ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন

ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট

ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগন ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও মেরিন ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এটা যুদ্ধের নতুন ও বিপজ্জনক ধাপে পরিণত হতে পারে। তবে ইরানও সতর্ক করেছে। তারা মার্কিন সেনাদের ভর্ৎসনার ছলে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। শনিবার তেহরান টাইমসের শিরোনাম ছিল ‘ওয়েলকাম টু হেল’। অর্থাৎ নরকে স্বাগতম। ওই রিপোর্টে তারা মার্কিন সেনাদেরকে ‘কফিনে’ করে ফেরত পাঠানোর হুমকি দিয়েছে। স্থল সেনা অভিযান নিয়ে দু’পক্ষই এখন নতুন করে উত্তেজনার মুখে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য স্থল অভিযানটি পূর্ণমাত্রার আক্রমণ হবে না। বরং এতে স্পেশাল অপারেশন বাহিনী ও নিয়মিত পদাতিক সেনাদের যৌথ অভিযানে সীমিত হামলা চালানো হতে পারে। সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনার কারণে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দেন। এ ধরনের অভিযানে মার্কিন সেনাদের সামনে নানা ধরনের হুমকি থাকবে। এর মধ্যে আছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গোলাগুলি এবং তাৎক্ষণিক বিস্ফোরক (আইইডি)। শনিবার পর্যন্ত স্পষ্ট ছিল না ট্রাম্প পেন্টাগনের সব, কিছু বা কোনো পরিকল্পনাই অনুমোদন করবেন কিনা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন কখনো বলছে যুদ্ধ শেষের পথে, আবার কখনো তা আরও বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহ দেখালেও হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সতর্ক করে বলেন, তেহরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের বিরুদ্ধে হুমকি না থামায়, তাহলে ট্রাম্প ভয়াবহ আঘাত হানতে প্রস্তুত। লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, সর্বাধিনায়কের কাছে সর্বোচ্চ বিকল্প রাখার জন্য প্রস্তুতি নেয়া পেন্টাগনের দায়িত্ব। এর মানে এই নয় যে, প্রেসিডেন্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
গত এক মাসে প্রশাসনের আলোচনায় পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল এবং হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম অস্ত্র ধ্বংসের বিষয়টি এসেছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে সপ্তাহ লাগতে পারে, মাস নয়। অন্য একজন সম্ভাব্য সময়সীমা কয়েক মাস বলে উল্লেখ করেন। পেন্টাগন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
২০শে মার্চ ওভাল অফিসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। যদি পাঠাতামও, আপনাদের বলতাম না। তবে আমি সেনা পাঠাচ্ছি না। ফ্রান্সে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী ছাড়াই সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। এর আগে অ্যাক্সিওস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগন ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেখানে স্থল অভিযান ও ব্যাপক বোমাবর্ষণ উভয়ই থাকতে পারে। একইসঙ্গে আরও ১০,০০০ সেনা পাঠানোর কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা যায়, যদিও ওয়াশিংটন পোস্ট তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
গত এক মাসে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ইরাকে বিমান দুর্ঘটনায় ৬ জন, কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবায় ড্রোন হামলায় ৬ জন এবং সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে হামলায় ১ জন। এ ছাড়া অন্তত ৭টি দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলায় ৩ শতাধিক সেনা আহত হয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছে।
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এক জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ মানুষ এর বিরোধিতা করে। মাত্র ১২ শতাংশ সমর্থন করে। বিমান হামলার ক্ষেত্রে মতভেদ তুলনামূলক কম। ৩৯ শতাংশ বিরোধিতা করে এবং ৩৩ শতাংশ সমর্থন করে। খার্গ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সামরিক বিশ্লেষক মাইকেল আইজেনস্ট্যাড। তিনি বলেন, আমি ওই ছোট জায়গায় থাকতে চাই না, যেখানে ইরান সহজেই ড্রোন ও গোলাবর্ষণ চালাতে পারে। তার মতে, আরও কার্যকর কৌশল হতে পারে ইরানের উপকূলীয় সামরিক স্থাপনাগুলোতে দ্রুত হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় অবস্থান না করাই ভালো। দ্রুত আঘাত করে সরে আসা- এটাই নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ২২০০ নাবিক ও মেরিন নিয়ে গঠিত ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট সম্প্রতি ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। তারা এ ধরনের অভিযান চালাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে লড়াই চালাতে সরবরাহ সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে। এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, খার্গ দ্বীপ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আইআরজিসি সেখানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। আরেক সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, এই পরিকল্পনা হঠাৎ করা হয়নি। এটি বহু আগে থেকেই বিশ্লেষণ ও অনুশীলন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের কোনো এলাকা দখল করা হলে তা দেশটির জন্য বড় অপমান হবে এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় চাপ তৈরির হাতিয়ার হবে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ওই এলাকা দখলের পর সেখানে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ডেমোক্রে?টরা প্রায় সবাই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও রিপাবলিকানদের মধ্যেও মতভেদ দেখা গেছে। উইসকনসিনের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ডেরিক ভ্যান অর্ডেন বলেন, ইরানের মাটিতে সেনা পাঠানোর প্রশ্নই আসে না। আমরা স্থলবাহিনী ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। সাউথ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান ন্যান্সি মেসও বলেন, তিনি ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর পক্ষে নন। তবে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম খার্গ দ্বীপ দখলের পক্ষে মত দিয়েছেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইও জিমা অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে প্রায় ৬৮০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা ইও জিমা করেছি, এটাও করতে পারবো। আমার বিশ্বাস মেরিনদের ওপর।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন