পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স তিন বছরে নামিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার্থীরা এক বছর আগেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবেন।
সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন এবং নতুন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মডেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়।
সভায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন পলিটেকনিকগুলোতে বর্তমানে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে আগে এই কোর্সের মেয়াদ ছিল তিন বছর। সভায় জানানো হয়, চার বছর মেয়াদি করার পরও পাঠ্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এ অবস্থায় কোর্সের মেয়াদ আবার তিন বছর করা হলে এর সম্ভাব্য সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করা হয়। মেয়াদ কমানো হলে শিক্ষার্থীরা এক বছর আগেই কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ পাবে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
সভায় কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Md Miganur Rahaman
২ মাস আগেকারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে কিছু মৌলিক বিষয়ের দিকে এখনই নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর অধীন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় বিষয়গুলো সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরা যায়—
প্রথমত, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু বাস্তবে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে যে পরিমাণ শিক্ষক সংকট রয়েছে, তা দিয়ে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে ক্লাস পরিচালনা, ল্যাব ওয়ার্ক ও প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পদ-পদবি ও ক্যারিয়ার কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। সাধারণ কলেজগুলোর মতো প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদবী চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে পেশাগত মর্যাদা যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মপ্রেরণাও বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়োগব্যবস্থার দ্বৈততা একটি জটিলতা তৈরি করেছে। একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন কাঠামো কর্মপরিবেশে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। তাই একটি একক, স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট নিয়োগব্যবস্থা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, কারিগরি শিক্ষার মূল শক্তি হলো হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। সে কারণে প্রতিটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাথে ইন্ডাস্ট্রি-সংযুক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
পঞ্চমত, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড বর্তমানে মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। এই কেন্দ্রীভূত কাঠামো কার্যকারিতাকে সীমিত করে। তাই বোর্ডের কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তৃত করা এখন সময়ের দাবি। এতে সেবা দ্রুত ও কার্যকর হবে।
ষষ্ঠত, বিভাগীয় পর্যায়ে মানসম্মত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রশিক্ষণ সুবিধা যদি ঢাকার বাইরে পর্যাপ্ত না থাকে, তবে সারাদেশে সমানভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সপ্তমত, শিল্পখাতে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য আইনগত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন কলকারখানায় কারিগরি শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে এপ্রেন্টিস (Apprentice) হিসেবে কাজ শেখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব দক্ষতা অর্জন করবে এবং শিল্পখাতও দক্ষ জনবল পাবে।
সব মিলিয়ে, কারিগরি শিক্ষাকে যুগোপযোগী, দক্ষতানির্ভর ও কর্মমুখী করতে হলে এসব কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। এটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, বরং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।