বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে ‘ইত্যাদি’ একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানই শুধু নয় বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী আবেগ এবং সুস্থ বিনোদনের এক অনন্য আলোকবর্তিকা। সেই আশির দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত হানিফ সংকেত ইত্যাদি’র মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছেন। হানিফ সংকেতের শব্দচয়ন, মেধা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, সৃজনশীলতা, সর্বোপরি তার ছন্দময় উপস্থাপনা এবং ইতিবাচক সমাপ্তি দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করে। আলোকসজ্জা, বর্ণিল সেট আর হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের বহিরঙ্গনে এবারের ঈদ ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হয়। দর্শকদের ভালোবাসার সহযাত্রী হয়ে ‘ইত্যাদি’ পদার্পণ করেছে ৩৮তম বছরের নবযাত্রায়। এই শুভযাত্রায় ‘ইত্যাদি’ পরিবারের পক্ষ থেকে দর্শকদের জানানো হয় অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছিল সেই চিরচেনা গান ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’। এবারো ছিল বৈচিত্র্যময় চিত্রায়ণ। গানটিতে অংশগ্রহণ করেছেন ঘর থেকেও যাদের ঘর নেই, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি থেকে দূরে থাকা কিছু মানুষদের নিয়ে। ইত্যাদি’র মঞ্চে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এই মানুষগুলোকে দেখে দর্শকরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। করতালি দিয়ে তাদের উৎসাহিত করেন। বাংলাদেশে চলমান তথাকথিত কিছু অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের বিপরীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো মনের মানুষদের দেয়া হয়েছে ‘পরিষ্কার নামক পুরস্কার’। ভবিষ্যতে বিভিন্ন এলাকায় যদি ভালো কাজের মানুষদের জন্য এ ধরনের অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তবে তা মানুষকে ভালো কাজ ও ভালো মানুষ হতে উদ্বুদ্ধ করবে। সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষদের ঈদ বাজারের চিত্র নিয়ে ছিল দেশের শীর্ষ তারকাদের অভিনয়ে সমৃদ্ধ একটি মিউজিক্যাল ড্রামা। পর্বটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী ও হৃদয়ছোঁয়া। সাধারণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং একজন সাধারণ শিল্পীর গান রিলিজ করার দুর্দশা নিয়ে বাস্তবসম্মত নাটিকা দু’টি ছিল উপভোগ্য ও সমসাময়িক। এবার ঈদে দর্শক নির্বাচনের জন্য বিশেষ উপকরণ নির্ধারণ করা হয় প্রতীকী তালা চিত্র। তালা নিয়ে রয়েছে অনেক জ্বালা। ঘরে তালা, মুখে তালা, কানে তালা ও মনে তালা নিয়ে হানিফ সংকেতের চমৎকার ছন্দময় কথার পর এই প্রতীকী তালা চিত্র দিয়ে নির্বাচন করা হয় চারজন দর্শক। দ্বিতীয় পর্বে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় বহুমাত্রিক অভিনেতা মোশাররফ করিমকে। এই পর্বেও ছিল একটি চমৎকার বার্তা-প্রয়োজনে মুখে তালা দিতে হবে, আবার প্রয়োজনে মুখের তালা খুলতে হবে সত্যটা বলতে। ঈদ ইত্যাদিতে গান গেয়েছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ এবং আর একটি দ্বৈত গান গেয়েছেন ইমরান মাহমুদুল ও নায়িকা বুবলী। গান শুনে মনেই হয়নি বুবলী এই প্রথম গাইছেন। ইত্যাদি’র প্রতিটি নৃত্যে কোরিওগ্রাফি, পোশাক, শিল্পী নির্বাচন সবকিছুতেই থাকে ভিন্নতার ছাপ। ব্যতিক্রমী যন্ত্রসংগীতের সঙ্গে এবার নাচলেন চলচ্চিত্রের তমা মির্জা ও টেলিভিশনের জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। অভিনয়ে পারদর্শী এই দুই শিল্পী যে এত অসাধারণ নাচতে পারেন ‘ইত্যাদি’ না দেখলে তা অজানাই থাকতো। ভালো লেগেছে বিশ্বাস নিয়ে মিউজিক্যাল নাটিকাটি। ঈদের সময় সন্তানদের আগমনের জন্য বাবা-মা’র প্রতীক্ষা আর সন্তানের না আসার চিত্র অনেককেই ব্যথিত করেছে। ইত্যাদি’র এবারের দলীয় সংগীতের বিষয়বস্তু ছিল ‘পড়েছি বাল্য শিক্ষাতেই, জীবনে মিথ্যে বলতে নেই’- এই গানটির সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেছেন সাবিলা নূর ও শরিফুল রাজ। সঙ্গে ছিল ইত্যাদি’র নিয়মিত নৃত্যশিল্পী দল। এই পর্বটি আনন্দের পাশাপাশি দর্শকদের বিবেককেও নাড়া দেয়। এবার বিদেশি পর্বে অংশগ্রহণ করেছেন প্রায় অর্ধশতাধিক বিদেশি। পর্বটির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো- এটি আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্ব মঞ্চে উপস্থাপন করে। বিদেশিরা যখন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-শাড়ি পরে গ্রামীণ পটভূমিতে অভিনয় করেন এবং গ্রামীণ ভাষায় কথা বলেন, তখন দু’টি ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে এক চমৎকার সেতুবন্ধন তৈরি করে। চমৎকার অভিনয়ের পাশাপাশি পেশাদার নৃত্যশিল্পীর মতোই নেচেছেন বিদেশিরা। এই ভাইরালের যুগে ইত্যাদিতে দেখানো হলো ভাইরাল হওয়ার জন্য পাথরের খোঁজে জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া এবং ভাইরাল হতে গিয়ে অনেকেরই করুণ পরিণতি হওয়ার চিত্র। ভালো লেগেছে এআইয়ের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারা আর সাহসের সঙ্গে অনিয়ম বলতে পারার যে সুস্থ বিনোদনের ধারা ‘ইত্যাদি’ তৈরি করেছে, তা আজও অপরাজেয়। স্বাধীনতার মাসে প্রচারিত ‘ইত্যাদি’ শেষ হয়েছে দেশাত্মবোধক গান দিয়ে। গানটি গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন, তার সঙ্গে ছিলেন- মনির খান, আগুন, রবি চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, আঁখি আলমগীর ও প্রিয়াংকা গোপ। গানের শেষ কথাটি ছিল ‘শান্তি-শান্তি-শান্তি, নয় বিদ্বেষ বিভ্রান্তি’- আর এই বার্তা দিয়েই শেষ হয়েছে আনন্দমুখর ঈদ ‘ইত্যাদি’। শেষ হলেও যার রেশ থেকে যাবে অনেকদিন।
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ঈদের ‘ইত্যাদি’
স্টাফ রিপোর্টার
২৯ মার্চ (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
