বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতেও। এতে বিপাকে পড়েছেন খেয়া পারাপারের নৌকা, ফিশিং বোট মালিক ও জেলেরা। চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় ভরা মৌসুমেও অনেক ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। ফলে কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ঘাট ও ফিশারি ঘাটে অলস পড়ে আছে শত শত ট্রলার। আর হাজারো জেলে কাটাচ্ছেন কর্মহীন সময়।
বুধবার সরজমিন কর্ণফুলী নদীর ফিশারি ঘাট, অভয়মিত্র ঘাট ও ব্রিজ ঘাট ঘুরে দেখা যায়-শত শত ট্রলার সারিবদ্ধভাবে ঘাটে থেমে আছে। কয়েকদিন ধরে জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় বেশির ভাগ ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে, আয় নেই বলে মালিকরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকে আবার সাগর থেকে ফিরে এসে ট্রলার নোঙর করেছেন। অন্যদিকে ব্রিজ ঘাটে গিয়ে দেখা যায়-ডিজেলচালিত ছোট নৌকাগুলো আগের মতোই চললেও মাঝিরা জানাচ্ছেন, প্রতি লিটার ডিজেলের জন্য এখন ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
ট্রলার মালিকদের মতে, একটি ট্রলারে গড়ে ১ হাজার থেকে ২ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। বড় ট্রলারের ক্ষেত্রে এই চাহিদা সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার লিটার পর্যন্ত। কিন্তু এখন পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হলেও মিলছে না পর্যাপ্ত সরবরাহ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার মতে, সাগরে মাছ ধরা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলছেন জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিকরা। তাদের দাবি, হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ মাছ ধরার ট্রলার ঘাটে বসে আছে। নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরা কমেছে অন্তত ৭০ ভাগ।
বিডব্লিউটিসি’র হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০টি লাইটার জাহাজ বুকিং হয়। সেগুলো বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে যাওয়া এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে গড়ে আড়াই লাখ লিটার ডিজেল দরকার হয়। কিন্তু এই চাহিদার বিপরীতে মেরিন ডিলারদের কাছ থেকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় ডিজেল সংকটে নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। যার সমাধান এখন পর্যন্ত মিলেনি। ফিশারি ঘাটের মাছ ধরার ট্রলারের মাঝি মোহাম্মদ নোমান মানবজমিনকে বলেন, ‘একদিকে তেল সংকট, তার ওপর আবার সরকারি নিষেধাজ্ঞা। সব মিলিয়ে আগেভাগেই ট্রলার নোঙর করেছি। এবার ৫ লাখ টাকা খরচ করে সাগরে গিয়ে মাত্র ৩ লাখ টাকার মাছ পেয়েছি। মালিক তো আর এমন ক্ষতির মুখে ট্রলার পাঠাবেন না।’
টিপু-২ ট্রলারের মাঝি মোহাম্মদ টিপু বলেন, ‘হঠাৎ তেলের সংকট, তার সঙ্গে ঋণের চাপ। লোন নিয়ে সাগরে গিয়ে সেই টাকা তোলাই যাচ্ছে না। ২০২৫ জন জেলে নিয়ে পাঁচদিন ধরে অলস সময় কাটাচ্ছি। আগে যেখানে ৪০০-৫০০ লিটার তেল পাওয়া যেত, এখন পাওয়া যায় মাত্র ২০০ লিটার।’ আল্লাহ্র দান ফিস ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জুনায়েদ আরমান দুলহান জানান, “সাগরে একটি জাহাজে মাছ সরবরাহের জন্য প্রায় ৮০ হাজার লিটার তেল লাগে। সেখানে এখন প্রতি জাহাজে দেয়া হচ্ছে মাত্র ৪০ হাজার লিটার।
এদিকে সামনে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের জন্য প্রতিবছর বিভিন্ন সময়ে মোট প্রায় ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়। ফলে বছরের সীমিত সময়েই জেলেরা আয় করতে পারেন। এর মধ্যেও যদি জ্বালানি-সংকটের কারণে মাছ ধরতে না পারেন, তাহলে তাদের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। মাছ ব্যবসায়ী আয়ুব আলী বলেন, ‘তেল সংকটে মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। কয়েকদিন পর নিষেধাজ্ঞা এই নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। আমরা মাছ কিনতেই পারছি না, তাই অলস সময় পার করতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকারী বোট মালিক সমিতির সভাপতি নূর হোসাইন বলেন, ‘তেলের সংকট আছে ঠিকই, কিন্তু বেশি দাম দিলে জেলেরা তেল পাচ্ছেন। কয়েকদিন পর সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু-তাই আগেভাগেই ট্রলার ও বোটগুলো ঘাটে ফিরে আসছে।’ চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের উপ-পরিচালক শওকত কবির চৌধুরী বলেন, ‘কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজের মালিক আমাদের মৌখিকভাবে বলেছেন- মাছ ধরার জন্য সাগরে যাওয়ার যে পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন, তা তারা পাচ্ছেন না। তবে মৌখিকভাবে অবহিত করলেও কেউ এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে লিখিতভাবে বলেননি।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, ‘আগামী ১৫ই এপ্রিল থেকে ১১ই জুন পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা ৫৮ দিনের জন্য বন্ধ হচ্ছে। এ কারণে আমরা ফুয়েল সংকটের বিষয়টিকে আর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না। মাছ ধরা বন্ধের সময়ে ট্রলারগুলোতে যাতে জ্বালানি সরবরাহ না করে, সেজন্য ফিলিং স্টেশনগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে।’
