রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারকে একসঙ্গে একাধিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যে সংকটগুলো সরকারকে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতারও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে হামের পুনরুত্থান, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির চাপ। এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেই তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে—যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন একেকটি ভারসাম্যের সুকঠিন চ্যালেঞ্জ।
প্রথমেই আসা যাক জনস্বাস্থ্য সংকটের দিকে। একসময় বাংলাদেশে হাম কার্যত নির্মূলের পথে ছিল। টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবারও এই রোগের বিস্তার একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—কেন এই ফিরে আসা? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় অতীতের অব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য খাতের অবহেলা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের দিকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যখন একটি দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গজ-ব্যান্ডেজ কেনার মতো অর্থ সংকটে পড়ে, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত।
তবুও বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো—হাম প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রমের জন্য অর্থ বরাদ্দ। এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি একটি মানবিক প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ। কারণ একটি শিশুর জীবন বাঁচানো মানে একটি ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। সীমিত সম্পদের মধ্যেও এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি খাতের সংকট আজ প্রায় প্রতিটি দেশের জন্যই এক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক দেশই বাধ্য হয়ে জ্বালানির দাম দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতায়ও বাংলাদেশ সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম না বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সাহসী এবং জনবান্ধব।
শুধু তাই নয়। ১ লক্ষ ৯৩ হাজার টন তেল মজুদ সত্ত্বেও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরো ২ লক্ষ ৬০ হাজার টন জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত মার্চ মাসে প্রায় তিন লক্ষ লিটার তেল জব্দ করা হয়েছে। দেশব্যাপী অবৈধ মজুদদারিদের বিরুদ্ধে চলছে সাঁড়াশি অভিযান। এসবই জনমনে আশার সঞ্চার করছে।
সুতরাং তেলের দাম না বাড়ানো কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। এই বার্তা হলো, সরকার জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। যখন বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি টালমাটাল, তখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে—এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মূল্যস্ফীতির প্রভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বরং বাস্তবতা হলো—বিশ্ববাজারের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে। সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে। কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের কিছু উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে ক্রীড়াবিদদের জন্য গতকাল সোমবার ভাতা কার্যক্রম চালুর বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এই ধরনের সামাজিক বিনিয়োগ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে, সরকার শুধু সংকট মোকাবেলাতেই ব্যস্ত নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নেও নজর দিচ্ছে।
তবে এই অর্জনগুলোর পেছনে যে কঠিন বাস্তবতা রয়েছে, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অর্থ লুটপাট, নীতিহীনতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই একদিনে সমাধানও সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দায় কার?
অতীতের শাসনামলে যে অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, তার বোঝা এখনকার সরকারকেই বহন করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার অভাব, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয়—সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকারের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবুও আশার জায়গা হলো—সরকার হাল ছাড়েনি। বরং সংকটকে সামনে রেখেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন কার্যক্রম থেমে নেই, বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
এই তৎপরতা কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সংকল্পের প্রতিফলন। কারণ সংকটের সময়ই একটি সরকারের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়।
প্রসঙ্গত,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর ঘোষিত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে খন্দকার শামসুল আলম ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব খন্দকার আল আশরাফ মামুনের উদ্যোগে সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার খামা গ্রাম স্থাপন করেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি খাল খনন রূপ নেয় উৎসবে। মানুষের হাতে কোদাল, মনে আশার আলো—এই দৃশ্য প্রমাণ করে উন্নয়ন এখন আর শুধু সরকারের কোনো প্রকল্প নয়, বরং মানুষের নিজের লড়াই, নিজের স্বপ্নের অংশ।
তবে সমালোচনার জায়গাও রয়েছে—এবং তা থাকা উচিত। কারণ গণতন্ত্রে সমালোচনা হলো উন্নতির অন্যতম শর্ত। স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্গঠন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—এই বিষয়গুলোতে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশেষ করে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু টিকাদানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি।
একইভাবে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া বর্তমান সংকট থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণ সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এটি এমন একটি সমস্যা, যা সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এখানে শুধু নীতিনির্ধারণ নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি জটিল সময় পার করছে। কিন্তু এই জটিলতার মধ্যেও সরকারের যে সক্রিয়তা এবং সংকল্প দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
ইতিহাস বলে—সংকটই জাতিকে নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, যদি নেতৃত্ব সঠিক হয় এবং সিদ্ধান্তগুলো সময়োপযোগী হয়। তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সেই কঠিন পথেই হাঁটছে—যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই চ্যালেঞ্জে ভরা, কিন্তু সম্ভাবনাময়।
এখন দেখার বিষয় হলো, সরকার এই সংকটকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করে একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সাফল্য শুধু তার সিদ্ধান্তে নয়, বরং সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে তার ওপরই নির্ভর করে। তবে স্বীকার করতেই হবে যে, সংকটের মুহুর্তেও সরকারের সাহসী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
হাম,জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতি: ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখেও তৎপর সরকার
আহসান হাবিব বরুন
অনলাইন
২ মাস আগে
১ এপ্রিল (বুধবার), ২০২৬, ১১ঃ১০ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
