যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উভয়ের প্রত্যাশা ‘উইন-উইন’ চুক্তি

সিএনএনের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উভয়ের প্রত্যাশা ‘উইন-উইন’ চুক্তি

ফন্ট সাইজ:

 যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামনে চুক্তিতে পৌঁছানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই অপ্রকাশ্য বাস্তবতা ছিল। আর যুদ্ধবিরতির শেষ পাঁচদিনে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার দীর্ঘ বৈঠক অনেকটা নিজেদের দরকষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবে মনে হয়েছে। এর পরপরই ইরানি বন্দর অবরোধ আরোপকে হোয়াইট হাউসের পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপ বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই নেয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ। এই অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় লাগবে। তবে ৬০ শতাংশ সফল হলেও তা তেহরানের অর্থনীতি এবং এর তেলনির্ভর মিত্র দেশ যেমন চীনÑ উভয়ের জন্যই বড় আঘাত হবে।

দ্বিতীয় দফার আলোচনায় সাফল্যের সম্ভাবনা নির্ভর করছে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন তিনি একটি চুক্তি চান এবং ইরানও তা চায়। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে এবং তার নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠী ম্যাগা’র ভেতরে অসন্তোষ বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জন্য দ্রুত একটি চুক্তি অত্যন্ত জরুরি।

ট্রাম্পের বারবার অবস্থান পরিবর্তন তার মনোযোগের ঘাটতি, স্মৃতিজনিত সমস্যা নাকি অপ্রচলিত দর কষাকষির কৌশল- তা বোঝা কঠিন। তবে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার এই কৌশলেরও সীমা আছে এবং তা অনেক সময় বিশৃঙ্খলা বা হতাশার ইঙ্গিত দেয়। এতে আরও স্পষ্ট হয়, ট্রাম্পের চুক্তির প্রয়োজন কতোটা বেশি। অন্যদিকে, ইরান যদিও প্রচারণা যুদ্ধে এগিয়ে আছে, তবু তারা অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং নিজ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা কাঠামোর বড় ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করেছে। তারও চুক্তির প্রয়োজন আরও বেশি। বাস্তবতা হলো, ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পর তেহরানের অবস্থা অনেক খারাপ।

৩৯ দিনের বোমাবর্ষণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সমালোচকরা বলে থাকেন, একজন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জায়গায় আরেকজন মোজতবা খামেনি আসতে পারেন, কিন্তু তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসেননি বা কার্যকর নেতৃত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখন তৃতীয় স্তরের নেতৃত্বে চলছে। তাদের মধ্যে প্রতিশোধের মানসিকতা থাকলেও, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য শক্তি পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। শক্তিশালী ভাষায় কথা বললেই বাস্তবে শক্তি বাড়ে না।
ইরানের শক্তির প্রধান উৎস এখন টিকে থাকা ও প্রতিরোধ- সরাসরি সামরিক বিজয় নয়। তবে একইসঙ্গে এটি আঞ্চলিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশকে তারা সামরিকভাবে আঘাত করেছে। ইরাক কিছুটা রক্ষা পেলেও বিভক্ত। পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে। কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা চুক্তি ভবিষ্যৎ অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়।

এ অবস্থায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের চেয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাই বেশি, বিশেষ করে পাকিস্তানে ২১ ঘণ্টার আলোচনার পর দুই পক্ষের অবস্থান আশ্চর্যজনকভাবে কাছাকাছি এসেছে। কূটনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই উল্টো ভাষা ব্যবহার হয়। আলোচনা খারাপ হলেও অগ্রগতির কথা বলা হয়। আর সফলতার কাছাকাছি গেলে বড় বাধার কথা তুলে ধরা হয়। তবে এখানে দুই পক্ষই একমত যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া উচিত। ইরান জানে, চীনের ওপর চাপ কমাতে তাকে জাহাজ চলাচল সহজ করতে হবে। এখন বিরোধ মূলত চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে, মূল বিষয় নিয়ে নয়। উভয় পক্ষই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার বিষয়ে একমত। ইরান চায় এটি পাঁচ বছর চলুক, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় ২০ বছর। মাঝামাঝি কোনো সমঝোতা সহজেই সম্ভব। এ বছরে ও গত বছরের হামলায় ইরানের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা কমে গেছে। এখন তাদের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম আছে, যা দ্রুত বোমায় রূপান্তর করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নজরদারি ও আকাশ আধিপত্যের কারণে। এখানে মূল বিষয় প্রযুক্তিগত নয়, বরং সার্বভৌমত্বের। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মাধ্যমে ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় সরিয়ে নেয়া, বিক্রি করা, কম সমৃদ্ধ করা বা তদারকির আওতায় রাখা- এসব সমাধান হতে পারে।

সবচেয়ে অনিশ্চিত বিষয় হলো ইসরাইল। ইরান চায় লেবানন সহ তার মিত্রগোষ্ঠীগুলো নিরাপদ থাকুক। হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক লড়াইয়ে দেখিয়েছে, তারা পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েনি। লেবানন সরকার বহু বছর পর ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসলেও হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি এবং শিগগিরই তা সম্ভব বলেও মনে হয় না। সম্ভবত এই ইস্যু আলাদা আলোচনায় যাবে, যেখানে ইসরাইল মাঝে মাঝে হামলা চালাবে, লেবানন সীমিত ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করবে, আর যুক্তরাষ্ট্র অগ্রগতির দাবি করবে।

সার্বিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির প্রধান বাধাগুলো বড় অতিক্রমযোগ্য সমস্যা নয়, বরং মর্যাদা ও অবস্থান রক্ষার বিষয়। কোনো পক্ষই এমন চুক্তি মেনে নেবে না, যেটিকে তারা নিজেদের জয় হিসেবে দেখাতে পারবে না। ইরান চায় তার সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় আছে- এমন বার্তা দিতে। অন্যদিকে, ট্রাম্প গত দুই মাসে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন- পোপ লিও থেকে শুরু করে ইসরাইল পর্যন্ত। তাই তিনি এমন একটি চুক্তি চান, যা তার সমর্থকদের কাছে আগের পরিস্থিতির চেয়ে ভালো বলে মনে হবে। তবে দু’টি প্রশ্ন ট্রাম্পকে তাড়া করবে। তা হলো- এই চুক্তি কি ২০১৫ সালে বারাক ওবামার করা চুক্তির চেয়ে ভালো? যুদ্ধের পর যে ইরান দাঁড়াবে- তা কেমন হবে?

ইরানের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে তাদের সহনশীলতা স্পষ্ট। একইসঙ্গে এই যুদ্ধ দেশটির ভেতরে মধ্যপন্থি কণ্ঠগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে, যারা বলতো শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জরুরি নয়। ট্রাম্প হয়তো এমন একটি চুক্তি পাবেন, যা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করবে। কিন্তু তার এই যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত ফলাফলগুলো এখনই সামনে আসতে শুরু করেছে এবং তার একটি হলো, ইরানের কঠোরপন্থিরা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন অনুভব করছে।





কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন