যথাযথ নীতি সহায়তার অভাবে অঙ্কুরেই মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে উদীয়মান ইলেক্ট্র্রনিক্স ও প্রযুক্তি শিল্পখাত। উৎপাদনকারী, সংযোজনকারী এবং আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যৌক্তিক শুল্ক পার্থক্য না থাকা, কম্প্রেসারের মতো অত্যন্ত হাই-টেক পণ্যে শুরুতেই অযৌক্তিক ভ্যাট আরোপ, কাঁচামাল আমদানির চেয়ে তৈরিকৃত পণ্য ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বেশি শুল্ক সুবিধা, সরকারি ক্রয়নীতিতে দেশীয় পণ্য প্রাধান্য না পাওয়া সহ নানাবিধ প্রতিকূলতায় জর্জরিত ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পখাত। এর ফলে দেশীয় হাই- টেক শিল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনমুখিতা থেকে দেশ আবার আমদানি-নির্ভরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
স্থানীয় শিল্প পরিপন্থি এমন নীতি ও সিদ্ধান্তে অন্ধকার দেখছেন এ খাতের উদ্যোক্তাগণ। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় শিল্প ও বিনিয়োগ-বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন ও সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য আমদানিকারী, সংযোজনকারী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌক্তিক শ্রেণিবিন্যাস ও শুল্ক পার্থক্য নির্ধারণ করা জরুরি। খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত অর্থবছরে এলডিসি থেকে উত্তরণের দোহাই দিয়ে আইএমএফ’র শর্ত পূরণের জন্য তাড়াহুড়ো করে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ইলেক্ট্রনিক্স ও হাই-টেক পণ্যে অযৌক্তিক ভ্যাট আরোপ করা হয়। একইসঙ্গে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করা হয়। পক্ষান্তরে তৈরিকৃত পণ্য ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করা হয়। জানা গেছে, গত অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কমেপ্রসারের মতো হাই-টেক পণ্যে একলাফে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধার্য করা হয়েছে। একইভাবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রেফ্রিজারেটর পণ্যের উপরেও মূল্য সংযোজন কর ৭.৫% থেকে ১৫% বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরসঙ্গে দেশে উৎপাদিত হয় রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও এয়ার কন্ডিশনারের কিছু যন্ত্রাংশের আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং একই যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চশুল্ক আরোপ করা হয়েছে (এস.আর.ও. নং-১৭৬-আইন/২০২৫/ ৩০৪-মূসক)।
যেমন রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজারের তৈরিকৃত যন্ত্রাংশে (সেমি ফিনিশড গুডস বা এসকেডি) সম্পূরক শুল্ক বা এসডি মওকুফ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পিপি বটম প্লেট, ড্রেইনেজ পাইপ কভার, রেফ্রিজারেটর/ফ্রিজার সেল্ফ, এয়ার কন্ডিশনারের ইনডোর কেসিং, ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ ইত্যাদি। তৈরিকৃত অবস্থায় এ সব যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করা হলেও কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক দিতে হচ্ছে। যেমন তৈরিকৃত রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার সেল্ফ আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক শূন্য (০%)। অন্যদিকে একই যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে ৪৫% সম্পূরক শুল্কসহ গড়ে ৫০% শুল্ক প্রদান করতে হচ্ছে। এরফলে কাঁমামাল আমদানি করে বাংলাদেশে নিজস্ব কারখানায় উক্ত যন্ত্রাংশগুলো তৈরি করতে অনেক বেশি খরচ পড়ছে। যার ফলে উচ্চ শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে যন্ত্রাংশ তৈরির চেয়ে তৈরিকৃত যন্ত্রাংশ আমদানি লাভবান হওয়ায় সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসকেডি আকারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় যন্ত্রাংশগুলো নিয়ে আসছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃত উৎপাদনকারীগণ এবং দেশীয় শিল্পখাত। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। এদিকে, কমার্শিয়াল এয়ার কন্ডিশনার (ভিআরএফ ও চিলার) এর ক্ষেত্রেও আমদানিকারক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিপুল অযৌক্তিক শুল্কপার্থক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন এইচএস কোড না থাকায় মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য নির্ধারিত কোডে সম্পূর্ণ তৈরিকৃত ভিআরএফ ও চিলার মাত্র ১ শতাংশ শুল্কে আমদানি করে বিক্রি করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বিপরীতে ভিআরএফ ও চিলার তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের ১৫% এরও অধিক শুল্ক এবং আরও ১৫% ভ্যাট প্রদান করতে হচ্ছে।
এতে স্থানীয়ভাবে কমেপ্রসার, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি পণ্যের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে কাঁচামাল আমদানির ব্যয়ও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদন শিল্পের অবস্থান ও বাজার সমপ্রসারণে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশীয় শিল্প পরিপন্থি এমন নীতিতে এ খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। উৎপাদনকারীগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশীয় শিল্প পরিপন্থি নীতিতে লাভবান হচ্ছেন আমদানিকারক এবং সংযোজনকারীগণ। নীতিমালায় উৎপাদনকারী, সংযোজনকারী ও আমদানিকারীগণের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য ও শ্রেণি বিন্যাস বা বিভাজন না থাকায় বিনিয়োগের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কাঁচামাল, আংশিক তৈরিকৃত পণ্য ও সম্পূর্ণ তৈরিকৃত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যাখ্যা ও শুল্কপার্থক্য না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকগণ এর সুবিধা নিচ্ছেন। বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর অ্যান্ড কমেপ্রসার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহিদ আলম বলেন, বিভিন্ন দেশের উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকে উৎসাহিত করতে এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে স্ব স্ব সরকার বিশেষভাবে নীতি সহায়তা প্রদান করছে। অথচ আমাদের এখানে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত কমেপ্রসর সহ অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক পণ্যের মূল্য সংযোজন কর ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি এবং দেশে তৈরি হয় এমন যন্ত্রাংশের আমদানিতে শুল্ক হ্রাস স্থানীয় ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল, ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস এসোসিয়েশনের মহাসচিব এসএম জাহিদ হাসান বলেন, এ ধরনের হাই-টেক শিল্পখাতের বিকাশে স্থিতিশীল পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন। আশা করছি নতুন সরকার এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেবেন। ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা পেলে ইলেক্ট্র্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠবে।
