সাত মাস বয়সী শিশুকন্যা আরিফার খাদ্যনালির সমস্যা নিয়ে ঢাকায় আসেন নোয়াখালীর ইমাদ উদ্দিন। গত ৩রা মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করান মেয়েকে। বর্তমানে হাসপাতালটির এনআইসিইউতে ডা. সায়েফা লুবনা মিলির তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুটি। এখন মেয়ের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও ডিসচার্জ করার মতো পজিশনে আসেনি। আরও ১০-১২ দিন চিকিৎসা নিতে হবে। এরইমধ্যে গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৬ শিশু মৃত্যুর ঘটনায় হাসপতালের লাইসেন্স বাতিলের আদেশ জারি করা হয়েছে। একইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের দ্রুত সময়ে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
এই নির্দেশনায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিশেষ করে আইসিইউ, এনআইসিইউ ও শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন রোগীদের হঠাৎ অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে তা রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)-তে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। এনআইসিইউ বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. সায়েফা লুবনা মিলি বলেন, তাদের ১৬ জন রোগী লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। জন্ডিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত এসব শিশুর অনেকেই সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছে। এনআইসিইউতে মোট ১০১টি বেড রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত চারজন শিশুকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। এনআইসিইউতে ভর্তি শিশুদের মধ্যে তাহমিনা নামের ৪১ দিনের এক নবজাতক, মাদারীপুরের নাফিসার ৭ মাস বয়সী কন্যা আরিফা এবং রোজিনার ৭ মাস ১১ দিনের শিশু লামিসাও চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতালের আইসিইউতে বর্তমানে ২০ জন রোগী চিকিৎসাধীন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক ডা. সামির হোসেন জানিয়েছেন, এদের মধ্যে ১২ থেকে ১৪ জনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। এসব রোগীকে অন্যত্র সরানো খুবই কঠিন। যেকোনো সময় বিপদ ঘটতে পারে। অনেক রোগী দীর্ঘদিন ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। তাদের স্থানান্তর করা হলে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।
আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে রয়েছেন ২৩ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক শিহাব উদ্দিন এবং ৬৫ বছর বয়সী কিডনি রোগী কালিপদ দত্ত রয়েছেন। তাদের স্বজনরা জানান, হঠাৎ হাসপাতাল পরিবর্তনের কথা শুনে তারা চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে বড় সংকটে পড়বেন।
এদিকে, শিশু ওয়ার্ডে মোট ৯০টি বেড রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি ফ্রি বেড রয়েছে। বর্তমানে ৪২ জন শিশু সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. মোহসিনা মোবাশ্বিরা মাইশা বলেন, শিশুদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে।
হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পরও দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু রোগী চিকিৎসা নেয়ার জন্য আসতে দেখা গেছে। এমনই একজন মধুবাগের সোনিয়া। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে গিয়েছিলেন। সেখানে তার ৫ মাস ২২ দিন বয়সী মেয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। স্থানীয় চিকিৎসকদের দেখিয়ে ওষুধপত্র সেবন করিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। শুক্রবার গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে তার মেয়েকে ভর্তি করানো হচ্ছে না। সোনিয়া এ প্রতিবেদককে জানান, বিয়ের ৯ বছর পর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের চিকিৎসকের চিকিৎসায় তার সন্তান হয়েছে। ওর কিছু হলেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা করাই। কিন্তু আজ ভর্তি নিচ্ছে না।
