মধ্যপ্রাচ্যে নাটকীয় উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা এবার বৃটেনের মাটিতেও পৌঁছে গেছে। ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা বৃটেন সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করতে পারে। লন্ডনে ইরানের রাষ্ট্রদূত সাইয়্যেদ আলি মুসাভি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ঘাঁটিগুলো বৈধ লক্ষ্য হতে পারে। উত্তেজনা আরও বাড়লে সেগুলো ইরানের হামলার আওতায় পড়তে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। গত মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর হামলা চালাতে আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ও দিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহার করেছে। শুরুতে ডাউনিং স্ট্রিট এসব অভিযান অনুমোদন দিতে অনাগ্রহ দেখায়। প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার প্রথমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তবে পরে ইরান যখন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার পদক্ষেপ নেয়, তখন অবস্থান বদলান স্টারমার। ফলে তেহরান এখন কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। মুসাভি টাইমস রেডিওকে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা আমরা বিবেচনা করছি। আত্মরক্ষার জন্য এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ব্যবস্থার সামরিক অংশ এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবে। এটি নির্ভর করছে আপনাদের কর্মকাণ্ডের ওপর। এ বিষয়ে বৃটেন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরও নির্ভর করছে। সব বিকল্প বিবেচনায় রাখা উচিত। আমরা নিজেদের কীভাবে রক্ষা করবো, সে বিষয়ে খুবই সতর্ক ও সংবেদনশীল।’
এই শীতল বার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন বৃটেন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে কতোটা অরক্ষিত, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বৃটেনের পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। গত মাসে ইরান দিয়েগো গার্সিয়ার দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। একটি ভূপাতিত করা হয়, অন্যটি মাঝপথেই ব্যর্থ হয়। এই সংঘাতে এটিই ছিল দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রথম নিশ্চিত ঘটনা। সে সময় বৃটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ইরানের বেপরোয়া হামলা, অঞ্চল জুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করে রাখা- এসব বৃটিশ স্বার্থ ও বৃটিশ মিত্রদের জন্য হুমকি।
বিমান প্রতিরক্ষা জোরদারে ১০০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতরের বিলম্বে কাজ এগোয়নি। ফলে বৃটেন এখনো ন্যাটো মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল। এদিকে অর্থনৈতিক প্রভাবও বাড়ছে। ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে বৃটেনকে লক্ষ্য করে কিয়ের স্টারমারকে বলেন, ‘নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করুন।’ অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সতর্ক করে বলেন, এই পথ পুনরায় খুলে দেয়া ‘বলা যত সহজ, করা তত সহজ নয়।’
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যেসব দেশ ‘যেমন বৃটেন’- ‘ইরানের মাথা কেটে ফেলার অভিযানে’ অংশ নিতে অস্বীকার করেছে, তাদের হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনতে হবে, নয়তো দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠা যুদ্ধে জড়াতে হবে। তিনি বলেন, তোমাদের নিজেদের জন্য কীভাবে লড়তে হয়, তা শিখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আর তোমাদের সাহায্য করতে থাকবে না, যেমন তোমরা আমাদের পাশে দাঁড়াওনি। ইরান কার্যত গুঁড়িয়ে গেছে। কঠিন অংশ শেষ। এখন নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করো!
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও যুদ্ধে যোগ দিতে বৃটেনের অনীহা নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শেষবার আমি যখন দেখেছিলাম, তখন তো মনে হয়েছিল একটি শক্তিশালী রয়েল নেভি আছে, যাদের এমন কাজের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা। এই সমালোচনার জবাবে কাতার সফরের সময় বৃটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেন, তার দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।
ট্রুথ সোশ্যালে আরেকটি পোস্টে ট্রাম্প ফ্রান্সকেও ‘খুবই অসহায়ক’ বলে আক্রমণ করেন, বিশেষ করে ‘ইসরাইলগামী সামরিক সরঞ্জামবোঝাই বিমানকে ফরাসি আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেয়ার’ জন্য। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের কার্যালয় জানায়, ইরানের ওপর হামলার জন্য ফরাসি ঘাঁটি ব্যবহার বা আকাশসীমা খোলার অনুমতি না দেয়ার অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল। তারা বলে, এই টুইট দেখে আমরা বিস্মিত। সংঘাতের প্রথম দিন থেকে ফ্রান্স তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি এবং আমরা সেই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করছি।
অন্যদিকে আটলান্টিকপাড়ের জোটেও টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। কিয়ের স্টারমার মার্কিন হামলাকে ‘পর্যাপ্তভাবে ভেবে দেখা হয়নি’ এবং ‘বিশ্বাসযোগ্য নয়’ বলে সমালোচনা করেছেন। এর জবাবে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে কটাক্ষ করে স্টারমারকে বলেন, তিনি ‘উইনস্টন চার্চিল নন’।
ইরানে যুদ্ধের উত্তেজনা বৃটেনের মাটিতেও
মানবজমিন ডেস্ক
২ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
