বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ বিষয়ে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি বেস্টিনেটের তৈরি করা একটি সফটওয়্যার ব্যবস্থা এবার গ্রহণের পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছয়জন ব্যক্তি এই তথ্য জানিয়েছেন। আমিনুল ইসলাম দেশটিতে আমিন নামেই বেশি পরিচিত। ওই সূত্রগুলোর মতে, এই সফটওয়্যার এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কোম্পানিগুলো মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে সরাসরি শ্রমিক নিয়োগ করতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগীরা সাধারণত অতিরিক্ত ফি আদায় করে। তথ্যের সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি ওই সূত্রগুলো। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।
‘দ্য ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফরম’ নামে এই সিস্টেমে একটি ডিজিটাল পোর্টাল থাকবে। সেখানে নিয়োগদাতারা নিবন্ধন করে সরাসরি কর্মী খুঁজে নিতে পারবেন। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানন রামাকৃষ্ণন ফেব্রুয়ারির শুরুতে দ্য স্টার পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই নতুন সিস্টেমের কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি বলেননি যে, এটি বেস্টিনেট পরিচালনা করবে। জানুয়ারিতে ব্লুমবার্গ নিউজ বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে আমিনুল ইসলাম এবং বেস্টিনেটের ভূমিকার কথাও উঠে আসে।
আমিনের পক্ষে আইনজীবী প্রতিষ্ঠান লুই অ্যান্ড ভুলার জানায়, তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। আমিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, শ্রমিকদের কাছ থেকে উচ্চ ফি আদায়ে তার কোনো ভূমিকা নেই; বরং তিনি তাদের সহায়তায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। রামানন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বেস্টিনেট, কারও পক্ষ থেকেই মন্তব্যের অনুরোধ করে জবাব পাওয়া যায়নি।
বেস্টিনেট ইতিমধ্যেই ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) নামে একটি সফটওয়্যার পরিচালনা করে, যা মালয়েশিয়া বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের বিভিন্ন ধাপ, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ পরিচালনায় ব্যবহার করে। এই সিস্টেমে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বীমা ইত্যাদির মতো বিভিন্ন মডিউল রয়েছে এবং এতে নিয়োগ এজেন্টদেরও সম্পৃক্ততা আছে। গত জুলাইয়ে ব্লুমবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আমিন এই সিস্টেমকে ‘হাইওয়ে’র সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, এটি ব্যবহারকারীদের, যেমন ভুয়া আবেদন অনুমোদনকারী কর্মকর্তা বা অতিরিক্ত ফি নেয়া এজেন্টদের, কাজের জন্য তিনি দায়ী নন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশ মালয়েশিয়াকে এফডব্লিউসিএমএস ব্যবহার বন্ধ করতে এবং আমিনকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। তাদের অভিযোগ, তিনি এমন একটি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, যা শ্রমিকদের কাছ থেকে ‘প্রতারণামূলকভাবে অর্থ আদায়’ করেছে। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল অক্টোবরে জানান, তাদের পুলিশ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে এ পর্যন্ত আমিনকে প্রত্যর্পণ বা অভিযুক্ত করা হয়নি। রামানন দ্য স্টারকে বলেন, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ এই নতুন সিস্টেম চালু করার আশা করছে মালয়েশিয়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রক্রিয়াটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রথমে এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং পরে মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেতে হবে। ডিসেম্বরে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের পর রামানন মানবসম্পদমন্ত্রী হন। তার পূর্বসূরি স্টিভেন সিম এই প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। বিশেষ করে এতে আমিন ও বেস্টিনেটের ক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা ছিল।
বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও বেস্টিনেটের সিস্টেম ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মতে, এতে আমিন একটি লাভজনক চুক্তি পেতে পারেন এবং বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে তার প্রভাব আরও বাড়বে। আমিনের প্রস্তাব অনুযায়ী, বেস্টিনেট ১২ বছরের একটি চুক্তি পাবে, যেখানে প্রতি বিদেশি শ্রমিকের আবেদনের জন্য কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ১০০০ ডলার এবং প্রতিটি শ্রমিকের জন্য এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ ফি নেয়া হবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় নিবন্ধিত নিম্ন দক্ষতার বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২১ লাখ। তবে প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো আলোচনাধীন এবং পরিবর্তন হতে পারে। কিছু কর্মকর্তা বলেছেন, যেসব দেশ থেকে মালয়েশিয়া শ্রমিক নেয়, সেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা হয়তো এখনও ভূমিকা রাখবে। কারণ সেসব দেশের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা মালয়েশিয়ার পক্ষে কঠিন।
এ ছাড়া, বড় কোম্পানিগুলোর জন্য সরাসরি হাজার হাজার শ্রমিক নিয়োগ করা কঠিন হতে পারে বলেও তারা মনে করেন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টদের বাদ দিলে নিয়োগ কার্যক্রম আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হবে।
গত জুলাইয়ে ব্লুমবার্গকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আমিন বলেন, বেস্টিনেট একটি নতুন সরাসরি নিয়োগ ব্যবস্থা তৈরি করছে, যা এজেন্টদের বাদ দেবে এবং নিয়োগ খরচ কমাবে। তিনি একটি প্রেজেন্টেশনও দেখান, যেখানে বলা হয় এই সিস্টেম মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে ২০২৭ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী করতে পারে। তবে আনোয়ার এটি দেখেছেন কি না, তা তিনি বলেননি। আমিন বলেন, আমাদের লক্ষ্য, আগামী ৩৬ মাসের মধ্যে নোবেল পুরস্কার। এটিই আমাদের লক্ষ্য এবং আমরা তা অর্জন করবো।
স্ট্রেইটস টাইমসের রিপোর্ট
শ্রমিক নিয়োগে নতুন সিস্টেম ব্যবহারের পরিকল্পনা মালয়েশিয়ার
মানবজমিন ডেস্ক
১৭ এপ্রিল (শুক্রবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
