বিএনপির জোয়ার, জামায়াতের নীরব উত্থান এবং ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর জটিল গোলকধাঁধা

বিএনপির জোয়ার, জামায়াতের নীরব উত্থান এবং ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর জটিল গোলকধাঁধা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্যানভাসে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন বা সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনটি এমন তুলিতে আঁকা হয়েছে, যার আঁচড়গুলো আপাতদৃষ্টিতে স্পষ্ট মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে হাজারও অস্পষ্টতা, রহস্য এবং ভবিষ্যতের এক অজানা গন্তব্যের ইঙ্গিত। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক খরা, দমন-পীড়ন আর একপাক্ষিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির এই যে অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন, তাকে অনেকেই ‘ভূমিধস’ বিজয় বা রাজসিক ফিরে আসা বলে অভিহিত করছেন, যা বাস্তবিক অর্থেই সত্য; কারণ রাজপথে, চায়ের আড্ডায়, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা পত্রিকার পাতায় সর্বত্রই এখন ধানের শীষের জয়জয়কার এবং আগামী দিনের সরকার গঠনের নানা সমীকরণ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু উৎসবের এই ডামাডোলে, বিজয় মিছিলের গগনবিদারী স্লোগান আর আতশবাজির রঙিন ঝলকানিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর এবং অনেকের মতে ‘ভীতিজাগানিয়া’ অধ্যায় খুব সন্তর্পণে ইতিহাসের আড়ালে ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে, আর তা হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় এবং রহস্যজনক ভোটপ্রাপ্তি যা অনেক রাজনৈতিক বোদ্ধার কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সবাই যখন বিএনপির প্রাপ্ত আসন সংখ্যা আর ভোটের শতাংশ নিয়ে মেতে আছে, তখন খুব কম মানুষই খেয়াল করছেন যে জামায়াতে ইসলামী যাদের যাদের শীর্ষনেতাদের একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হয়েছে এবং যারা গত পনেরো বছর ধরে কার্যত কোণঠাসা হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে রাজনীতি করতে বাধ্য হয়েছে তারা কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ ভোট পেল এবং অনেক আসনে তারা কীভাবে ফলাফলের নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হলো, যা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সমীকরণে মেলানো কঠিন। মূলধারার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সুশীল সমাজের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই এই বিষয়ে অদ্ভুত নীরবতা পালন করছেন, যেন বিএনপির জয়ের খবরে জামায়াতের এই উত্থানকে তারা দেখেও না দেখার ভান করতে চাইছেন, অথবা তারা এই অপ্রিয় সত্যটি উচ্চারণ করতে ভয় পাচ্ছেন যে রাজনীতির মাঠে নতুন করে জটিল সমীকরণের জন্ম হয়েছে যা হয়তো আমাদের গণতন্ত্রের সংজ্ঞাকেই নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।


তবে মূলধারার গণমাধ্যমের এই নীরবতার বিপরীতে অনলাইনের জগৎ বা সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও অ্যাক্টিভিস্টরা এই নির্বাচনের ফলাফলের নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করে এমন কিছু ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর দিকে আঙুল তুলছেন যা সাধারণের চোখের আড়ালে থেকে গেছে এবং যা রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যারা রাজনীতির ভেতরের খবর রাখেন বা গাণিতিক বিশ্লেষণ করেন, তারা বারবার একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আনছেন যে, জামায়াতের এই ভোট সংখ্যা কি একান্তই তাদের সাংগঠনিক শক্তি বা ‘সাইলেন্ট ভোট ব্যাংক’-এর প্রতিফলন, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সূক্ষ্ম কারসাজি বা গভীর কোনো ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ যা সাধারণ ভোটারদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে। তাদের বিশ্লেষণ ও উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত মতে, ভোটের মাঠের প্রকৃত চিত্র আর ঘোষিত ফলাফলের মধ্যে এক বিশাল এবং অবিশ্বাস্য ফারাক রয়েছে, যেখানে হয়তো বিশেষ মহল বা অদৃশ্য শক্তি চেয়েছে রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘ব্যালেন্স অফ পাওয়ার’ বজায় রাখতে এবং বিএনপিকে এককভাবে দানবীয় ক্ষমতার অধিকারী হতে না দিতে। তারা সম্ভবত চায়নি বিএনপি একাই সংসদে বা রাজপথে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করুক, তাই বিএনপিকে চাপে রাখার বা ভবিষ্যতে ‘চেক’ দেয়ার জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী শক্তির প্রয়োজন ছিল, আর সেই প্রয়োজন মেটাতেই হয়তো জামায়াতের বাক্সে এই বিপুল ভোটের জোগান দেয়া হয়েছে বা ভোটের হিসেবে গরমিল করা হয়েছে। এই ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ এমনভাবে করা হয়েছে যাতে জামায়াতকে একটি শক্তিশালী প্রেসার গ্রুপ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, নতুবা নিবন্ধনহীন, প্রতীকহীন এবং সামাজিকভাবে প্রবল সমালোচিত একটি দলের পক্ষে এত দ্রুত এত বিপুল জনসমর্থন আদায় করা বা অনেক আসনে ফয়সালাকারী ফ্যাক্টর হয়ে ওঠা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


জামায়াতে ইসলামীর কথা উঠলেই যে বিষয়টি সবার আগে এবং অবধারিতভাবে সামনে আসে তা হলো তাদের বিতর্কিত অতীত এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের নেতিবাচক ভূমিকা, যার কারণে দলটি সবসময়ই এ দেশের রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর অবস্থানে ছিল এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। গত এক দশকে যুদ্ধাপরাধের বিচারে দলটির শীর্ষ নেতাদের দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন বাতিলের পর দেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক বোদ্ধারা অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে জামায়াতের রাজনীতি হয়তো চিরতরে শেষ হয়ে গেছে বা তারা আর কখনোই মূলধারায় ফিরতে পারবে না, কিংবা ফিরলেও তা হবে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু শক্তি হিসেবে। অথচ এবারের নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের আড়ালে জামায়াত অনেক আসনেই দ্বিতীয় বা অত্যন্ত সম্মানজনক ভোট পেয়েছে যা অনেক বড় এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলকেও লজ্জায় ফেলে দেবে। এই ফলাফল দেখে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, আমরা কেবল বিএনপির উত্থান দেখছি এবং উল্লাস করছি, কিন্তু তার ছায়ায় বেড়ে ওঠা বা পুনরুজ্জীবিত হওয়া কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির এই উত্থানকে উপেক্ষা করছি যা ভবিষ্যতে দেশের উদারপন্থী রাজনীতির জন্য বড় ভাবনার বিষয় হতে পারে। অনেকেই বলছে অনেক কেন্দ্রে হয়তো জামায়াতের ভোট কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে অথবা বিএনপির নিশ্চিত ভোট কমিয়ে জামায়াতকে দেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বিএনপিকে বুঝিয়ে দেওয়া যে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তি এখনো মাঠে বা পর্দার আড়ালে সক্রিয় আছে এবং তারা চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে রাজনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তবে তা কেবল একটি দলের জন্য নয়, বরং পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যই এক অশনি সংকেত, কারণ জনগণের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে কৃত্রিম ফলাফল তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।


সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিএনপির এই বিশাল জয়ের পরেও জামায়াতের নেতারা বা কর্মীরা খুব একটা হতাশ নন, বরং তাদের মধ্যে এক ধরনের গোপন সন্তুষ্টি বা আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বকে আরও জোরালো করে এবং সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে সাহায্য করে। জামায়াতের এই ফলাফল যদি সত্যি সত্যি তাদের সাংগঠনিক শক্তির প্রতিফলন হয়, তবে তা দেশের রাজনীতির জন্য এক নতুন এবং কঠিন সমীকরণ নিয়ে আসবে, যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে; আর যদি তা ইঞ্জিনিয়ারিং হয় তবে তা গণতন্ত্রের জন্য এক বড় প্রহসন এবং ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। অনেকেই বলছেন, রাজনীতিতে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ আনতে গিয়ে এমন কোনো শক্তিকে পুনরায় মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করা হলো কি না, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দেবে এবং যার মাশুল পুরো জাতিকে দিতে হতে পারে, কারণ ইতিহাস সাক্ষী আছে যে উগ্রবাদকে তোষণ করে বা ব্যবহার করে সাময়িক ফায়দা লোটা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। বিএনপির ভূমিধস জয়ের কথা সবাই উচ্চস্বরে বললেও, জামায়াতের এই ‘নীরব ভূমিধস’ নিয়ে কেউ কথা বলছে না, অথচ সংখ্যার বিচারে তাদের প্রাপ্ত ভোট এবং বিশ্লেষকদের তোলা অভিযোগগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ সত্য চাপা দিয়ে রাখলে তা একদিন না একদিন বিস্ফোরিত হবেই। দিনশেষে নির্বাচনের ফলাফল কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন, তাই যারা ভাবছেন ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে বা কৃত্রিমভাবে ভোটের সংখ্যা বাড়িয়ে-কমিয়ে সব ঠিক রাখা যাবে, তারা হয়তো ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে যাচ্ছেন যে বিতর্কিত অতীত আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না, বরং তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই নতুন মেরুকরণ, যেখানে একদলের প্রকাশ্য বিজয়ের আড়ালে আরেক দলের গোপন পুনরুত্থান ঘটছে, তা আগামী দিনগুলোতে দেশের গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয়।


আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই নির্বাচনের ফলাফলের পেছনে জামায়াতের নিজস্ব কিছু কৌশলও কাজ করেছে যা হয়তো ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বের পাশাপাশি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের মুখে জামায়াত প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে সম্পূর্ণ আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন তৎপরতায় লিপ্ত ছিল, যেখানে তারা তাদের সাংগঠনিক কাঠামোকে ভেঙে না ফেলে বরং আরও সুসংহত করেছে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের ভিত্তি মজবুত রেখেছে। বিএনপির মতো বড় দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা বা সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে জামায়াত তাদের সুশৃঙ্খল ক্যাডার বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে নীরবে ভোটারদের মগজধোলাই করেছে বা নিজেদের পক্ষে টেনে এনেছে, যার ফলশ্রুতিতে ভোটের দিন এক বিশাল ‘সাইলেন্ট ভোট ব্যাংক’-এর বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই ভোটাররা হয়তো কখনোই প্রকাশ্যে মিছিলে যাননি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হননি, কিন্তু ব্যালট বাক্সে তারা ঠিকই তাদের পছন্দের বা নির্দেশিত প্রতীকে সিল মেরেছেন, যা অনেক বাঘা বাঘা জরিপকারী বা বিশ্লেষকের ধারণাকেও ভুল প্রমাণ করেছে। এই ‘সাইলেন্ট ভোট’ আসলে একটি মিথ বা অতিরঞ্জন মাত্র বলে কেউ কেউ মনে করছেন, কারণ বাস্তবে জামায়াতের জনসমর্থন এতটা বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই, বরং এটি একটি সাজানো নাটক যেখানে পর্দার আড়ালে থাকা কুশীলবরা ভোটের সংখ্যা ম্যানিপুলেট করে জামায়াতকে প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা করেছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ হয়তো মনে করেছে যে বিএনপি যদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং তাদের কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকে, তবে তারা স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে, তাই জামায়াতকে একটি ‘কাউন্টার ফোর্স’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। এই তত্ত্ব যদি সত্য হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এর মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত রায়কে অস্বীকার করা হয়েছে এবং কৃত্রিমভাবে একটি রাজনৈতিক সংকট জিইয়ে রাখা হয়েছে।


বিএনপির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিষয়টি অত্যন্ত অস্বস্তিকর, কারণ তারা প্রকাশ্যে বিশাল বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করলেও ভেতরে ভেতরে তারা নিশ্চয়ই অনুভব করছে যে তাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে তাদেরই দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী কিন্তু আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী। অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের রাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জামায়াতের কারণে বিএনপিকে যে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, তা তাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। এখন যদি জামায়াত সংসদে বা রাজপথে একটি শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়, তবে বিএনপির পক্ষে দেশ পরিচালনা করা বা তাদের উদারপন্থী ভাবমূর্তি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব যারা সবসময়ই বাংলাদেশে একটি সেক্যুলার গণতন্ত্র দেখতে চায়, তারাও জামায়াতের এই উত্থানকে সহজভাবে নেবে না এবং এর ফলে নতুন সরকারের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা হয়তো এখন ভাবছেন যে তাদের বিজয়ের আনন্দ কতটা টেকসই হবে এবং তাদের মিত্র হিসেবে পরিচিত জামায়াত শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন জাগছে যে, তারা কি তবে এক স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে আরেক উগ্রবাদী শক্তির খপ্পরে পড়তে যাচ্ছে? রাজনীতির এই গোলকধাঁধায় সাধারণ মানুষ সবসময়ই বলির পাঁঠা হয়, এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হচ্ছে না।


ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশে যখনই কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, তখনই তার পেছনে কোনো না কোনো অদৃশ্য শক্তির হাত ছিল বা কোনো বিশেষ সমীকরণ কাজ করেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে এক-এগারোর পটপরিবর্তন সবকিছুতেই দেখা গেছে যে, দৃশ্যমান ঘটনার আড়ালে অনেক কিছুই ঘটেছে যা সাধারণ মানুষের জানার বাইরে ছিল। এবারের নির্বাচনও হয়তো সেই ধারারই ধারাবাহিকতা, যেখানে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দটি কেবল অভিযোগ নয় বরং এটি রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন, তারা হয়তো ভবিষ্যতের কোনো বড় বিপদের আশঙ্কা থেকেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। তাদের মতে, জামায়াতকে যদি কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয় বা তাদের শক্তি বৃদ্ধি করা হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে ধ্বংস করবে। কিন্তু যারা ক্ষমতার দাবা খেলছেন, তাদের কাছে হয়তো আদর্শের চেয়ে কৌশল এবং নিয়ন্ত্রণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কৌশলের খেলায় কে জিতবে আর কে হারবে তা সময় বলে দেবে, কিন্তু আপাতত এটি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তা এবং অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের আনন্দের আড়ালে জামায়াতের এই নীরব উত্থান এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগগুলো আগামী দিনগুলোতে রাজনীতির মাঠকে আরও উত্তপ্ত এবং সংঘাতময় করে তুলতে পারে, যেখানে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য খুঁজে পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়বে। তাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সজাগ থাকা এবং প্রশ্ন তোলা, কারণ গণতন্ত্রের নামে যদি কোনো প্রহসন মঞ্চস্থ হয় তবে তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়।

Ferdous

৫ মাস আগে

শুধু টাকার খেলা।নিজ চোখে দেখেছি,এ উত্স বন্ধ করতে হবে

নেজাম

৫ মাস আগে

জামায়াতে ইসলামী যে ভোট পেয়েছে তা একান্তই তার সাংগঠনিক যোগ্যতার ভিত্তিতে পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামীকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ৫৩ টির মতো সিটে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে যে আসন গুলোতে ভোটের ব্যবধান মাত্র ৭০-৫০০০ ভোট।

TareqSumon

৫ মাস আগে

আলহামদুলিল্লাহ, কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক ছিল। তবে রাতের আঁধারে কিছু অনিয়মের যে খবর পাওয়া গেছে, তা কাম্য নয়। সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য স্বচ্ছতা অপরিহার্য।জয়,পরাজয় বড় কথা নয়, দেশের স্বার্থে বিএনপি ও অন্যান্য দলগুলোর উচিত সহনশীল হওয়া। প্রতিপক্ষকে প্রতিহত না করে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমাদের গণতন্ত্র টেকসই হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।
সেনাবাহিনীকে অভিবাদন: একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জানাই বিশেষ ধন্যবাদ। তাদের নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা আমাদের গর্বিত করেছে।

বাহাউদ্দীন বাবলু

৫ মাস আগে

বিভাগ ওয়াজ জামাতের ভোট দেখলে দেখা যায়,সবচেয়ে খুলনা বিভাগে জামাত ভালো করেছে ৩৬ টি আসনের মধ্যে জামাত ২৪ টি আসন পেয়েছে। আর এই বিপুল বিজয়ের অনেক গুলো কারণ আছে।
ভোট কাস্টিং এর দিকে খুলনা বিভাগ এগিয়ে আছে। এর কারণ আওয়ামী সমর্থন ভোট দিতে গেছে এবং বেশির ভাগ ভোট তারা তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে জামাতকে ভোট দেছে,যদি বিএনপি জয় লাভ করত তাহলে তাদের উপর বিগত আওয়ামী দুর্শাসনের প্রতিশোধ নিতে এই ভয়ে তারা জামাতকে সেভ মনে করছে। তারপর বিএনপির আভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলন। যুবক সমাজের মধ্যে জামাতের অংগসংগঠন ছাত্র শিবিরের মধ্যে প্রভাব বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাঁদাবাজীর সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে অতিরিক্ত পোস্ট।

মীর দুলাল হোসেন

৫ মাস আগে

সমাজ অনেক সচেতন তারপরেও সচেতনতার মাঝে অল্প কিছু হারিয়ে যাওয়া ভালো, তা না হলে সচেতনতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে এবং এটাই চিরসত্য।

ফজলে আলম বাবু

৫ মাস আগে

আপনি কি দেশে থাকেন? জামাত তাদের যোগ্যতায়ই এই ভোট পেয়েছে

জাহাঙ্গীর আলম

৫ মাস আগে

ছাত্রশিবিরের নেতা, কর্মীরা গুপ্ত রাজনীতি অর্থাৎ ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে নানা অপকর্ম করেছে এবং এর সম্পূর্ণ দায়ভার সুকৌশলে ছাত্রলীগের উপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, এমন খারাপ নজির বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।
১৯৭১ সালে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ এবং ২০২৬-এ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিপুল সংখ্যক আসন হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা জামায়াতের ঘৃণ্য রাজনীতির এক ধারাবাহিকতা মাত্র।
আর ডক্টর ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং'কে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়েছে।
বলা বাহুল, ডক্টর ইউনুস যুদ্ধাপরাধী দলটিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।

Md. Shahadat Hossain

৫ মাস আগে

ডঃ ইউনুস রাজনিতিতে চেক-এন্ড-বেলেন্স করার কূটকৌশল থেকে তিনি এমন টা করতে গিয়ে - দেশে সত্যিকারের উগ্রবাদিদের উত্থান ঘটিয়ে গেলেন। স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযদ্ধাদের রক্তে রক্তাক্ত হাত, হাজারো নারীর সতীত্বে কলঙ্কিত এই রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস দের ক্ষমতায়ীত করে গেলেন তিনি। ইতিহাস ওনাকে ক্ষমা করবে না।

HUMAYUN KHONDOKAR

৫ মাস আগে

বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের সঠিক সময়ে মতপ্রকাশের মাধ্যমে গনরায় দিয়ে,বাংলাদেশের ইতিহাস সৃস্টি কারি সবচেয়ে সুন্দর,সুষ্ঠু, এবং নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন জাতি উপহার পেয়েছে।

মন্তব্য করুন