল বিক্রি করে ১২ হাজার ৭৭৭ টন, পেট্রোল ১ হাজার ৪৯৬ টন, অকটেন ১ হাজার ১৯৩ টন এবং জেট ফুয়েল ১ হাজার ৫৪৭ টন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এতে করে তেলের সংকট অনেকটা কমে আসবে। মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসান এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেছেন, সরকারের নতুন নির্দেশনা এসেছে। সোমবার থেকে সব পেট্রোলপাম্প এবং সব ধরনের ডিলারকে আগের চেয়ে বাড়তি তেল দেওয়া হবে। রাজধানীর বিশ্বরোড এলাকার পেট্রোলপাম্প পিনাকল এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুশ শাকুর গতকাল যুগান্তরকে বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছে না বিতরণ কোম্পানিগুলো। দুই ভাউচার তেলের টাকা দিয়েও রোববার পাওয়া গেছে এক ভাউচার অকটেন। যা রাত ৮টার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সরকার ৩-৪ দিন চাহিদামতো তেল দিলে সংকট অনেকটা কেটে যেত। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এমডি শাহীরুল হাসান বলেছেন, ২০ ভাগ অকটেন এবং পেট্রোল ও ডিজেল ১০ ভাগ বেশি সরবরাহ করা হলে সংকট কেটে যাবে।

এদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা করছে। তবে বিপিসির হিসাব অনুযায়ী রোববার থেকে তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের বাড়তি আয় হবে মাসে ৭৭৩ কোটি টাকা। এর পরও বিপিসির লোকসানের বোঝা হালকা হবে না। কারণ বাড়তি দামের পরও মাসে বিপিসিকে লোকসান দিতে হবে ১ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। শনিবার রাতে সরকার ডিজেল প্রতি লিটার ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে। বিপিসি সরকারকে জানিয়েছে, ডিজেল বিপিসিকে কিনতে হয়েছে প্রতি লিটার ১৫৫ দশমিক ৪৬ টাকা, অকটেন ১৪৮ দশমিক ৯৩ টাকা এবং পেট্রোল ১৪৪ দশমিক ৯৩ টাকা। এপ্রিলে এই দাম আরও বেশি।

শীর্ষ পর্যায়ের সূত্র থেকে জানা গেছে, ৮ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য রহমান অমিত, জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলামসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যথাশিগগির সম্ভব তেলের দাম বৃদ্ধি করা হবে। সেই সিদ্ধান্ত নানা দিক বিবেচনা করে কার্যকর করা হয়েছে ১৯ এপ্রিল থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপিসি গত অর্থবছরে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা লাভ করেছে। আগের বছরে লাভ করেছে ৪ হাজার কোটি টাকা। আর তেল বিক্রি করে তিন বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনা প্রতি বছর লাভ করে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো (তিন কোম্পানি মিলে)। শুধু তাই নয়, ওই তিন কোম্পানির স্টাফরা প্রতি বছর লভ্যাংশের বোনাস নেন ৬ লাখ টাকা থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর পরও তেলের দাম কেন বাড়ানো হলো তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করেছেন।

বিশেষ করে হঠাৎ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের আমদানি নিয়ে আবারও চিন্তিত বিপিসি। এই প্রেক্ষাপটে পাম্প এবং ডিলারদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে পারছে না সরকারি এ প্রতিষ্ঠান। শনিবার থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। চলতি সপ্তাহে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা সমাঝোতা বৈঠক হতে পারে ইসলামাবাদে। যদিও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমাঝোতা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ না হলে সমূহ বিপদ বাংলাদেশের জন্য। তখন বিশ্ববাজার থেকে তেল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে কোনোভাবে হলেও তেলের মজুত ৯০ দিন পর্যন্ত করা হবে।

এজন্য বিআরটিসি, চট্টগ্রাম বন্দর, বিদ্যুৎ বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের ট্যাংক খালি করা হচ্ছে। সেখানে জ্বালানি তেল রাখার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বিপিসিকে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা হচ্ছে। এজন্য বিপিসির তেলের আমদানিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিপিসির তেল আমদানিতে স্বচ্ছতা আনতে এলএনজি ক্রয়ের মতো চাহিদামতো দরপত্র করা হবে। যাতে করে তেলের দাম প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া যায়।

কালের কণ্ঠ

‘অর্থকষ্টে’ সরকার!-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় নেই। ফলে বাড়ছে ঘাটতির অঙ্ক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমফের ঋণের কিস্তিও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না শর্ত পূরণে ব্যর্থতায়। সরকারের তহবিলে ‘হাতখুলে’ খরচের টাকা নেই।

তাই ধারকর্জই এখন ভরসা। এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও চাওয়া হয়েছে সোয়া তিন বিলিয়ন ডলারের ঋণ। এদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম লাগামহীন বাড়তে থাকায় সরকারের পক্ষে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রির সুযোগ কমে আসায় বাধ্য হয়ে দেশের বাজারেও দাম বাড়াতে হয়েছে।

এরই মধ্যে আসছে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেটের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু আয় না থাকলেও ঠিকই সরকারকে খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ঋণের সুদও দিতে হচ্ছে কড়ায়গণ্ডায়। তথ্য-উপাত্ত বলছে, সব মিলিয়ে সরকার ‘মধ্যবিত্তের সংসার’ চালানোর মতো এখন অনেকটাই ‘অর্থকষ্টে’ আছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড—এনবিআরের চলতি অর্থবছরের আট মাসের তথ্য বলছে, রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে রাজস্ব আয়। বাকি চার মাসে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা আদায়ের প্রয়োজন হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়নি। অথচ লক্ষ্য পূরণে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় করার কথা।

আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক—তিনটি প্রধান খাতেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বিশেষ করে আয়কর খাতে বড় ঘাটতি দেখা গেছে। করদাতাদের বড় অংশ এখনো কর নেটের বাইরে রয়েছে। প্রায় এক কোটি ২৮ লাখ টিআইএন-ধারীর মধ্যে মাত্র ৪৬ লাখ রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা কর ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। এর বাইরেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আমদানি শুল্ক না পাওয়া, ব্যবসা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্লথগতির জন্য ভ্যাট আদায় কম হওয়ার কারণেও এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ে।

কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো সরকারের আয় কমে গেলেও খরচ ঠিকই করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানান খাতে কৃচ্ছ্রসাধনের পরও মোটা টাকাই খরচ হয়। যেহেতু রাজস্ব আয় ঠিকমতো হচ্ছে না, তাই সরকার বাধ্য হয়েই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ধার করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ঘাটতি মেটাতে সরকার ক্রমেই ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অর্থবছরের ৯ মাসেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ প্রায় এক লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও হবে না। পরিণামে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরো কমিয়ে দেবে।

ইত্তেফাক

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি’। খবরে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পালটে দিয়েছে অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে এর প্রভাব পড়বে না। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই পড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়ে। এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি পণ্যের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং এর সঙ্গে পরিবহন, সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য ও ব্যবহার্য পণ্য, ওষুধ, নির্মাণশিল্প, পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প—সব খাতের ভোক্তা ও ব্যবহারকারী সম্পর্কিত। অর্থাত্ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতির সব খাতে। এদিকে রপ্তানিকারকরা এখন উদ্বিগ্ন উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকা নিয়ে। উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বাড়তি দাম পণ্যের ওপর সমন্বয় করতে চাইবেন। যার ধাক্কা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। কারণ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যার প্রভাবে পণ্য বিক্রিও কমে যায়। ফলাফল দেশের সার্বিক অর্থনীতির গতি কমে যায়।

অয়েল প্রাইস ডট কমের তথ্যানুযায়ী গতকাল রবিবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্র্যান্ড ক্রুড) দাম ৯০ দশমিক ৩৮ ডলারে নেমেছে। যুদ্ধবিরতির আগে এর দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ৫০ দিন পেরিয়ে গেছে। যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে তেলের উত্পাদনও কমে গেছে। যে পরিমাণ তেল কম উত্পাদিত হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য বিপুল। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সময় যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কম উত্পাদিত হয়েছে, তার মূল্য ৫ হাজার কোটি ডলার। স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর প্রভাব আগামী কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত অনুভূত হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৮০ সালের পর পঞ্চম বারের মতো ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের সাধারণ মানুষ নানা সংকটে জর্জরিত। করোনা মহামারির ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিরতা সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই অবস্থাকে সংকটে রূপ দিল। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত হাজার মাইল দূরে হলেও এর উত্তাপ এসে পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। ইতিমধ্যে দেশের বাজারেও জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা ও পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক এই সংকট কতটা প্রভাব ফেলছে, তার হিসাবনিকাশ হচ্ছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বাড়লে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে আরো উঠে এসেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হবে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বাড়তে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে গিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেবে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।

নয়া দিগন্ত

‘জ্বালানি নিয়ে সংসদে উত্তাপ’-এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে গতকাল উত্তাপ ছড়িয়েছে জাতীয় সংসদে। সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সঙ্কট না থাকার কথা বলা হলেও তা বাস্তব সম্মত নয় বলে দাবি করেছেন বিরোধী সংসদ সদস্যরা। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা প্রশ্ন রেখেছেন জ্বালানি সঙ্কট না থাকলে তাহলে পাম্পের সামনে লম্বা লাইন কেন?

গতকাল সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, অথচ বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তায় তেলের জন্য তিন কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভাররা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। সরকারের যদি কোনো সঙ্কটই না থাকে তবে এই লম্বা লাইন কেন? কেন তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে?

রুমিন ফরাহানার এ বক্তব্যের সময় সরকার দলীয় পক্ষ থেকে হট্টগোল শুরু হয়। এ সময় রুমিন ফারহানার মাইক বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে এ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানও সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের আচারণ নিয়ে সমালোচনা করেন।

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সময় বিএনপির এমপিদের হট্টগোল: নিন্দা জানালেন বিরোধীদলীয় নেতা

জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য চলাকালে ট্রেজারি বেঞ্চ (সরকার দলীয়) থেকে হট্টগোল ও নানা অঙ্গভঙ্গির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সময় ট্রেজারি বেঞ্চের কিছু সদস্যের অশালীন অঙ্গভঙ্গি তার বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

গতকাল রোববার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে এমন ঘটনা ঘটে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

অধিবেশনে একাত্তর বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের সঙ্কট নিয়ে ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জ্বালানি পরিস্থিতির প্রকৃত তথ্য সংসদে তুলে ধরার দাবি জানিয়ে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই, অথচ বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তায় তেলের জন্য ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভাররা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছে না। সরকারের যদি কোনো সঙ্কটই না থাকে, তবে এই লম্বা লাইন কেন? কেন তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে?

জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার মার্কেট প্লেস রাত ৮টার পরিবর্তে ৭টায় বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অদূরদর্শী। মানুষ কেনাকাটা সাধারণত সন্ধ্যার পরেই করে। এ ছাড়া অফিস-আদালতের কর্মঘণ্টা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘জ্বালানির জ্বালা ঘরে-বাইরে’। খবরে বলা হয়, জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫-২০ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণার পর থেকে সর্বত্র একধরনের অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ঘোষণা এল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বৃদ্ধির। সেটাও বেশ বড় বৃদ্ধি, ১৭ দিনের ব্যবধানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৫৯৯ টাকা। সামনে বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

জ্বালানির বাড়তি দামের অভিঘাত পড়বে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি পর্যন্ত। ধাপে ধাপে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। আর সবটাই শেষ পর্যন্ত যাবে ক্রেতা-ভোক্তার পকেট থেকে।

অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা করছেন, যখন মানুষের আয় স্থবির এবং অনেকের ক্ষেত্রে সংকুচিত হচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় ভোগ্য ও সেবাপণ্যের বাড়তি দাম—মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। এই বাস্তবতায় ধীরে ধীরে ভোগ সংকুচিত হলে সামগ্রিক অর্থনীতি ভারসাম্য হারাতে পারে; যা দেশের সাম্প্রতিক বছরগুলোর নিম্নতর প্রবৃদ্ধিকে আরও নিম্নমুখে ঠেলে দেবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গতকাল রোববার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জ্বালানি প্রায় সব খাতের প্রধান উপকরণ। এর মূল্যবৃদ্ধি একটি ক্লাসিক “কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন” তৈরি করে। এতে পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।’

যদিও এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সরকার মূল্যবৃদ্ধি না ঘটালেও দেশে যে প্রবণতা চলছে, তাতে মূল্যস্ফীতির চোখ রাঙানি ঠেকানো যেত না। আবার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সরকারের হাতে এর বিকল্পও ছিল না।

পরিবহন খাত ইতিমধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রথম এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, কোনো কোনো পরিবহন গতকাল থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ায় আমাদের খরচ ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় ভাড়া না বাড়িয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়।’

ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। বাজারে আগে থেকে পণ্যের দাম চড়া। এখন এই বাড়তি পরিবহন ব্যয়ও পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এক সবজি বিক্রেতা জানালেন, শনিবার মধ্যরাত থেকে পাইকারি দামে কেজিপ্রতি ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাছ ও মাংসের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চাল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ধীরে ধীরে বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দেশ রূপান্তর

‘তেলের ধাক্কা নানা খাতে’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল নিয়ে চরম ভোগান্তি আর বিশৃঙ্খলার মধ্যেই গত শনিবার সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার। সেই সঙ্গে এ মাসেই দুই দফায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বেড়ে গেছে লোডশেডিং। ব্যাহত হচ্ছে কারখানার উৎপাদনও। তেলের বাড়তি দাম আর সরবরাহ নিয়ে চিন্তিত কৃষক। পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে আগেই। এখন গণপরিহনের ভাড়া বৃদ্ধিরও তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান যুদ্ধের জের ধরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই গণপরিবহন ও বাজারসহ সব খাতেই মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং সেটি হলে বর্তমান ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি’ আরও বেড়ে জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে এবং তেল সরবরাহ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দাম বাড়ালেও তেলের সরবরাহ বাড়বে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি সরকারকে আপাতত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় থেকে সামান্য স্বস্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও দেশের অর্থনীতি আরও কতটা চাপের মুখে পড়তে হবে, তা এখনো অজানা।

ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের পেট্রোলপাম্পগুলোতে তেল সংকট তীব্র হতে শুরু করে এবং এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ আসছে। ঢাকাসহ সারা দেশেই পেট্রোলপাম্পগুলোতে তীব্র ভিড় দেখা যাচ্ছে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে। যদিও সরকার বরাবরই বলে আসছিল যে, তেলের কোনো সংকট নেই।

জীবনযাত্রাকে সহনীয় করতে বিকল্প উদ্যোগগুলো না নিলে মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরেনাম ‘চিকিৎসা মেলে বাগানে’। খবরে বলা হয়, সকাল ১০টা। রাজধানীর প্রাচীনতম স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টারে লম্বা সিরিয়াল। মধ্যবয়স্ক এক নারী প্রত্যেক রোগীর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলছেন, এখানে চিকিৎসা নিতে দেরি হবে। বাগানে যান। ওখানে সব ব্যবস্থা আছে। মধ্যবয়স্ক ওই নারীর কথার সূত্র ধরে খোঁজা হয় ওই বাগান। পিছু নেওয়া হয় তার। গিয়ে দেখা যায় মূলত ওই নারী হাসপাতালের ফুলবাগানকে বুঝিয়েছেন।

যেখানে চারপাশে ওত পেতে রয়েছে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালের একঝাঁক দালাল। ফাইল বা হাসপাতালের টিকিট হাতে কাউকে দেখলেই পথ আগলে দাঁড়াচ্ছেন তারা। কেউ রোগীদের পিছু নিচ্ছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বল্প খরচে ভালো চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মিটফোর্ড হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এক রোগী নেওয়া হলে ওই দালাল আবার এসে দাঁড়াচ্ছেন ওই বাগানের পাশে। বেলা শেষে কে কয়টি রোগী বাগিয়েছেন, সেই হিসাবও কষছেন বাগানের এককোণে দাঁড়িয়ে খোশগল্পের আলোচনায়।

গত শনিবার দিনভর সরেজমিন হাসপাতালটিতে এমন চিত্র দেখা যায়। শুধু রোগী ভাগিয়ে নেওয়া নয়, অনিয়ম ও হয়রানির শেষ নেই প্রাচীনতম এই হাসপাতালটিতে। কোনো কোনো চিকিৎসক এক গাদা টেস্ট লিখে দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে রিপোর্ট দেখানোর বাহানায় প্রাইভেট হাসপাতালের নাম লেখা টোকেন ধরিয়ে দিচ্ছেন। রোগীরাও নিরুপায় হয়ে ওই হাসপাতাল থেকে টেস্ট করিয়ে আনছেন। অন্য হাসপাতালের মতো হুইলচেয়ার ঘিরেও গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট।

তবে হাসপাতালে ভর্তি নয়-প্লাস্টার খুলতে টিকিট আসা কিংবা পুনরায় চিকিৎসক দেখাতে আসা পঙ্গু রোগীরা এই সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়ে টাকা দিতে চেয়েও হুইলচেয়ার পান না। রোগী ভর্তির ক্ষেত্রেও করা হচ্ছে বিভিন্ন টালবাহানা। সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে। সকাল ৯টা থেকে টিকিট দেওয়া শুরু হলেও টিকিট কাটতে ভোর ৫টায় সিরিয়াল দিয়েও লেগে যাচ্ছে অর্ধদিন। ডাক্তাররাও দেরি করে আসায় লম্বা হতে থাকে রোগীর সিরিয়াল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন