বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এখন আর সাময়িক বাজার সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের বিস্তার, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষত নিম্নআয় ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য প্রতিদিনের বাজার এখন যেন এক নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১৫ই মার্চ বিশ্ব ভোক্তা-অধিকার দিবস উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক র্যালি ও প্রতিবাদ সভায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বলেন, বাজারে অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মজুতদারি, সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন কারসাজির কারণে অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
সভায় ক্যাব সভাপতি ও সাবেক সচিব এ. এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হলেও বাংলাদেশে তা এখনও জাতীয়ভাবে পালিত হয় না, যা ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি করে। তার মতে, বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট চক্র নিত্যপণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারের প্রতি তিনি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এসব সিন্ডিকেট ভেঙে বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।
ক্যাব ঢাকা জেলার সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সামছ এ খানও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে বাজারে প্রভাবশালী কারসাজিকারী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে থেকে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তার মতে, সরকার যদি এই সুযোগ বন্ধ করতে পারে, তাহলে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বড় একটি উৎস বন্ধ হয়ে যাবে।
ক্যাবের কোষাধ্যক্ষ ড. মুঞ্জুর-ই-খোদা তরফদার বলেন, ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা এবং একটি ন্যায্য বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। একইসঙ্গে ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান রাজু বলেন, ভোক্তার অধিকারকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি না দিলে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের মতে, উৎপাদন পর্যায় থেকেই নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বড় বাজারগুলোতে সিন্ডিকেট ভেঙে ভেজাল ও বিষাক্ত পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে।
বাজারের অস্থিরতার পেছনে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্যপণ্যের দামও দ্রুত বেড়ে যায়। কারণ কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহন—খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি নির্ভরতা রয়েছে। কৃষিতে ব্যবহৃত অনেক সার প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয়, সেচব্যবস্থা পরিচালনায় ডিজেল বা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় এবং কৃষিযন্ত্র পরিচালনাতেও জ্বালানির ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে তেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়।
ফসল সংগ্রহের পর সংরক্ষণ ব্যবস্থাতেও জ্বালানির গুরুত্ব অপরিসীম। কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার পরিচালনার জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই গ্যাস বা ডিজেলনির্ভর। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্য পেট্রোকেমিক্যালের উপজাত পলিথিন থেকে তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে প্যাকেজিং ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। আর পরিবহন খাতের ব্যয় বৃদ্ধিই শেষ পর্যন্ত বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাক উইলিয়ামসের ভাষায়, বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে পরিবহন ব্যবস্থা। পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়াই সরবরাহ শৃঙ্খল ও লজিস্টিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, আর এ ব্যবস্থার শক্তি আসে জ্বালানি থেকে। তাই তেলের দামে বড় ধরনের ধাক্কা অনেক সময় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি করে—যেখানে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কমে যায়। ইতিহাসে ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালের তেল সংকটের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দার উদাহরণ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নআয়ের দেশগুলোতে এই প্রভাব আরও তীব্র হয়। কারণ এসব দেশে মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে এবং অনেক দেশই শস্য ও সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত স্থানীয় বাজারে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এখন একটি জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। নিম্নআয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সবাই এই চাপের মুখে পড়েছে। টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাক বা ওএমএসের দোকানের সামনে মানুষের দীর্ঘ সারি এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে শিক্ষা উপকরণ, প্রসাধনী, ডিটারজেন্ট—প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই বেড়েছে। সম্প্রতি চিনি ও পেঁয়াজের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ- ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা, অবৈধ মজুতদারি, জ্বালানি ও কাঁচামালের ঘাটতি, বাজার তদারকির দুর্বলতা, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করেছে, যার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অযথা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি ও নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন। মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাজার অনেকাংশে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে বাজার তদারকির জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ শতাংশ খাদ্যপণ্য যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। উপজেলা পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
সবশেষে বলা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কেবল বাজারের সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক স্থিতি এবং অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। কার্যকর নীতিমালা, কঠোর বাজার তদারকি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি ন্যায্য ও স্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: ব্যাংকার
দ্রব্যমূল্যের দোলাচল ও বাজারের অস্থিরতা, ভোক্তার জীবনে বাড়তি চাপ
মো. সাইফুল ইসলাম মাসুম
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
২৪ মার্চ (মঙ্গলবার), ২০২৬, ১০ঃ২১ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
