সদর উপজেলার বনপাড়িল গ্রামে ৮ বছরের শিশু আতিকা হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পক্ষান্তরে আতিকাকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত কিশোর নাঈমের বাবা ও চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করা হলেও শনিবার বিকাল পর্যন্ত মামলা হয়নি। এ ছাড়া ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অভিযুক্ত ওই কিশোরকে। শিশুসহ মর্মান্তিক তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থমথমে ভাব বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে নেমেছেন। এই ঘটনায় এলাকার অনেক বাড়িঘর পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার নিহত শিশু আতিকা এবং গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত কিশোর নাঈমের বাবা পান্নু মিয়া ও চাচা ফজলু মিয়ার লাশ ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় শিশু আতিকার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাতেই জানাজা শেষে বনপাড়িল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে শিশুটির লাশ দাফন করা হয়েছে। এ ছাড়া শনিবার দুপুরে স্বজনদের কাছে নিহত পান্নু ও ফজলুর লাশ হস্তান্তর করা হয়। বিকালে একই কবরস্থানে শিশুটির কবরের পাশে পান্নু ও ফজলুর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শিশু আতিকা হত্যার ঘটনায় শনিবার দুপুরে মানিকগঞ্জ সদর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে অভিযুক্ত কিশোর নাঈমকে। গণপিটুনিতে কিশোরের বাবা নিহত পান্নু মিয়া (৪৫) ও চাচা নিহত ফজলু মিয়াও মামলা থেকে বাদ পড়েনি। তাছাড়া গণপিটুনিতে গুরুতর আহত অভিযুক্ত কিশোরের বড় ভাই নাজমুল হোসেন (২৪) এবং একই গ্রামের মো. রনির (২২) নামের এক যুবকের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম এসবের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। আতিকা হত্যার ঘটনায় মামলার বাদী হয়েছেন নিহত শিশুটির মা আরিফা আক্তার। নিহত শিশুর বাবা দুদুল মিয়া সৌদি প্রবাসী। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, শিশু আতিকা হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত কিশোরকে ঢাকার নবাবগঞ্জ এলাকা থেকে শুক্রবার দিবাগত রাতে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে সে পুলিশ হেফাজতে আছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে কিশোর আদালতে তোলা হবে। অন্য আসামি রনিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে দুই ভাইকে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত স্বজনদের কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। লাশ দাফন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় স্বজনরা মামলা করতে আসেননি।
মামলা করলে তা নথিভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে যারা গণপিটুনি দিয়ে দুইজনকে হত্যা করেছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার পর থেকে সদর উপজেলার বনপাড়িল গ্রামের সৌদি প্রবাসী দুদুল মিয়ার মেয়ে আতিকা আক্তার (৮) নিখোঁজ হয়। এরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শিশুটির খোঁজ করতে থাকেন স্বজনরা। এর মধ্যে আতিকাকে একই গ্রামের এক কিশোরের (১৫) সঙ্গে দেখেছে বলে স্বজনদের জানায় এক শিশু। এরপর কিশোরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে আতিকার স্বজনরা।
পরে রাত ১০টার দিকে ওই কিশোরের দেয়া তথ্যমতে, বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাখেতে গলায় কাপড় প্যাঁচানো অবস্থায় আতিকার লাশ দেখতে পান স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। এ ঘটনায় নিহত শিশুর লাশ বাড়িতে নিয়ে যান স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। এর মধ্যে অভিযুক্ত কিশোর পালিয়ে যায়। তবে কিশোরের বড় ভাই নাজমুলকে আটক করে নিহত শিশুর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। এরপর কিশোরের বাবা পান্নু, চাচা ফজলুকে নিহত শিশুর বাড়িতে ডেকে আনা হয়। রাত ১১টার দিকে নিহত শিশুর বিক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের পিটুনিতে পান্নু ও ফজলু মারা যান। পরে তাদের লাশ বাড়ির পাশে একটি পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়া হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন নাজমুল। খবর পেয়ে রাত ১২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত নাজমুলকে উদ্ধার করে জেলা সদরের জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। পাশাপাশি নিহত শিশু আতিকা এবং পান্নু ও ফজলুর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নাজমুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
