দেশের চা শিল্পে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা প্রভিডেন্ট ফান্ডের শতকোটি টাকা বকেয়া থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন হাজারো শ্রমিক। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের বেতনের একটি অংশ কেটে এই তহবিলে জমা রাখার কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে ৫৮টি চা বাগান মালিক এই প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপুল অঙ্কের টাকা জমা দেয়নি। ফলে অবসরের পর কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন চা শ্রমিকরা। শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে দেয়া হলেও কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি। অনেক শ্রমিক অবসরের কাছাকাছি চলে এসেছেন, কিন্তু সঞ্চিত অর্থ হাতে পাবেন কিনা- সেই শঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে। চা শ্রমিক ভবিষ্যৎ তহবিল নিয়ন্ত্রকের অফিস সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত চা শ্রমিকদের বেতনের ৭.৫ ভাগ কর্তন করে নেয়া হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ আরও ৭.৫ ভাগ মোট ১৫ ভাগ অর্থ তহবিলে জমা দেয়ার কথা রয়েছে। শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রদেয় মোট ১৫ শতাংশ জমা টাকার উপর আরও ১৫ ভাগ অর্থ বাগান কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে একত্রে জমা দিতে হয়। শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান করে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড এই ভবিষ্যৎ তহবিল পরিচালনা করেন। বোর্ডে চা বাগান মালিকপক্ষের ৩ জন, চা স্টাফ এসোসিয়েশন থেকে ১ জন, চা শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে ২ জন প্রতিনিধি এবং চা শিল্প বহির্ভূত ২ জন স্বতন্ত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শ্রম সচিবের হয়ে ভবিষ্যৎ তহবিল নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব পালন করেন। নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা গেছে, বোর্ড শ্রমিকদের পক্ষে অনাদায়ী বকেয়া আদায়ে বাগান মালিকদের সঙ্গে দেন-দরবার ও মামলা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ভবিষ্যৎ তহবিল নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৮শে ফেব্রুয়ারির হালনাগাদ তথ্যমতে, ৫৮টি চা বাগানের শ্রমিকদের পিএফের টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে ইমাম-বাওয়ানী ৬৯ মাসের ৮৯,৭৩,৫১৩ টাকা, লোভাছড়া ২৬ মাসের ২১,১৩,৯৬৩ টাকা, হোসেনাবাদ ২৬ মাসের ৩১,২৪,৬৮০ টাকা, দলই ২১ মাসের ১,৩০,৩৭,৯৮১ টাকা, রাজনগর ২১ মাসের ২,১৯,১৬,৪৯৩ টাকা এবং মুরইছড়া চা বাগানের ২২ মাসের ৩৫,৩৭,৪০৮ টাকা বকেয়া আদায়ে শ্রম আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। যার পরিমাণ ৫ কোটি ২৭ লাখ ৪ হাজার ৩৮ টাকা। বাকি ৫২টি চা বাগানের বকেয়া আদায়ে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া, ৫২ বাগানের বকেয়ার পরিমাণ জানাতে পারেনি তহবিল নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা বাগান স্টাফ এসোসিয়েশন সূত্রে, এই বকেয়ার পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা যায়। চা সংশ্লিষ্টরা বলেছেন-কিছু বাগানে আর্থিক সংকটের কারণে পিএফের টাকা সময়মতো জমা হয়নি। আবার কোথাও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও তদারকির অভাবও দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কুন্দ বলেন, চা শ্রমিকদের আয় এমনিতেই কম। তার মধ্যেও সামান্য টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা রাখা হয়, সেটিও পাওয়া যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তবে শ্রমিকদের জীবনে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে। বকেয়া তালিকায় থাকা সাতগাঁও চা বাগানের ব্যবস্থাপক আশরাফুল সিদ্দিক প্রিন্স বলেন, নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাগানে লোকসান গুনতে হচ্ছে। শিগগিরই শ্রমিকদের পিএফের বকেয়া জমা দিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। জানতে চাইলে ভবিষ্যৎ তহবিল নিয়ন্ত্রক মহব্বত হোসাইন বলেন, ৫ ও ৭ই জুলাই ট্রাস্টি বোর্ডেও ৪৪০তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অনাদায়ী অর্থ আদায়ে তাগিদ পত্র প্রেরণ ও বাগানের আর্থিক পরিস্থিতি সরজমিন পরিদর্শন করা হয়েছিল। ফলে সর্বশেষ ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনাদায়ী ১০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু বাগান লোকসানের মুখে পড়েছেন, অন্যদিকে শ্রমিকদের স্বার্থও দেখা হচ্ছে।
৫৮ চা বাগানে শ্রমিকদের শতকোটি টাকার পিএফ বকেয়া, অনিশ্চয়তায় হাজারো শ্রমিক
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
১১ এপ্রিল (শনিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
