ফ্রান্সে দিন দিন বাড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা। রাজধানী প্যারিসের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লিঁও-তেও গড়ে উঠেছে প্রাণবন্ত বাংলাদেশি কমিউনিটি। এখানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু শ্রমনির্ভর পেশায় নয়, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট ও মুদি ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করছেন। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং উদ্যোগী মনোভাবের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন, একই সঙ্গে বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও খাদ্য ঐতিহ্যও তুলে ধরছেন ইউরোপের মাটিতে।
লিও শহরে বর্তমানে বেশিরভাগ বাংলাদেশি প্রবাসী রেস্টুরেন্ট, আলিমঁতাসিওঁ বা মুদি দোকান ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা যেমন নিজেদের জীবিকা গড়ে তুলছেন, তেমনি স্থানীয় ও বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাবারের স্বাদ পৌঁছে দিচ্ছেন।
সম্প্রতি লিঁও প্রবাসী এবং সিলেটের বিশ্বনাথের বাসিন্দা মিয়া শায়েক। ‘Restaurant New Delhice-Tandoori’-তে চালু করেছেন ‘Bangladeshi Lyon Sweets House’ নামে একটি নতুন সুইটস কর্নার। এই কর্নারে পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী নানা স্বাদের মিষ্টি। রসগোল্লা, কালোজাম, লাড্ডু, চমচমসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। ইতিমধ্যেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শুধু বাংলাদেশিরাই নন, স্থানীয় ফরাসি ও অন্যান্য বিদেশি নাগরিকরাও এই নতুন স্বাদের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রবাস জীবনে দেশীয় স্বাদের এমন আয়োজন অনেকের মনেই ফিরিয়ে আনছে দেশের স্মৃতি।
এছাড়া কুষ্টিয়ার সন্তান মিঠু হক-এর ‘Oullins Tandoori’ লিঁওর আশপাশে দক্ষিণ এশীয় খাবারের একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে। নিজস্ব পরিশ্রম ও মানসম্মত সেবার মাধ্যমে তিনি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন।
লিঁও প্রবাসী এবং সিলেটের বিশ্বনাথের বাসিন্দা মোহম্মদ তুহিনও তার ‘New Taj Mahal Tandoori’ রেস্টুরেন্টের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় গ্রাহকদের কাছে তার রেস্টুরেন্টের সুনাম ক্রমেই বাড়ছে। প্রবাসের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা সহজ নয়, কিন্তু বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই এগিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে লিঁও প্রবাসী হালিম মোল্লা, হারুণ রহমান ও মো. মঈনুল ইসলাম যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘Decines Tandoori’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট। গত কয়েক বছর ধরে তারা সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। তাদের প্রতিষ্ঠানও লিওর বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাবারপ্রেমীদের কাছে একটি পরিচিত গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
শুধু রেস্টুরেন্ট নয়, মুদি ব্যবসাতেও বাংলাদেশিরা লিও শহরে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন। লিঁও প্রবাসী কাজী সজীব ও সোহেল হোসেন মিলে সম্প্রতি চালু করেছেন “Indian Supermarket” নামে একটি নতুন আলিমঁতাসিওঁ বা মুদি দোকান। এখানে পাওয়া যাচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, মসলা, সবজি, চাল-ডালসহ নানা সামগ্রী। এতে বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি ও অন্যান্য এশীয় কমিউনিটির মানুষের জন্য কেনাকাটা সহজ হয়েছে।
এছাড়া গাজীপুরের সোহান হোসেনও লিঁও শহরে মুদি ব্যবসায় নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত “Shohana Afro Asia Market” স্থানীয় বহুজাতিক কমিউনিটির কাছে ধীরে ধীরে একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠছে। দোকানটিতে আফ্রিকান ও এশীয় বিভিন্ন দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, মসলা, চাল-ডাল, শাকসবজি এবং সাংস্কৃতিক চাহিদাসম্পন্ন বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। ফলে শুধু বাংলাদেশিরাই নন, বরং আফ্রিকান ও এশীয় বংশোদ্ভূত অন্যান্য অভিবাসীরাও এ দোকান থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করছেন। প্রবাসে দেশীয় ও পরিচিত পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে তার এই উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে।
তবে লিঁও শহরে এই ধরনের মুদি ব্যবসার পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের বাসিন্দা পারভেজ হোসেন। তিনি প্রথম আলিমঁতাসিওঁ ব্যবসা শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। পরবর্তীতে অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করেছে ব্যবসায় নামতে।
প্রবাসের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও লিঁও শহরে বাংলাদেশিদের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের। তারা শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাচ্ছেন না, বরং বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করছেন বিদেশের মাটিতে। ব্যবসা, আন্তরিকতা ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে লিও শহরে গড়ে উঠছে এক শক্তিশালী বাংলাদেশি উপস্থিতি—যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলেই আশা করছেন প্রবাসীরা।

এই মিস্টি আমি এখনো খাইনি তবে ইনশাআল্লাহ একদিন আসবো
২ মাস আগেএখনো খাইনি তবে ইনশাআল্লাহ একদিন আসবো