পাটুরিয়া দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ২১ বছরে ৫ নৌ-দুর্ঘটনা নিহত ২৫০

পাটুরিয়া দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ২১ বছরে ৫ নৌ-দুর্ঘটনা নিহত ২৫০

ফন্ট সাইজ:

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট ফেরি ও লঞ্চঘাট। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের অন্যতম এই নৌপথে কখনো বাস, কখনো লঞ্চ, আবার কখনো ফেরি ডুবির ঘটনা নিত্যদিনের আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃটিশ আমলের পুরাতন ফেরির সঙ্গে লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে যাত্রীসেবা দিচ্ছে বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএ।

এদিকে প্রতিনিয়ত এ পথে নৌ-দুর্ঘটনায় যাতায়াতে আস্থা হারিয়ে ফেলছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষজন। তারা নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে জোরালো দাবি তুলছেন। সমপ্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা তাদের দাবির পক্ষে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে অনুরোধ জানিয়ে নৌপরিবহন ও সড়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। তাছাড়া বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও ওঠে এসেছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি।
বিগত দিনের নৌ-দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ২০০৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বড় ধরনের দুইটি লঞ্চ দুর্ঘটনার পাশাপাশি দুইটি ফেরি এবং একটি যাত্রীবাহী বাসসহ ৫টি দুর্ঘটনায় ২৫০-এর ওপরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

গত ২৫শে মার্চ দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হয়ে ২৬ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও ওইসব তদন্ত কমিটির কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিফলন হয়নি। নৌপথের অব্যবস্থাপনাকেই এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের মানুষজন। প্রতিনিয়তই নৌ দুর্ঘটনা পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনের শিরোনাম রিপোর্ট হচ্ছে।

পাঁচটি নৌ-দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৫ সালের ১৭ই মে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটের আরিচা ঘাটসংলগ্ন অন্বয়পুর এলাকায় প্রায় ২০০ জন যাত্রী নিয়ে কালবৈশাখীর ঝড়ের আঘাতে এমভি রায়পুরা নামক লঞ্চ যমুনা নদীতে নিমজ্জিত হয়। যমুনা নদীর গহীনে নিমজ্জিত লঞ্চটি উদ্ধারে টানা ৫ দিন উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। ওই দুর্ঘটনায় পুলিশের তালিকায় নিখোঁজ যাত্রী ছিল ১০৯ জন। পাঁচদিনে উদ্ধার করা হয় ৫৫ জনের মরদেহ। এরমধ্যে ২৯ জনের মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের মাঝে তুলে দেয়া হলেও বাকি ২৬ জনের পরিচয় না পাওয়ায় তাদের আরিচা-বোয়ালিয়া কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। দুর্ঘটনার ২১ বছর পরও পুলিশের তালিকা অনুযায়ী ১০৯ জন নিখোঁজ হিসেবেই রয়ে গেছে। ওই দুর্ঘটনায় লঞ্চটিও আর উদ্ধার করতে পারেনি উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম।

দ্বিতীয় লঞ্চ ডুবির ঘটনা ঘটে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের মাঝ পদ্মা নদীতে। ২০১৫ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারিতে এমভি মোস্তফা লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৭০ জন যাত্রী নিহত হয়। এর মধ্যে ২৭ জন পুরুষ, ২৪ জন নারী ও ১৯ জন শিশু ছিল। ওই লঞ্চ ডুবিতে নিহত ৬৯টি লাশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা কাজিরহাট নৌরুটে ২০২১ সালে রো রো বড় ফেরি আমানত শাহ ও ২০২৪ সালে ইউটিলিটি ছোট ফেরি রজনীগন্ধা পদ্মানদীতে নিমজ্জিত হয়। তবে ফেরি ডুুবির ঘটনায় একজন ফেরি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মৃত্যু হলেও হতাহতের তালিকা ছিল না।

২০২৪ সালের ১৭ই জানুয়ারি পাটুরিয়া ৫ নং ফেরিঘাট সংলগ্ন মাঝ নদীতে রজনীগন্ধা নামক ফেরিটি বাল্কহেডের ধাক্কায় পদ্মা নদীতে ডুবে যায়। ফেরিতে নয়টি ট্রাক থাকলেও কোনো যাত্রীবাহী বাস ছিল না। এই দুর্ঘটনায় রজনীগন্ধা ফেরির দ্বিতীয় ইঞ্জিন মাস্টার হুমায়ুন কবিরের মরদেহ ৬ দিন পর দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ভাটি অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০২১ সালের ২৭শে অক্টোবর পাটুরিয়া ৫নং ফেরিঘাট সংলগ্ন পদ্মা নদীতে আকসিকভাবে ডুবে যায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে বড় ওরফে আমানত শাহ। দৌলতদিয়া থেকে ১৭টি পণ্যবাহী ট্রাক আর কিছু মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরি পাটুরিয়া ৫নং ঘাটে নোঙর করার মুহূর্তেই তলা ফেটে হঠাৎ নদীতে ডুবে যায়। তবে এই দুর্ঘটনায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সূত্র মতে, ফেরিটি ৪০ বছরের পুরানো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। গত ২৫শে মার্চ বিকালে দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরিঘাটের পন্টুন ভেদ করে পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হয় সোহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস। পন্টুনে রেলিং না থাকায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেলে ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে ছিল ৮ জন শিশু, ১১ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ। ৬ ঘণ্টা পর নদীতে নিমজ্জিত বাসটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা।

সর্বশেষ এই নৌ-দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একাধিক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, ঘাট ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। ডিজিটাল জামানায় পুরানো ব্যবস্থাপনায় ফেরি সার্ভিস সচল রাখায় নদীতে বাস পড়ে যাওয়াকেই দায়ী করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে প্রতিনিয়ত নৌ-দুর্ঘটনা দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের যাতায়াতকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। নিরাপত্তাহীনতায় ২১টি জেলার মানুষ। এই অবস্থায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের দাবি তুলেছেন। ঘটনার পরপরই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের অনুরোধ জানিয়ে গত ২৯শে মার্চ নৌ পরিবহন ও সড়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। তার এই উদ্যোগ দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার লাখো মানুষের ভেতর দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে। আফরোজা খানম রিতা মানবজমিনকে বলেন, তিনবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি অনুরোধ জানিয়ে নৌপরিবহন ও সড়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। ইনশাআল্লাহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করবেন।
আফরোজা খানম রিতা বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঢাকা-পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুট, যা বৃহত্তর ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের জেলাসমূহের একমাত্র সড়ক ব্যবস্থা। পদ্মা ও যমুনা সেতু চালু হলেও এসব অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা এখনো জনবান্ধব হয়ে উঠেনি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন