বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই, লোডশেডিং বন্ধে ১৮০ দিনের পরিকল্পনা: সংসদে মন্ত্রী

বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই, লোডশেডিং বন্ধে ১৮০ দিনের পরিকল্পনা: সংসদে মন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

দেশে চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তবে গ্রীষ্মকালে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি ও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতায় মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রাহকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ও লোডশেডিং বন্ধে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
বিদ্যুতের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিং বন্ধে বিদ্যুৎ বিভাগের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনার কথা সংসদে তুলে ধরেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া, প্রাথমিক জ্বালানির চাহিদা মোকাবিলায় জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ, ঘোড়াশাল এবং নারায়ণগঞ্জের ৭৪টি মনোনীত ভোক্তার (ডিসাইন্যাটেড কনজিউমার) স্থাপনায় জ্বালানি নিরীক্ষা কার্যক্রম চলছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় এ কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে ৪২ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি নিরীক্ষক এবং ১৭৮ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি ব্যবস্থাপক তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে হলি-ডে স্ট্যাগারিং এবং ডিমান্ড ও সাপ্লাই সাইড ম্যানেজমেন্ট করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারি অফিস ভবনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারে গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া, এসি’র তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যবহার শেষে সুইচ বন্ধ করার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পিক আওয়ারে পানির পাম্প, ওভেন, হিটার, ইস্ত্রির দোকান, ওয়াশিং মেশিন ও ওয়েল্ডিং মেশিন বন্ধ রাখার বিষয়ে গণশুনানির মাধ্যমে গ্রাহকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে পিক আওয়ারে মার্কেট ও শপিংমলে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা পরিহারের জন্য নিয়মিত ভিজিলেন্স টিম কাজ করছে। এ ছাড়া, অটোচার্জিং স্টেশনগুলোকে পিক আওয়ারে চার্জ না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার রোধে প্রতিনিয়ত রাত্রিকালীন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও সংসদকে জানান মন্ত্রী।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২,৩৩২ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মদের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এসব কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অস্বাভাবিক মূল্যে করেছে, আলোচনাক্রমে এ চুক্তি সংশোধনের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এ কথা জানান।
তেলের জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি মন্ত্রী কি দেখছেন না?
জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের পেট্রোল পাম্পগুলো ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তেলের জন্য রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি। মন্ত্রী কি এসব দেখতে পাচ্ছেন না? জাতীয় সংসদে এমন প্রশ্ন তুলেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, তবে ‘ইরানের ঘটনার’ পর মানুষের মাঝে প্যানিক বায়িং (আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা) শুরু হওয়ায় পাম্পে দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নোত্তর পর্বে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
তেল না পেয়ে এমপিরাও সংকটে, মজুতদার ডিলারদের ধরতে পুলিশ ডাকার পরামর্শ: জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে সংসদ সদস্যদের (এমপি) অসম্মানিত হওয়া ও সংকটে পড়ার বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। একইসঙ্গে তার এলাকায় ডিলারদের কারসাজি করে বাড়িতে লুকিয়ে তেল বিক্রির অভিযোগও তোলেন তিনি। জবাবে মন্ত্রী বলেন, ডিলাররা লুকিয়ে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্যে তাদের ধরে এনে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া, রাত ৮টায় দোকানপাট বন্ধ রাখার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে গোটা বিশ্বই এখন সাশ্রয়ী হচ্ছে।
সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বুধবার দেখলাম আমাদের একজন সম্মানিত সংসদ সদস্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছুটা অসম্মানিত হয়েছেন। এর আগে আরেকজন সংসদ সদস্য তেল না পেয়ে সংকটে পড়েছিলেন। আমরা ছোটখাটো জনপ্রতিনিধি, দিনে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টা ফোন পাচ্ছি। আমার এলাকা বাউফলে পেট্রোল পাম্প না থাকায় ডিলাররা কারসাজি করছেন। তারা দোকান বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের বাড়িতে তেল বিক্রি করছেন। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট গেলে তাদের কাউকে পাওয়া যায় না। মন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে তিনি আরও বলেন, আজকে মন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তার সঙ্গে আমাদের এলাকার পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। রাত ৮টার মধ্যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে বলা হচ্ছে। আমার এলাকা বাউফলে জ্বালানি সংকটে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা উত্তরণে মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আমাদের যে মজুত আছে এবং যে এলাকায় প্রতিদিন যতটুকু তেল দেয়ার কথা, আমরা তা সরবরাহ করছি। মাননীয় সদস্য নিজেই বললেন, ডিলাররা ইচ্ছা করে পালিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানালে তারা ওই ডিলারকে ধরে এনে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক সমস্যা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সারা পৃথিবীতেই এটি এখন খুব বড় সমস্যা। তারপরও আমরা বাংলাদেশে এটা সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু মানুষের মধ্যে যদি প্যানিক বায়িং (আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা) সৃষ্টি হয়, তবে তা রোধ করা কঠিন। আমরা মানুষের কাছে আবেদন করছি, আপনাদের যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই কিনুন। এটি করলে জ্বালানি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন