পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার অনন্য প্রতীক। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক চিরায়ত শেকড়। পহেলা বৈশাখে কেবল পঞ্জিকায় দিন পরিবর্তন হয় না, পুরাতনকে ফেলে নবজন্মের শিহরণ জাগে। আত্ম-উপলব্ধি ও নবজাগরণের আরেক নাম পহেলা বৈশাখ।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি বাঙালির জীবনে ফিরে আসে নতুনের আহ্বান নিয়ে। পুরনো জীর্ণতা, গ্লানি ও সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা নিয়ে। বৈশাখ যেন কালান্তরের স্রোতে ভেসে চলা এক আত্মশুদ্ধির আয়োজন, যেখানে ব্যক্তি ও জাতি উভয়েই নতুন করে নিজেদের আবিষ্কার করে চির নতুনের আবাহনে।
পহেলা বৈশাখের অস্তিত্ব প্রোথিত রয়েছে বাংলা জনপদের কৃষিনির্ভর সভ্যতায়। বাংলার মাটি, জল, ঋতুচক্র ও কৃষকের ঘামÑসবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছে বাংলা নববর্ষের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি। তথ্যপ্রযুক্তির এই দ্রুতগামী যুগেও কৃষক প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তার ফসলের দিনক্ষণ নির্ধারণ করেন। ফলে বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়, কৃষি অর্থনীতির একটি বাস্তব সূচক, যা আমাদের ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতাকে বহন করে নিয়ে চলে।
হাজার বছরের ঐতিহ্য প্রতিটি বৈশাখে নবজীবন পায়। নতুন করে উজ্জীবিত হয় বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তা। বৈশাখী মেলা, শোভাযাত্রা ও হালখাতার মতো আয়োজনগুলো আমাদের সংস্কৃতির বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের প্রতিফলন ঘটায়। লোকজ শিল্প, সংগীত, খাদ্যসংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অপূর্ব নিদর্শন দেখা যায় পহেলা বৈশাখে। গ্রাম থেকে শহরÑসবখানে ছড়িয়ে পড়ে এক উৎসবমুখর আবহ, যেখানে মানুষ ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়ায়। এই ঐক্যবোধই বাঙালির প্রকৃত শক্তি। এই সম্মিলিত আনন্দই আমাদের সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।
বাংলা নববর্ষ আমাদের সামনে নিয়ে আসে নতুন প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার দ্বার। প্রকৃতির নবজাগরণ এবং মানুষের অন্তর্গত আশাবাদ একত্রে সৃষ্টি করে এক প্রাণবন্ত জীবনচেতনা। এই চেতনা কেবল সাংস্কৃতিক নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেরও প্রেরণা। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষক, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, ক্রীড়া কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, ধর্মীয় নেতাদের আর্থিক সহায়তা ইত্যাদি তারই উদাহরণ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন থেকে কৃষক কার্ড প্রদান কর্মসূচির সূচনা এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কৃষকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সহায়তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে এবং বাংলার কৃষি অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে সক্ষম।
বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অন্তর্নিহিত সহনশীলতা, উদারতা ও সম্প্রীতির চর্চা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার উপাদানে সমৃদ্ধ। বহু মতের সহাবস্থানই আমাদের সভ্যতার প্রাণশক্তি। যখন বিশ্ব নানামুখী সংকট, সংঘাত ও বিভাজনে বিপর্যস্ত, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñশান্তি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চাই টেকসই মানবিক ভবিষ্যতের একমাত্র পথ, গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ ও শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের একমাত্র পন্থা।
নববর্ষের এই শুভক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক-সংকীর্ণতা, বিভাজন ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে মানব কল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়া। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে আমরা যেন অতীতের হতাশা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। বিভাজন ও হানাহানির কৃষ্ণ অন্ধকার পেরিয়ে মৈত্রী ও মিলনের পথে এগিয়ে চলার যে আমন্ত্রণ বৈশাখে উচ্চারিত হয়, তা যেন প্রতিটি ঘরে ঘরে, অন্তরে অন্তরে পুনরুচ্চারিত হয়। বাঙালির গৌরবময় ঐতিহ্য যেন সমৃদ্ধির উচ্চতর সোপান স্পর্শ করে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে। আত্মপরিচয়ের অনন্য প্রতীক পহেলা বৈশাখ যেন বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে বয়ে আনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। যেন বাঙালির জীবন ভরিয়ে দেয় কল্যাণের আলোকরশ্মিতে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

Rafiqulislam
২ মাস আগেআত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা বহাল থাকবে পহেলা বৈশাখ পালনের মাধ্যমে। যদি ও ভারতের দালালি দেদারসে চলুক তাতে কোন সমস্যা হবে না।