শহীদ তায়িম ভূঁইয়ার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের মেঝেতে পূর্ব-পশ্চিমে শোয়া অবস্থায় ছিল। মৃতের পরিহিত শার্টের সবগুলো বোতাম খোলা ছিল, শার্টের রং ছিল সাদা-কালো চেক, পরিহিত প্যান্টের বাম পায়ের উপর থেকে প্যান্টের হাঁটুর উপরের অংশ কাটা ছিল। আমি খোলা চোখে তার তলপেটে, বুকে, উভয় পায়ের হাঁটুর নিচে ও উপরে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পাই যা শটগানের পিলেটের জখম মর্মে আমার মনে হয়েছে। এভাবেই ট্রাইব্যুনাল-২ এর সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজ বাহিনীর সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছেন এসআই (নিরস্ত্র) মো. দেলোয়ার হোসেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ সদস্যদের বা তাদের পরিবারের কেউ আহত/নিহত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ তিনি এই সাক্ষ্য প্রদান করেন। এদিন পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন) নিজাম উদ্দিন ও এএসআই (সশস্ত্র) মো. জাহাঙ্গীর আলম নামের আরও দু’জন এ মামলায় সাক্ষী দিয়েছেন। পরে, তাদের জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। মামলার পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ২০২৪ সালের ২০শে জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তায়িম। যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। তায়িম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন। এ ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে করা মামলায় মোট ১১ জন আসামি। এর মধ্যে ৯ জন পলাতক। তারা হলেনÑ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপ-কমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপ-কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এসএম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো.অহিদুল হক ও সাবেক উপ-পরিদর্শক সাজ্জাদ-উজ-জামান। এছাড়া মামলায় আটক দুই আসামি হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহাদত আলী। গতকাল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
জবানবন্দিতে এসআই দেলোয়ার হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলন চলাকালে গত ২০শে জুলাই আমার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে এডিসি (ওয়েলফেয়ার) ডিএমপি, ঢাকা ফোন করে জানান যে, কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে কর্মরত এসআই (সশস্ত্র) ময়নাল হোসেন এর ছেলে ইমাম হাসান তায়িম গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি আমাকে নির্দেশ দেন। ময়নালের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পাই। এ সময় তার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার ছিলেন। শাহিদা আমাকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সাংবাদিক এর নিকট হতে তিনি জানতে পেরেছেন যে, তায়িম ভূঁইয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে সম্ভবত মারা গেছে এবং তারা লাশ খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল মর্গ ও জরুরি বিভাগের পাশের মর্গে লাশ না পেয়ে নতুন ভবনের পাশে অবস্থিত অপর একটি মর্গের মেঝেতে লাশ দেখতে পাই। এসআই (সশস্ত্র) মো. ময়নাল হোসেন তার ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। সেখানে অসনাক্তকৃত লাশ হিসেবে তায়িম ভূঁইয়ার লাশের সঙ্গে আরও ৬/৭ টি লাশ ছিল।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে শাহবাগ থানায় পাঠায়। একটি জিডি এন্ট্রি করা হয় এবং এসআই শাহাদাত আলীকে সুরতহাল প্রস্তুতের জন্য দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ঐদিন কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তায়িমের লাশ মূল ভবনের ম্যুয়ারিতে রেখে আসি। ২১শে জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর মর্গে উপস্থিত হই। মর্গে আমি ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন, মৃতের বাবা ময়নাল হোসেন ও মৃতের খালাকে দেখতে পাই। মৃতের বাবার অনুরোধে দ্রুত সুরতহাল প্রস্তুতের জন্য আমি এসআই মো. শাহাদাত এর সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরবর্তীতে তিনি সুরতহাল প্রস্তুত করেন এবং আমি সুরতহালে ২য় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করি।
সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর লাশ রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিয়ে আসা হয়। এএসআই (সশস্ত্র) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এর নেতৃত্বে গোসলের সময় মৃত তায়িম ভূঁইয়ার লাশের বাম পাশের কোমরের নিচে একটি বড় ক্ষত চিহ্ন দেখতে পাই যা আমাদের কাছে পিস্তলের গুলির আঘাতের চিহ্ন মর্মে মনে হয়েছে। জানাজা শেষে তায়িম ভূঁইয়া এর মরদেহ সরকারি গাড়িযোগে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।
‘শহীদ তায়িমের তলপেটে, বুকে, হাঁটুর নিচে শটগানের পিলেটের জখম ছিল’
স্টাফ রিপোর্টার
৩১ মার্চ (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
