বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, যা কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি নির্মাণ করেছে। এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গৌরব, বেদনা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের এক দীর্ঘ পথচলা। সেই প্রেক্ষাপটে আজকের বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ও ভূমিকা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতি একটি প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি প্রতিষ্ঠিত অংশ হলেও, জামায়াতের মতো একটি দলের জন্য এটি ছিল এক নতুন পদক্ষেপ। দলটির ইতিহাস বিবেচনায় এই উপস্থিতি অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ, আবার কারও কাছে এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রাষ্ট্রীয় আচার পালনের অংশ হিসেবেই তিনি শহীদ মিনারে গিয়েছিলেন। এই বক্তব্যে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত থাকলেও, এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। কারণ, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ—এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে জামায়াতের ঐতিহাসিক অবস্থান কখনোই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বহুল আলোচিত ও প্রামাণ্য বিষয়। সে সময় দলটির নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন, বিশেষ করে আলবদর ও আলশামস, বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে এই ভূমিকার জন্য দলটি সমালোচিত হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—একটি দল, যে দলটি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা কীভাবে আজ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে? ২৬ মার্চ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কর্মসূচি ঘোষণা এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এটি একদিকে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা, অন্যদিকে বৃহত্তর জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের একটি কৌশল।
তবে এখানেই মূল বিতর্ক—এই পরিবর্তন কি কেবল প্রতীকী, নাকি আদর্শিক? কারণ, এখন পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা বা দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নীরবতা অনেকের কাছে দায় এড়ানোর শামিল বলে মনে হয়।
২৫ মার্চ, যা আজ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় রাতের স্মারক। পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই হত্যাযজ্ঞে হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ নিহত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ইপিআর সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এই গণহত্যা জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে যে ইতিহাসের নির্মমতা ও বীরত্বের কথা উঠে এসেছে, তা নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে উল্লেখ করেছেন, ২৫ মার্চের সেই কালরাত্রি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং সশস্ত্র প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তী প্রতিরোধ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়। এই ইতিহাস কেবল একটি যুদ্ধের নয়, একটি জাতির জাগরণের গল্প।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্বীকৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাব এই বিষয়ে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে গণহত্যা, ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির মতো নৃশংসতার স্বীকৃতি এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারের পক্ষ থেকেও এই স্বীকৃতি আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতার কথা বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, কারণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শুধু ইতিহাসকে বৈধতা দেয় না, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নৈতিক অবস্থানও তৈরি করে।
এই প্রক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান অবস্থান একটি জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। একদিকে তারা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হতে চায়, অন্যদিকে তাদের অতীত তাদের পিছু ছাড়ছে না। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে দলটি নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে—কিন্তু সেই প্রচেষ্টা কতটা আন্তরিক, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে অতীতকে অস্বীকার করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। যে দলই হোক, তাদের জন্য ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকা এবং ভুল স্বীকার করা একটি নৈতিক দায়িত্ব। এটি শুধু রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য নয়, জাতীয় ঐক্যের জন্যও অপরিহার্য।
আজকের বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনশীল রাষ্ট্র। এখানে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানতে চায়, প্রশ্ন করতে চায় এবং সত্যের মুখোমুখি হতে চায়। এই প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আরও বেশি—কারণ তারা শুধু ক্ষমতার রাজনীতি নয়, মূল্যবোধের রাজনীতিও দেখতে চায়।
জামায়াতে ইসলামীর জন্য এটি একটি সুযোগ—নিজেদের অতীত নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করার, ভুল স্বীকার করার এবং একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলার। কিন্তু সেই পথ সহজ নয়, এবং তা কেবল প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, স্বাধীনতা কেবল একটি অর্জন নয়, এটি একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব ইতিহাসকে সম্মান করা, সত্যকে স্বীকার করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সৎ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই চেতনার প্রতিফলন যত বেশি হবে, ততই দেশ এগিয়ে যাবে একটি স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক Amartya Sen একবার লিখেছিলেন, “ন্যায়বিচার কেবল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজে বাস্তব অন্যায় দূর করার মধ্যেই তার প্রকৃত সার্থকতা।” বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উপলব্ধি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসের অন্যায় ও সত্যকে স্বীকার না করলে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন কখনোই পূর্ণতা পাবে না।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
স্বাধীনতার মুখে ইতিহাসের প্রশ্ন: জামায়াতের নতুন ভাষ্য নাকি পুরনো ছায়া?
নিয়াজ মাহমুদ
দেশ বিদেশ
২ মাস আগে
২৫ মার্চ (বুধবার), ২০২৬, ১২ঃ০৯ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
