দেশে নিষিদ্ধ পলিথিন শপিং ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। তারা গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে বলেছেন, নিষিদ্ধ পলিথিন শপিং ব্যাগের এই ব্যাপক ব্যবহার কেবল পরিবেশগত উদ্বেগই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিফলন। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন অমান্য করার এই স্বাভাবিক প্রবণতা পরিবেশগত বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
বুধবার রাজধানীর লালমাটিয়াস্থ কার্যালয়ে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডো’র এই সংক্রান্ত একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে গবেষকরা এই কথা জানান। ‘বিয়ন্ড দ্য ব্যান: আনপ্যাকিং পলিথিন ডিপেন্ডেন্সি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।
গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরের অনেক ভোক্তার উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও পলিথিন শপিং ব্যাগের ব্যবহার কমেনি, যা পরিবেশগত সচেতনতা এবং শিক্ষাক্রমের বড় ধরনের ঘাটতিকে নির্দেশ করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশেরও বেশি বিক্রেতা জানেন যে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ, তবুও তারা নিয়মিত এটি ব্যবহার করছেন।
জরিপটি নির্দেশ করে যে, উচ্চশিক্ষা আচরণ পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও শিক্ষিত শহরের ভোক্তারা পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে যাচ্ছেন, যা শিক্ষার গুণগত মানের একটি বড় ঘাটতি।
খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে পলিথিনের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। অর্ধেক বিক্রেতা দৈনিক ৫০টিরও বেশি ব্যাগ ব্যবহার করেন, যেখানে মাত্র ২ শতাংশ বিক্রেতা পলিথিন একদমই ব্যবহার করেন না বলে জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করার ২৪ বছর পর একটি নতুন জাতীয় গবেষণায় এই আইনের বাস্তবায়নে থাকা আইনগত ফাঁকফোকর, দুর্বল প্রয়োগ, বিকল্প ব্যবস্থার অভাব এবং শাসন ব্যবস্থার ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে। এসব কারণই এই ঐতিহাসিক পরিবেশ আইনটির প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণার ফলাফল পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন, জনসচেতনতা এবং বাংলাদেশ কীভাবে তার অগ্রণী নীতিগুলোকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে পারে এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের শহর, উপশহর এবং গ্রামীণ অঞ্চলের ২,০০০-এরও বেশি ভোক্তা ও বিক্রেতার মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১৮০০ সাধারণ ভোক্তা এবং ২০০ জন বিক্রেতার উপর এই জরিপ চালানো হয় বলে জানান গবেষকরা। গত বছর ধরে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা, সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, নীতি বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, খুচরা ব্যবসা ব্যবস্থাপক এবং পরিবেশ খাতের অংশীজনদের মতামতও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা পলিথিন শপিং ব্যাগের সঙ্গে দেশের বর্তমান সম্পর্কের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। পাশাপাশি, এই আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান মূল্যায়ন করতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সরকারি প্রতিনিধিদেরও দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে সস্তা, সহজে প্রাপ্যতা, সুবিধা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে ভোক্তা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই পলিথিন ব্যাগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো একক ব্যক্তির পছন্দের বিষয় নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা যেমন দুর্বল আইন প্রয়োগ, আইনি ফাঁকফোকর, পরিবেশগত শিক্ষার অভাব, সাশ্রয়ী বিকল্পের সীমিত প্রাপ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা।
গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যগুলোর একটি হলো, শিক্ষা ও পরিবেশগত আচরণের মধ্যে অমিল। শহরের অনেক ভোক্তার উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও পলিথিন শপিং ব্যাগের ব্যবহার কমেনি, যা পরিবেশগত সচেতনতা এবং শিক্ষাক্রমের বড় ধরনের ঘাটতিকে নির্দেশ করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশেরও বেশি বিক্রেতা জানেন যে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ, তবুও তারা নিয়মিত এটি ব্যবহার করছেন। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল সচেতনতা আইন মানার জন্য যথেষ্ট নয়।
অনুষ্ঠানে এসডো’র চেয়ারম্যান, সাবেক সচিব সৈয়দ মারগুব মোরশেদ বলেন, পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল; এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই যুগান্তকারী আইনটি যেন তার কাঙ্ক্ষিত প্রভাব নিশ্চিত করতে পারে।
এসডো’র সাধারণ সম্পাদক ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, পলিথিনের ওপর নির্ভরশীলতা মোকাবিলায় বহুখাতভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, কিন্তু পর্যাপ্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মিসেস সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, এই প্রতিবেদনটি মূলত বাংলাদেশের পরিবেশগত লক্ষ্যগুলোকে বাস্তব ও উল্লেখযোগ্য সাফল্যে রূপান্তর করার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান। যদি ২০০২ সালে এটি সম্ভব হয়ে থাকে, তবে আজও তা সম্ভব।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদা তামান্না খান বলেন, পলিথিন উৎপাদনকারী সিন্ডিকেট অত্যন্ত শক্তিশালী, তবে এই পরিস্থিতিতে আমাদেরও তেমনি শক্তিশালী প্রয়োগ নীতি ও সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে যা তাদের মোকাবিলা করতে পারে।
গবেষণাটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, পলিথিন শপিং ব্যাগ মুক্ত একটি ভবিষ্যৎ অর্জন করতে হলে পরিবেশগত শিক্ষার শক্তিশালীকরণ, নীতি সংস্কার, উন্নত আইন প্রয়োগ, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য বিকল্প, একটি ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশীজনদের সহায়তা প্রদান এবং সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের মধ্যে আরও জোরালো সমন্বয় প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করে বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সুরক্ষায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয় এবং বিশ্বজুড়ে অন্য দেশগুলোকে অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রাণিত করে। তবে এই ঐতিহাসিক অর্জনের পরেও পলিথিন শপিং ব্যাগ বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে, যা পরিবেশগত সুশাসন, আইনের আনুগত্য এবং সরকারি নীতির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। নতুন এই গবেষণা কেবল নিষেধাজ্ঞাটি ব্যর্থ হয়েছে কিনা তা জিজ্ঞাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে: কেন এমন একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন আইন, নাগরিকদের আচরণকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হলো?
