‘ভাবনায় নেই ক্রিকেটাররা’ চোখ শুধু বিসিবি’র চেয়ারে

‘ভাবনায় নেই ক্রিকেটাররা’ চোখ শুধু বিসিবি’র চেয়ারে

ফন্ট সাইজ:

দেশের ক্রিকেট কাঠামোর প্রাণকেন্দ্র ঢাকার ঘরোয়া লীগ এখন সম্পূর্ণ অচল। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং ক্লাবগুলোর মধ্যকার চরম দ্বন্দ্বের জেরে তৈরি হয়েছে এই সংকটময় অবস্থা। বর্তমান বোর্ডের পদত্যাগের দাবিতে পঞ্চাশটি ক্লাব লীগ বয়কট করেছে। ফলে শত শত ক্রিকেটারের ভবিষ্যৎ এবং রুটি-রুজি এখন ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংকটের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে লীগ আয়োজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপোলিস (সিসিডিএম) অভিভাবকহীন। একাধিক মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে সিসিডিএম চেয়ারম্যান আদনান রহমান দীপন দেশ ছেড়েছেন। তিনি কবে দেশে ফিরবেন, তা নিয়েও রয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা। মূলত তার অনুপস্থিতিতে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কবে নাগাদ মাঠে ক্রিকেট গড়াবে, তার কোনো সদুত্তর কারও কাছে নেই। খেলোয়াড়দের এমন সংকটময় পরিস্থিতি এবং লীগ আয়োজনের অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে বিসিবি’র সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ নিজেদের দায় এড়িয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি তো বোর্ডের হাতে নেই, বারবার বোর্ডকে কেন দোষ দিচ্ছো? সিসিডিএম থেকে চার তারিখে আমরা তৃতীয় বিভাগের জন্য একটি সভা ডেকেছি। তৃতীয় বিভাগ শুরুর পর প্রিমিয়ার লীগের জন্য ডাকা হবে। বোর্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে আমি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নই। বোর্ড শুধু খেলা মাঠে ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ বিসিবি নির্বাচন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আটকে গেছে ব্যাট-বলের লড়াই। ক্রিকেটারদের জীবিকা এখন ক্লাব সংগঠকদের আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার। অভিভাবক সংস্থা হিসেবে বিসিবি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। লীগ কবে শুরু হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা কারও জানা নেই। সবাই কেবল ক্ষমতার পালাবদলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

বিসিবি’র বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে না দেয়া পর্যন্ত নিজেদের বয়কটের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে ঢাকার প্রথমসারির ক্লাবগুলো। ক্লাব সংগঠক এবং ক্রিকেট বোর্ডের এই দ্বন্দ্বের সরাসরি শিকার হচ্ছেন সাধারণ খেলোয়াড়রা। কিন্তু সেদিকে কোনো পক্ষেরই ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ বা সহানুভূতি নেই। ক্লাব সংগঠকদের মূল লক্ষ্য এখন যেকোনো মূল্যে বিসিবি’র চেয়ার দখল করা। গত নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির রিপোর্টের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। এই বিষয়ে ক্লাব সংগঠক রফিকুল ইসলাম বাবু অত্যন্ত কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, ‘এই বোর্ডের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান একদম স্পষ্ট। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো। বর্তমানে পঞ্চাশটি ক্লাব এই বোর্ডের অধীনে কোনো ধরনের খেলায় অংশ নেবে না। বোর্ড বর্তমানে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলছে এবং তারা ক্লাবগুলোর সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে।’ ক্রিকেটারদের কথা ভেবে মাঠে খেলা ফেরানো নিয়ে বাবু বলেন, ‘আমরা জানি, খেলা না হলে খেলোয়াড়রা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাঠে খেলতে না পারাও বড় ক্ষতি। কিন্তু বর্তমান বোর্ডের পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবো দফায় দফায়। তবে বোর্ডে পরিবর্তন এলে আমরা দ্রুত সবকিছুর আয়োজন করবো।’

বোর্ড ও ক্লাবের ক্ষমতার লড়াইয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের সাধারণ ক্রিকেটাররা। ক্যারিয়ার ও জীবিকা নিয়ে তাদের তীব্র উৎকণ্ঠা। এই অচলাবস্থা নিরসনে বিসিবি সভাপতি ও সিসিডিএম চেয়ারম্যান বরাবর জরুরি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন (কোয়াব)। চিঠিতে ঢাকার লীগ ক্রিকেটের বর্তমান স্থবিরতাকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রিকেট মৌসুমের শেষ ভাগ চললেও লীগ শুরুর কোনো তোড়জোড় এখনো দেখা যাচ্ছে না। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ শুরু হওয়া নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। কোয়াব জানিয়েছে, খেলা বন্ধ থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক হাজার খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার আজ সরাসরি হুমকির মুখে। অনেকের কাছেই ক্রিকেট আয়ের একমাত্র উৎস। বঞ্চিত ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বোর্ডের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। আর্থিক অনটনে পড়ে অনেক ক্রিকেটার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অথচ সবার চোখ এখন কেবল বিসিবি’র ক্ষমতার মসনদে।

লীগ আয়োজক সংস্থা সিসিডিএম এখন কার্যত অচল ও দিকনির্দেশনাহীন। চেয়ারম্যান দীপনের আকস্মিক বিদেশ গমনের পর তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। অভিভাবকহীন এই সংস্থার প্রতিনিধি রাসেল বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও নিজেদের অসহায়ত্ব অকপটে স্বীকার করেছেন। বিকল্প ব্যবস্থায় লীগ শুরুর একটি ক্ষীণ চেষ্টা অবশ্য তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, প্রক্রিয়া অনুযায়ী একটি সভা ডাকার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হলেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। তৃতীয় বিভাগের ২০টি ক্লাবের অনেকেই খেলবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। তাই সভায় ঠিক কতোগুলো ক্লাব অংশ নেবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। সাধারণত প্রতি বছর মার্চ মাসে শুরু হয়ে এপ্রিলের মধ্যে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ শেষ হয়। তবে এবারের লীগ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে সিসিডিএমের কাছে হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই। গত বছর ঠিক এই সময়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগের জমজমাট লড়াই মাঠে গড়িয়েছিল। অথচ এই বছর ক্রিকেট মাঠগুলোতে বিরাজ করছে কেবলই নীরবতা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন