একসময় পল্লী বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতো নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গৃহস্থবাড়ির উঠোনে দেখা মিলতো কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকির। ধান ভেঙে চাল, চাল থেকে আটা ও চিঁড়া তৈরি, মসলাপাতি, হলুদ, সরিষা ভাঙানোসহ গৃহস্থালির নানা কাজে ঢেঁকি ছিল অপরিহার্য একটি যন্ত্র। সেই সময় গ্রামীণ জীবনে যৌথ ও একান্নবর্তী পরিবার ছিল সাধারণ চিত্র। পরিবারের বধূ, কন্যা ও প্রবীণ নারীরা একসঙ্গে ঢেঁকিতে কাজ করতেন। ভোরের নীরবতা ভেঙে ঢেঁকির ছন্দময় ‘ধুপধাপ’ শব্দে মুখর হয়ে উঠতো পুরো গ্রাম। সেই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতো গ্রামীণ জীবনের কর্মব্যস্ততা, ঐক্য এবং প্রাণের স্পন্দন। কালের পরিবর্তনে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক রাইস মিলের দাপটে ঢেঁকির ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যৌথ পরিবারের ভাঙন, একক পরিবারের বিস্তার এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকিকে ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধন। বর্তমানে ঢেঁকি খুঁজে পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে উপজেলার বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুড়াকুটি ফকিরপাড়া গ্রামের ভুজারি আজিজুল ইসলাম এখনো ধরে রেখেছেন এই ঐতিহ্য। তিনি জানান, আগে ঘরে ঘরে ঢেঁকি ছিল। এখন পুরো এলাকায় একটি ঢেঁকিও খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ঢেঁকিতে ভাঙানো চাল ও ডালের আটা দিয়ে তৈরি পিঠা, গুলগুলী ও বড়া এখনো মানুষের কাছে বেশি পছন্দের। স্থানীয় প্রবীণরা জানান, একসময় ভূমিহীন, বিধবা ও অসহায় নারীদের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল ঢেঁকিতে ধান ভাঙানো। তারা ‘বারানি’ নামে পরিচিত ছিলেন। বড় গৃহস্থদের বাড়িতে ধান ভেঙে চাল তৈরি করে যা পেতেন, তা দিয়েই চলতো তাদের সংসার। সেইসঙ্গে চলতো গান, গল্প আর হাসির কৌতুক যা শ্রমের কষ্ট কমিয়ে দিতো। বর্তমানে ডিজেলচালিত মেশিন ও শ্যালো মেশিন গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজার থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে গেছে। এতে সময় ও শ্রম কমলেও হারিয়ে গেছে ঢেঁকির প্রাকৃতিক স্বাদ ও পুষ্টিগুণ। প্রবীণদের মতে, ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত যেমন সুস্বাদু ছিল, তেমনি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। কবি নজরুল একাডেমির শিক্ষক রুহুল আমীন বলেন, ঢেঁকি এখন শুধুই স্মৃতির অংশ। নতুন প্রজন্মের অনেকেই ঢেঁকি কখনো দেখেনি। এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। গ্রামের প্রবীণ গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম ও মাজেদা বেগম বলেন, ঢেঁকি ছিল পারিবারিক ঐক্য আর আনন্দের অংশ। সবাই মিলে কাজ করার মধ্যে ছিল আলাদা তৃপ্তি। এখন সেই মিলনমেলা আর দেখা যায় না। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি ও ইউএনও তানজিমা আঞ্জুম সোহানিয়া জানান, প্রযুক্তির উন্নয়নে মানুষের জীবন সহজ হলেও গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে ঢেঁকিকে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সময়ের বিবর্তনে উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে গেলেও গ্রাম বাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতীকীভাবে হলেও ঢেঁকির ব্যবহার ধরে রাখা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পরিচিত করে তোলা সম্ভব হবে।
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি
কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) প্রতিনিধি
২৯ মার্চ (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
