মতামত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই মার্কিন জনগণের বেশির ভাগই ইরানে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে। তবে যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পৌঁছার সময়েও রিপাবলিকানরা বেশির ভাগই তাদের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পাশে ছিল। কিন্তু এখন সেটা বদলাতে পারে।
টেক্সাসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে (সিপ্যাক) দলের অনেক সমর্থক প্রশ্ন তুলেছেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করলো, ডনাল্ড ট্রাম্প কীভাবে এটি শেষ করবেন এবং এই প্রচেষ্টার আদৌ কোনো মূল্য আছে কি না।
ডালাসের বাসিন্দা সামান্থা ক্যাসেল বলেন, আমি শুধু চাই, আমরা কী করছি তা নিয়ে আরও স্বচ্ছতা থাকুক। তাহলে আপনি আপনার প্রিয়জনকে বিদেশে পাঠিয়েও স্বস্তিতে থাকতে পারবেন। আমি আশা করি এটি দ্রুত শেষ হবে। কারণ জীবনযাত্রার খরচ, তেল-গ্যাস সবকিছুর দামই বাড়তে থাকবে। তার বন্ধু জো বলিকও সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি এখনো কোনো শেষ লক্ষ্য দেখতে পাচ্ছি না। আমরা আসলে কী অর্জন করতে চাই? সত্যিই কি শাসন পরিবর্তন? সেটা কেমন হবে? কাকে বসানো হবে? আমার মনে হয় আমরা নিজেদেরকেই ফাঁদে ফেলেছি।
এক দশক ধরে সিপ্যাক ট্রাম্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এটি আগে কিছুটা লিবার্টারিয়ান ঘরানার ছিল। এখন এটি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমর্থকদের দখলে। এ বছর সম্মেলনটি ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে না হয়ে টেক্সাসের ডালাসের কাছে একটি বড় হোটেল কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়। পরিবেশ আগের মতোই ছিল। বড় অডিটোরিয়ামে দিনভর আলোচনা, আর নিচতলায় প্রদর্শনীতে নানা ধরনের রক্ষণশীল সামগ্রী। তার মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্টের ছবি লাগানো বাস, ‘ট্রাম্প-২০২৮’ টি-শার্ট, এমনকি ২০২৪ সালের হত্যাচেষ্টা স্মরণে তৈরি চশমা, যার পাশে ‘বুলেটপ্রুফ’ লেখা।
তবে কিছু বিষয় আলাদা ছিল।
ওয়াশিংটন থেকে হাজার মাইল দূরেও ইরান যুদ্ধ ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিবিসি’র সঙ্গে কথা বলা অনেকের মতে, এই সংঘাত রক্ষণশীলদের মধ্যে প্রজন্মগত বিভাজন তৈরি করছে। ১৯ বছর বয়সী টবি ব্লেয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার ছাত্র। তিনি বলেন, আমার ভালো লাগে না এটা দেখে যে খারাপ মানুষ খুঁজে বের করে সরানো যেন আমেরিকার দায়িত্ব হয়ে গেছে। বিশেষ করে যখন দেশে অনেক মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে।
তার বন্ধু শশাঙ্ক ইয়ালামাঞ্চি আইনের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, তরুণ রক্ষণশীলদের অনেকেই ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিল। কারণ তিনি বিদেশে যুদ্ধে জড়াতে চান না বলেছিলেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক সমস্যা আছে। আমরা যদি বিদেশে যুদ্ধে সময় ও শক্তি ব্যয় করি, তাহলে দেশের সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ কমে যায়।
বর্তমানে দু’টি মার্কিন মেরিন ইউনিট পারস্য উপসাগরের দিকে যাচ্ছে। একটি প্যারাট্রুপার ডিভিশনের অংশও পথে রয়েছে। পেন্টাগন প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ বাজেট বিবেচনা করছে। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ নাও হতে পারে। অন্যদিকে, ‘ট্রাম্প ট্রাইব অব টেক্সাস’ নামের একটি দল- যাদের সদস্যরা সোনালি জ্যাকেট পরে, তারা বেশি বয়সী। দলের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ম্যানুয়েল-রিয়ড বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক হামলার ঝুঁকি থাকে, তাহলে কে না বলবে? ট্রাম্প থামতে পারেন না। তিনি কাজ শেষ না করে থামবেন না। তাদের অন্য সদস্যরাও একমত। পেনি ক্রসবি বলেন, আমি ট্রাম্পের ওপর ভরসা করি। ব্লেক জুম্মো বলেন, তিনি আমাদের রক্ষা করছেন। তারা (ইরান) আমাদের টার্গেট করছে। অন্যদিকে, ইরানি-আমেরিকানদের একটি দল সম্মেলনে জোরালোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সমর্থন করে। তারা ‘থ্যাংক ইউ ট্রাম্প’ স্লোগান দেয়। ‘রেজিম চেঞ্জ ফর ইরান’ দাবি তোলে এবং ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভির ছবি বহন করে।
নিমা পোরসোহি বলেন, ৪৭ বছরের নিপীড়নের পর ইরানের মানুষ অবশেষে মুক্তির সুযোগ পাচ্ছে। এটা খুবই আশাব্যঞ্জক। সিপ্যাকের আয়োজক ম্যাট শ্ল্যাপ বলেন, রক্ষণশীলরা ট্রাম্পকে বিশ্বাস করে। তবে কোথায় গিয়ে এ যুদ্ধ শেষ হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। এই উদ্বেগ শুধু সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেই নয়, মঞ্চেও উঠে এসেছে। সাবেক কংগ্রেসম্যান ম্যাট গেটজ বলেন, ইরানে স্থল আক্রমণ হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও দরিদ্র ও কম নিরাপদ হবে। তিনি সতর্ক করেন, এতে গ্যাস ও খাদ্যের দাম বাড়বে এবং সন্ত্রাস কমার বদলে বাড়তে পারে। ব্ল্যাকওয়াটারের প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স বলেন, আমরা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। পিউ রিসার্চ-এর জরিপে দেখা যায় শতকরা ৭৯ ভাগ রিপাবলিকান ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনায় সন্তুষ্ট। তবে মাত্র ৪৯ ভাগ দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। ১৮-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই সমর্থন মাত্র ৪৯ ভাগ। ট্রাম্পের জরিপ বিশ্লেষক জিম ম্যাকলাফলিন বলেন, এই বিভাজন সাময়িক। তিনি বলেন, এটি সাময়িক সমস্যা। যুদ্ধ শেষ হলে গ্যাসের দাম কমে যাবে।
তবে সময়ই বলে দেবে সব।
আগামী নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তরুণ ভোটাররা ২০২৪ সালে ট্রাম্পের জয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। যদি তাদের উৎসাহ কমে যায়, তাহলে ভোটার উপস্থিতিও কমতে পারে। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শেষের পথে। তিনি মনে করেন, তার সমর্থকরা তাকে ছাড়বে না। কারণ তারা চায় না ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক এবং তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের যেমন ইসরাইল ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকে রক্ষা করুক।
কিন্তু যুদ্ধ প্রায়ই অনিশ্চিত পথে এগোয়।
সিপ্যাক সম্মেলন ইঙ্গিত দিচ্ছে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন বলেন, আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে এটি সঠিক কাজ। বিশেষ করে যখন আমরা সম্ভাব্যভাবে মার্কিন সেনা মোতায়েনের দ্বারপ্রান্তে। এই বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
(অ্যান্থনি জারচার বিবিসি’র উত্তর আমেরিকা প্রতিনিধি। তার এ লেখাটি বিবিসি থেকে অনুবাদ)
