সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদে যাচ্ছেন বগুড়ার আরও ৬ সংসদ সদস্য। তারা হলেন- বগুড়া-১ (সোনাতলা-সারিয়াকান্দি) আসন থেকে কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে মীর শাহে আলম, বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে আব্দুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে মোশাররফ হোসেন, বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে গোলাম মো. সিরাজ, বগুড়া-৬ (সদর) আসনে তারেক রহমান, বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে মোরশেদ মিলটন।
দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগ এই আসনগুলোতে দাপট দেখিয়েছে। উন্নয়নের লেশমাত্র ছোঁয়া লাগেনি পুরো বগুড়া জুড়ে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, অবকাঠামো উন্নয়ন, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুই শান্তিমতো হয়নি হাসিনার চক্ষুশূলের কারণে। ফ্যাসিস্ট সংসদ সদস্যরাও তাদের এলাকার উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলেননি। নিজের ব্যক্তিগত উন্নয়নই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। এবার বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ায় বগুড়া পেতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনবার। বিগত তিনবারের প্রহসনের নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতা দখলে রাখায় জিয়া পরিবার ক্ষমতার বাইরে ছিল। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার ক্ষমতার মসনদে বসতে যাচ্ছেন জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়াপুত্র তারেক রহমান। উন্নয়নবঞ্চিত এই জেলাসহ উত্তরের জনপদ আবারো প্রাণ ফিরে পাবে এমন প্রত্যাশা সবার মধ্যে উঁকি দিয়ে উঠছে।
বগুড়ায় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন আরেক বর্ষীয়ান নেতা গোলাম মোহা. সিরাজ। এর আগে বগুড়া-৬ এবং বগুড়া-৫ আসনে দফায় দফায় পাঁচবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার তিনি প্রতিপক্ষ জামায়াত প্রার্থীকে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে ষষ্ঠ বারের মতো বাজিমাত করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, বিগত পাঁচবারের সংসদ সদস্যের অভিজ্ঞতার আলোকে এবার তিনি বগুড়া তথা দেশের অর্থনীতির পটপরিবর্তনে জোরালো ভূমিকা রাখতে চান। তার পাশে শক্তি হিসেবে এবার দাঁড়িয়ে আছেন শেরপুর-ধুনটের তারুণ্যের প্রতীক সিরাজপুত্র আসিফ রাব্বানী সিরাজ। তার কারিশম্যাটিক দক্ষতায় তরুণরা এক হয়ে মাঠে নেমেছিলেন সিরাজের পক্ষে। ফলে এবারের জয়টা তার জন্য অন্যরকম স্বাদের হয়েছে। তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সৌভাগ্যকে নিজ এলাকার সৌভাগ্য, জনগণের সৌভাগ্য বলে মনে করেন।
শিবগঞ্জ আসন থেকে আরেক তরুণ ধানের শীষে জয় পেয়ে সংসদে যাচ্ছেন। তিনি হলেন মীর শাহে আলম। দলের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা অত্যধিক। তবে নির্বাচনের আগে মনোনয়ন নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছিল আসনটিতে। নাছোড়বান্দার মতো মীর শাহে আলম ধানের শীষে মনোনয়ন প্রাপ্তির জন্য নিবেদিত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত দল তাকেই ওই আসনে মনোনয়ন দেন। চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি নির্বাচন করে দলের সম্মান রক্ষা করেছেন। প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথমেই এলাকার কৃষকদের জন্য কাজ করতে চান। সেইসঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে তিনি বিশেষ নজর দেবেন বলে জানান। সোনাতলা-সারিয়াকান্দি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ব্যবসায়ী কাজী রফিকুল ইসলাম। এর আগে তিনি ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই আসন থেকে বিএনপি’র হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার তিনি ওই আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনকে পরাজিত করেছেন। নদী ভাঙনকবলিত আসনটির জন্য তিনি টেকসই উন্নয়নের দিকে নজর দেবেন। তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদে যাচ্ছেন, ভালো কিছু হবে বলেই মনে করেন তিনি।
কাহালু-নন্দীগ্রামের আরেক তরুণ নেতা আলহাজ মোশাররফ হোসেন। তিনিও তারেক রহমানের পছন্দের একজন নেতা। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি সারা দেশে ৭ জন নির্বাচিতদের একজন ছিলেন তিনি। দলের জন্য নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি সবার দৃষ্টি কাড়তে পেরেছিলেন। ফলে বিএনপি তাকে নানাভাবেই মূল্যায়ন করেছে। জেলা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনে তিনি জামায়াতের আরেক আলোচিত প্রার্থী ড. ফয়সাল পারভেজকে পরাজিত করে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে তিনি নতুন করে কাজ শুরু করতে চান নিজ এলাকায়। এরপর বেকারত্ব দূরীকরণের দিকেও বিশেষ নজর দেবেন বলে জানান তিনি।
আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া আসন থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুল মুহিত তালুকদার। তার পরিবার এই অঞ্চলের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার পিতা মরহুম আব্দুল মজিদ তালুকদার ছিলেন এ আসনের একজন কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ। তিনি বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন। তিনি এই আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গাবতলী-শাজাহানপুর আসন থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন মোরশেদ মিলটন। ওই আসনটিতে বরাবর মরহুম বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন করেছেন। নির্বাচিত হয়েছেন। এবারো ওই আসনে বেগম খালেদা জিয়াই নির্বাচন করার জন্য ফরম তুলেছিলেন। কিন্তু তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ায় মনোনয়ন পান মোরশেদ মিলটন। তিনি জামায়াত প্রার্থী গোলাম রব্বানীকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এটি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি এবং বেগম খালেদা জিয়ার আসন হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর অন্যতম একটি। ফলে এখান থেকে মোরশেদ মিলটন নির্বাচিত হয়ে ইতিহাসে ঠাঁই নিলেন। তিনিও দলের সম্মান রক্ষার জন্য কাজ করে যাবেন বলে জানান। জয়ের পর বগুড়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, এ বিজয় জেলার জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর বগুড়া উন্নয়নবঞ্চিত ছিল বলে অভিযোগ তাদের। এবার উন্নয়নের গতি ফিরবে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ আরও এগিয়ে যাবে- এমন প্রত্যাশা তাদের। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রেজাউল করিম বাদশা বলেন, বগুড়া বিএনপি’র ঘাঁটি। এখানকার মানুষ আগেও আমাদের সমর্থন করেছেন, এবারো করেছেন। তাই আমরা সাতটি আসন আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে পেরেছি।
