কৃষক কার্ড কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত একটি ডিজিটাল পরিচিতিপত্র যাতে সরকার প্রকৃত কৃষককে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ এবং কৃষিঋণ আর্থিক পরভোজী মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি দিতে পারেন। রাজনৈতিক সরকারের কাছে সুবিধাবঞ্চিত প্রণোদনাপিপাসু কৃষকের জন্য এটি একটি বড় ধরনের আশীর্বাদ।
এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন প্রধানত ৩টি বিষয়ের উপর নির্ভর করবে যথা-১. প্রকৃত কৃষক নির্বাচন করা হলো কিনা; ২. প্রদেয় কৃষি আইটেম ও প্রণোদনা বরাদ্দ কারিগরিভাবে সঠিক কিনা; ৩. বস্তু ও প্রণোদনা ঋণ সঠিক সময়ে প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছালো কিনা।
এই প্রকল্প প্রণয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে প্রকৃত কৃষক নির্বাচনের পদ্ধতির উপর। এ জন্য মোট তিনটি ফরমে ও বর্ণনায় ২২টি ক্রাইটেরিয়া যুক্ত করা হয়েছে, যার অনেকগুলোই কৃষকের দক্ষতা-জ্ঞান, অর্থ, সময় ব্যয় ও নিজেদের উন্নয়ন সচেতনতাসাপেক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে- কৃষকের ডিজিটাল পরিচয়মিতি; ২. সরাসরি ভর্তুকি বস্তুর নাম; ৩. কৃষিঋণ সুবিধার বিবরণ; ৪. মাটির স্বাস্থ্য কার্ড সার বিবরণ; ৫. আবেদনকারীর উপযোগিতা ও স্থান; ৬. বাছাই প্রক্রিয়ার বিবরণ; ৭. কার্ডের সুবিধার বিবরণ; ৮. প্রাথমিক যোগাযোগ স্থানের বিবরণ; ৯. জমা দেয়ার জন্য দলিলপত্র; ১০. জাতীয় পরিচয়পত্র; ১১. সদ্য তোলা ছবি; ১২. ব্যাংকিং সুবিধাযুক্ত মোবাইল সেট ও নম্বর; ১৩. জমির তথ্য (যা খুব জটিল); ১৪. বর্গাচাষীদের জন্য চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন পত্র; ১৫. ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট; ১৬. মোবাইল নম্বর লিংকিং; ১৭. কার্ড সংগ্রহ পদ্ধতি; ১৮. বিশেষজ্ঞ সেবা পরামর্শ-আবহাওয়া, বাজারদর ও বালাই পরামর্শ (বর্তমানে সমস্যাপূর্ণ, নতুনভাবে করতে হতে পারে); ১৯. বিশেষ সেবা-নিরাপদ উৎপাদন- মানসম্মত বালাইনাশক ও উপকরণপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ (বর্তমানে সমস্যাপূর্ণ, নতুনভাবে করতে হতে পারে) ২০. নিজের নামে নেয়া অন্যান্য কার্ডের বিবরণ; ২১. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়।
প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনে এত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে দেখে মনে হতে পারে প্রকৃত কৃষক মনোনয়ন না পাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। তবে সঠিক বুঝা-পড়ার মাধ্যমে প্রকৃত কৃষক মনোনয়ন কাজ সাবলীল করা সম্ভব যা এখানে আলোচনা করা হলো। কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় যা সুচারু রাখতে সরকারকে খুবই একনিষ্ঠ হতে হবে, নয়তো কার্যক্রম কোনো এক পর্যায়ে বিফল হয়ে যেতে পারে।
কৃষক কার্ড সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকার প্রদান করবে। কিন্তু আবশ্যক দলিলপত্র তৈরি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কতো খরচ হবে?
একই পরিবারের পরিস্থিতিভেদে ১-২ জন কার্ড পেতে পারে, যা পক্ষপাতিত্বের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
আবেদন করার অনলাইন লিংক অসম্পূর্ণতায় ভুগতে পারে।
জরুরি স্মার্ট মোবাইল সেট ও অটিআই-এসএমএস কাজ অনেকেই হয়তো করতে সক্ষম হবে না।
৫. এনআইডি কার্ড অত্যাবশ্যক যা গ্রামীণ গরিব বয়স্ক কৃষকের জন্য ব্যবস্থা করা বড় সমস্যা হতে পারে।
যাই হোক অতি গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষক কার্ড কার্যক্রম সফল বাস্তবায়নের স্বপক্ষে কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফয়সালা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই আসে প্রকৃত কৃষক প্রসঙ্গ। কৃষক শব্দের অর্থ হলো- যিনি মাটির চাষাবাদ বা কৃষিকাজ করেন, সহজ কথায় কৃষিজীবী। যিনি নিজের ও অন্যের জমিতে ফসল উৎপাদন এবং গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে খাদ্য ও কাঁচামাল সরবরাহ করেন। সভ্যতার উষালগ্ন থেকে কৃষক মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে জীবিকা পালনে ভূমিকা রাখেন। যারা ক্ষেতের ফসল, বাগানের ফল, পোল্ট্রি ও গবাদিপশু পালনের সংমিশ্রণে কাজ করেন। কৃষকের সংজ্ঞা প্রদানে জাতিসংঘ, এফএও এবং ইউএসডিএ কমবেশি ভিন্ন ধারণা অন্তর্ভুক্ত করেছে। জাতিসংঘ নির্দেশনায়- কৃষক-যিনি ফসল, গবাদিপশু, বনায়ন ও জলজীব পালনসহ কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য খামার বা জমির ব্যবস্থাপনা পরিচালনা বা কাজ করেন। এফএও মূলত পারিবারিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের উপর গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে ইউএসডিএ-এর সংজ্ঞা প্রধানত অর্থনৈতিক ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে তৈরি। এফএও ও জাতিসংঘ নির্দেশিকা হলো- এফএও জোর দেয় যে কৃষকরা পরিবারকেন্দ্রিক, বেশির ভাগ পারিবারিক শ্রম ব্যবহার করে এবং উৎপাদনের একটি অংশ পরিবারের ভোগের জন্য ব্যবহার করে। খামারের ভৌত আকার দুই হেক্টরের কম বা গবাদিপশুর সংখ্যা যেমন ১০-১৫টি ট্রপিকেল লাইভস্টক ইউনিটের কম। কৃষক কৃষি কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। উৎপাদনের ঝুঁকি যেমন জমি প্রস্তুত, উপকরণ, বাজারজাতকরণ কৃষক নিজেই বহন করেন। কৃষকরা প্রায়শই তাদের শারীরিক পরিশ্রমে ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হন। উপরোক্ত বিষয়াবলীর আলোকে বাংলাদেশে এই প্রকল্পের জন্য বর্তমানে দেশে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে কৃষকের সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। কৃষককে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, নয়তো এই প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কৃষক নির্বাচন বিতর্কমুক্ত হবে না।
বর্তমানে দেশে প্রচলিত ও জনপ্রিয়ভাবে কৃষক অন্তত ২১ প্রকার হতে পারে- পরম্পরা কৃষক, জীবিকা কৃষক, বসত কৃষক, ভাসমান কৃষক, উপকরণ ডিলার কৃষক, বড় কৃষক, মাঝারি কৃষক, ক্ষুদ্র কৃষক, ভূমিহীন কৃষক, খণ্ডকালীন কৃষক, অনুপস্থিত কৃষক, সৌখিন কৃষক, ছাদ কৃষক, মহিলা কৃষক, প্রকল্প ঋণভিত্তিক কৃষক, মৎস্য, পশু ও বন কৃষক, ব্যবসায়ী কৃষক, খেলাপি কৃষক, বর্গা কৃষক, প্রজন্ম কৃষক, উদ্যোক্তা কৃষক, শ্রমিক কৃষক, ইত্যাদি সবাই প্রকল্পের কৃষক হিসেবে অংশগ্রহণের নিছক দাবিদার হতে পারেন। অতএব প্রকৃত কৃষক সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করলে বর্তমান প্রকল্প পূর্বের অনুরূপ পরিণতি হতে পারে। বাংলাদেশে বিগত আমলে কৃষি কার্ড ও সয়েল হেল্থ কার্ড চালু হয়েছিল। সেগুলোর বাস্তবায়ন ও সফলতা বিষয়ের অর্জিত অভিজ্ঞতা জানতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ও উদ্দেশ্যে কৃষি বা কৃষক কার্ড ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ভারতে এই কার্ড পিএম কিশান কার্ড নামে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে কৃষককে শুদ্ধভাবে সংজ্ঞায়িত করে শুরুতে অতি সহজ পদ্ধতিতে কার্যক্রম চালু করতে হবে। অতি বাহ্যিক উৎসাহে তাড়িত হয়ে তাৎক্ষণিক নয়, সুপরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত প্রকৃত কৃষকের অংশগ্রহণে এই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
লেখক: প্রফেসর ও কলামিস্ট
