‘দীর্ঘ ৩০ বছরেও ভাগ্যের তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। শুধু নৌকায় মেশিন বসাইছি। এখন তেল না পাওয়ায় মেশিনই বিপদের কারণ হয়ে গেছে। কোথাও তেল না পেয়ে বইঠা মারছি। আগের মতো শরীলে আর শক্তিও নাই। ঈদের পর থেকে স্ত্রী সন্তান নিয়ে অনেকটা বিপদেই আছি, জীবনে এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়িনি। জানি না তেলের অভাব কবে দূর হবে। এভাবে আর কিছুদিন চললে শুধু নৌকা না, আমাদের পেটও বন্ধ হয়ে যাবে।’ কথাগুলো অনেকটাই আক্ষেপ নিয়ে মানবজমিনকে বলছিলেন যমুনা নদীতে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা হাসমত আলী (৫৯)। তিনি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চরাঞ্চলের বাসিন্দা। বৃহস্পতিবার বিকালে সিরাজগঞ্জ ক্রসবার-৩ এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। যমুনার তীরে বেঁধে রাখা হয়েছে নৌকার সারি। আর অলস সময় পার করছে মাঝিরা। আবার দুয়েকটি নৌকা চলাচল করলেও ভাড়া বৃদ্ধিতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। আর চরের মানুষের একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা নৌকা সীমিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। শুধু হাসমত আলী নন, একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন সিরাজগঞ্জ যমুনা পাড়ের হাজারও নৌকার মাঝি। নদীর তীরবর্তী বাজার ও দোকানগুলোতে ডিজেল সংকটের কারণে তাদের নৌকা চলছে না। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে তেল কিনে নদীতে যাচ্ছেন। তাদের লিটারপ্রতি ডিজেলে ৪০-৬০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু নৌকার মাঝি না আরও পেশাজীবীদের ঘাড়ে পড়েছে। সড়ক পথের পাশাপাশি নৌপথেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। বিশেষ করে চরাঞ্চলে ডিজেল সংকট ঘিরে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এতে সিরাজগঞ্জ যমুনা নদীঘেঁষা বিভিন্ন ঘাটে খেয়া ও ভ্রমণ নৌকা চলাচল অনেকাংশই কমে গেছে। সদর উপজেলার খাস কাওয়াকোলা চর এলাকার জেলে ইসমাইল হোসেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, তিন চারজন ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে নদীতে মাছ ধরি। কিন্তু ডিজেল তেলের অভাবে প্রায় ১৫ দিন ধরে বসে আছি। এভাবে কতো দিন চলবে, জানি না। এদিকে যাত্রীদের দুর্ভোগও বেড়েছে। সিরাজগঞ্জ শহরের মতিন সাহেবের ঘাট এলাকায় অপেক্ষমাণ মনোয়ারা বেগম বলেন, ১০ দিন আগে মেয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বেলা ১১টা থেকে বসে আছি, কিন্তু কোনো নৌকা নেই। শুনেছি তেল না থাকায় নৌকা চলছে না। এখন বাড়ি যাবো কীভাবে, সেটা নিয়েই চিন্তা করছি। জেলা প্রশাসন বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকট ও ফিলিং স্টেশনের শৃঙ্খলা ফেরাতে জেলায় ‘ফুয়েল কার্ড’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেইসঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিতভাবে অবৈধ জ্বালানি তেল মজুতদারদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার ও বাজার মনিটরিং চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষি ও নৌচলাচল সচল রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। এ প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশ জুড়েই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে জেলেরা কিছু কিছু স্থানে জ্বালানি পাচ্ছেন না, এমন তথ্য পেয়েছি। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করা যায়, শিগগিরই এমন সংকট কেটে যাবে।
‘কোথাও তেল না পেয়ে বইঠা মারছি’
এম এ মালেক, সিরাজগঞ্জ থেকে
১৭ এপ্রিল (শুক্রবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
