ডনাল্ড ট্রাম্প কি পিছিয়ে যাচ্ছেন? সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, যদি আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা না যায়, তাহলে তিনি ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেই সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। মঙ্গলবার তিনি আরও বলেন, বৃটেনসহ যেসব দেশ জেট জ্বালানির সংকটে পড়েছে, তারা যেন ‘নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করে’। তার এ কথা ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি বিষয়টি নিজের কাঁধে আর না রেখে অন্যদের ওপর ছেড়ে দিতে চাইছেন।
ট্রাম্প যদি এই ইস্যু থেকে সরে দাঁড়ান, তাহলে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কী হবে? ইরান কি এটি বন্ধই রাখবে? টোল আদায় করবে? নাকি স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করবে? নাকি আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক জোটকে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে? বর্তমান পরিস্থিতি অস্পষ্ট হওয়ায় ভবিষ্যৎ অনুমান করা কঠিন। তবে এক্ষেত্রে চার রকম ঘটনা ঘটতে পারে। ১. নতুন স্বাভাবিক অবস্থা, ২. টোল আরোপ, ৩. আন্তর্জাতিক বা জাতিসংঘ করিডোর ও ৪. স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া।
১. নতুন স্বাভাবিক অবস্থা
প্রথম সম্ভাবনা হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরান তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। মেরিটাইম গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল বকম্যানের ভাষায়, হরমুজ প্রণালিতে এখন ‘সিলেক্টেড অবরোধ’ চলছে। ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয় বীমা খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। বেশির ভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে ইরান ও তার মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। ১৫ই মার্চ থেকে ইরান ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নিয়ন্ত্রণে একটি আধা-আনুষ্ঠানিক ট্রানজিট করিডোর চালু করেছে, যা লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে যায়। এতে জাহাজগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি করা সম্ভব। এই ব্যবস্থা অনেকটা ইয়েমেনের হুতিদের লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণের মতো। তবে আরও কঠোর। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৩৮টি জাহাজের পরিবর্তে মাত্র কয়েকটি জাহাজ চলাচল করছে। তবে ধীরে ধীরে এটি বাড়তে পারে। চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ কিছু দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করছে। ইরান আগের মতোই তেল রপ্তানি করছে বরং দাম বাড়ায় আয় দ্বিগুণ হয়েছে।
২. টোল আরোপ
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো ইরান শুধু নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে না, বরং তা থেকে আয়ও করবে। তেহরান ইতিমধ্যে শান্তির শর্ত হিসেবে প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দাবি করেছে। ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি বলেন, লারাক রুট দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার করে নেয়া হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তবুও ইরানের পার্লামেন্ট জাহাজ থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে এবং তাদের সঙ্গে আয় ভাগাভাগির প্রস্তাবও থাকতে পারে। এমনকি পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের একটি বহুজাতিক জোট এই প্রণালির তেল পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও টোল আদায়ের প্রস্তাবও দিয়েছে। এটি বড় আয়ের উৎস হতে পারে, যেমন মিশর সুয়েজ খাল থেকে প্রতি মাসে শত কোটি ডলার আয় করে। তবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের অধীনে উন্মুক্ত জলপথে টোল আরোপ সম্ভবত অবৈধ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এটি শুধু অবৈধ নয়, অগ্রহণযোগ্য এবং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
৩. আন্তর্জাতিক বা জাতিসংঘ করিডোর
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো একটি আন্তর্জাতিক জোট প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেবে। রুবিও জি-৭ দেশগুলোর কাছে একটি বহুজাতিক ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে কোনো টোল থাকবে না এবং অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা হবে। বৃটেন ৩০টি দেশের নৌবাহিনী প্রধানদের নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। এই উদ্যোগে যুদ্ধজাহাজ ও সশস্ত্র ড্রোন দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেয়া হতে পারে, যা ১৯৮০-এর দশকের ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’-এর মতো হতে পারে। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধবিরতি ও ইরানের সম্মতি প্রয়োজন। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) ইতিমধ্যে একটি ‘মানবিক সমুদ্র করিডোর’-এর প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে আটকে পড়া হাজার হাজার নাবিক নিরাপদে বের হতে পারেন।
৪. স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া
চতুর্থ এবং সবচেয়ে কম সম্ভাবনা হলো প্রণালি আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। বিশ্লেষক ফারজান সাবেতের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা ইরানের ‘শেষ অস্ত্র’। এটি একটি চরম পদক্ষেপ। তিনি বলেন, যদি ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করে সরে যান, তাহলে প্রশ্ন হবে- ইরান কি হামলা ও টোল আদায় চালিয়ে যাবে? যদি তা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো আবার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে। ফলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে।
এই বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা যায়, ইরান হয়তো বাইরে শক্ত অবস্থান দেখালেও বাস্তবে বড় ক্ষতির মুখে রয়েছে। সম্ভবত তাদের দাবি- টোল, সার্বভৌমত্ব বা ক্ষতিপূরণ আসলে চাপ সৃষ্টির কৌশল, যাতে শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়।
চূড়ান্ত বাস্তবতা
ডনাল্ড ট্রাম্প আশা করছেন, একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে দ্রুত সমাধান আসবে। তবে বাস্তবতা হলো যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা চলতে থাকলে আইআরজিসি প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে। বর্তমানে সবচেয়ে নিশ্চিত বিষয় হলো, এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত থাকবে এবং এর প্রভাব কয়েক মাস ধরে চলতে পারে, সপ্তাহ নয়।
(লেখক দ্য টেলিগ্রাফের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক। ব্যাটললাইনস পডকাস্ট্রের সহ-উপস্থাপক। এর আগে তিনি পত্রিকাটির মস্কো প্রতিনিধি ছিলেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফিকা ও এশিয়া জুড়ে যুদ্ধ, বিপ্লব এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার এ লেখাটি অনলাইন টেলিগ্রাফ থেকে অনুবাদ)
