ইরান যুদ্ধ ‘চার সপ্তাহের একটি দ্রুত অভিযান’ হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ভেঙে দেয়া এবং শাসন পরিবর্তনে বাধ্য করার। কিন্তু পাঁচ সপ্তাহ পার হওয়ার পর হোয়াইট হাউস এখন এমন এক সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, যা তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে এনেছে।
তেহরানে বোমা হামলা শুরুর আগে ডনাল্ড ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার সাহসী অভিযানের পর সহযোগীরা সেই অভিযানকে ‘অসাধারণ সামরিক সাফল্য’ বলেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার জেনারেলরা মনে করেছিলেন, তেহরানও ভেনেজুয়েলার মতো একইভাবে ভেঙে পড়বে।
পরিকল্পনাটি ছিল সহজ
দ্রুত ও শক্তিশালী আঘাত করা এবং তেহরান তাতে বাধ্য হবে ওয়াশিংটনের দাবি মেনে নিতে। কিন্তু ঘটেছে ঠিক উল্টো। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাফল্য এবং উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ভয় দেখিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালিতে হামলা চালায়। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নৌপথ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়ামের মজুত এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণেই। একই সময়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী। বড় বড় বিমানবন্দর জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায়। অর্থনৈতিক ক্ষতির মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। এসব বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কমতে থাকা জনপ্রিয়তার মুখে ট্রাম্পের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপসাগরীয় একজন কূটনৈতিক সূত্র বলেন, তারা (প্রশাসন) বিষয়টি অবমূল্যায়ন করেছে। ইরানের প্রতিক্রিয়ায় তারা বিস্মিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রশ্ন হলো- তারা কি তা নিয়ে চিন্তিত? বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে তারা খুব একটা চিন্তিত বলে মনে হয় না। তারা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রভাব নিয়ে ভাবছে। যদি তারা তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে এটিকে তারা আমেরিকান জনগণের কাছে সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে, যেমন ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে হয়েছিল।
বিকল্প সীমিত
ট্রাম্পের সামনে এখন সীমিত বিকল্প বাকি আছে। একদিকে আছে দ্রুত বাড়তে থাকা সংঘাত, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনী মোতায়েন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। অন্যদিকে রয়েছে পশ্চাদপসরণ, যা ট্রাম্পের স্বভাববিরুদ্ধ এবং অপমানজনক হতে পারে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে কয়েক সপ্তাহব্যাপী আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে অভিযান এবং হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি উপকূলীয় স্থাপনাগুলোতে হামলা। প্রায় ২২০০ সেনা নিয়ে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। আরও একটি ইউনিট ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট শিগগিরই যোগ দেবে। এ ছাড়া ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ৩০০০ প্যারাট্রুপারকেও সেখানে পাঠানো হয়েছে। তারা শত্রুপক্ষের পেছনে হেলিকপ্টার হামলা চালানো এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দখলের জন্য প্রশিক্ষিত। যদি এই অভিযান শুরু হয়, তাহলে তা আর্থিকভাবে ব্যয়বহুল হবে এবং অনেক মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকিও থাকবে। বিদেশে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত ট্রাম্পের জন্য এই উচ্চ ব্যয় একটি বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
লক্ষ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এ কারণেই প্রশাসন তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প নাকি ব্যক্তিগতভাবে তার সহযোগীদের বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ থাকলেও তিনি যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত। অর্থাৎ, তিনি এখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খোলার দায়িত্ব বৃটেন ও অন্যান্য ন্যাটো মিত্রদের ওপর দিতে চান। মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যেসব দেশ হরমুজ প্রণালির কারণে জেট জ্বালানি পাচ্ছে না যেমন বৃটেন, যারা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপে অংশ নেয়নি, তাদের জন্য আমার পরামর্শ আছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনুন। আমাদের কাছে প্রচুর তেল আছে। দ্বিতীয়ত, সাহস দেখান, প্রণালিতে যান এবং সেটি দখল করুন। তিনি আরও বলেন, নিজেদের জন্য লড়াই করতে শিখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আর সাহায্য করবে না, যেমন আপনারাও আমাদের সাহায্য করেননি। ইরান প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কঠিন কাজ শেষ। এখন নিজের তেল নিজেরাই জোগাড় করুন!
অবস্থান নরম হওয়ার ইঙ্গিত
এই কঠোর বক্তব্যের মাঝেও অবস্থান কিছুটা নরম হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সোমবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট যুদ্ধ শেষের মূল লক্ষ্য হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলার বিষয়টি উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, প্রণালি পুরোপুরি খোলা প্রশাসনের একটি লক্ষ্য। তবে অপারেশনের মূল উদ্দেশ্যগুলো প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তা
তবে একটি বড় সমস্যা রয়েছে। শান্তিচুক্তির জন্য ইরানের আলোচনায় বসা প্রয়োজন। ট্রাম্প দাবি করছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি ‘নতুন ও আরও যুক্তিসঙ্গত শাসনের’ সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে। কিন্তু ইরান বলছে, কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না। তারা কোনো শর্তও মানবে না। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যেও যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ট্রাম্পের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, আমাদের ‘মিত্ররা’ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা এগিয়ে আসছে না। এটি আমেরিকান জনগণের সঙ্গে বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।
ইরানের কৌশল
ইরান দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করে তারা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে চায়। কূটনৈতিক এক সূত্র বলেন, ইরানের জন্য যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই ভালো। এতে তারা আরও বেশি দাবি তুলতে পারবে। বৃটেনও একই ধরনের হতাশাবাদী অবস্থানে রয়েছে। হোয়াইট হলের এক সূত্র বলেন, কিছুদিন আগে মনে হচ্ছিল ইরান সমঝোতা চাইছে। কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্য তাদের এখন আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
অর্থনীতি ও জনপ্রিয়তায় প্রভাব
মঙ্গলবার যুদ্ধের ৩২তম দিনে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ১১৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। চারদিনের জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৬ শতাংশ আমেরিকান তার কাজকে সমর্থন করছে। যা আগের সপ্তাহের ৪০ শতাংশ থেকেও কম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় তার পারফরম্যান্সে মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট, যা ২০২৪ সালের নির্বাচনে তার প্রচারের মূল ইস্যু ছিল। নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে সংবেদনশীল এই প্রেসিডেন্টের জন্য যুদ্ধের সমাপ্তি হয়তো তিনি যতটা ভেবেছিলেন, তার চেয়েও দ্রুত আসতে পারে।
