পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হাওর ও পাহাড়ঘেঁষা জেলা সুনামগঞ্জের বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো মুখরিত। ঈদের দিন থেকে শুরু করে টানা কয়েকদিনের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ছুটে আসেন জেলার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। বিশেষ করে জেলার তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক), যাদুকাটা নদী, বারেক টিলা, দেশের বৃহৎ জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান ও বিশ্বম্ভরপুরে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। এছাড়া মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর আস্থানা, ট্যাকেরঘাট শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, রাজারগাঁও অদ্বৈত প্রভুর আখড়াবাড়ি, গড়কাটি ইসকন মন্দির, লাকমা পাহাড়ি ছড়া, লালঘাট ঝর্ণাধারা এবং কড়ইগড়া-রাজাই আদিবাসী পল্লীতেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয়রা জানান, এবারের ঈদুল ফিতরের ছুটিতে দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসেবে খ্যাত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর টাঙ্গুয়ার হাওরসহ জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান হাজারো পর্যটককে আকৃষ্ট করেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পর্যটকদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
এছাড়াও জেলার ছাতক উপজেলার ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, ইংলিশ টিলা, পেপার মিল এলাকা এবং মণিপুরী সমপ্রদায় অধ্যুষিত বাগানবাড়িতেও পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। দোয়ারাবাজার উপজেলার বাঁশতলা শহীদ মিনার, বীর শহীদদের কবরস্থান, টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড, সীমান্ত নদী খাসিয়ামারা ও আদিবাসী পল্লী ঝুমগাঁওতেও দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে জেলা সদর উপজেলায় মরমী কবি হাসন রাজার বাড়ি, ডলুরা শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থানেও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। স্থানীয় হোটেল-রেস্টুরেন্ট, মোটরসাইকেল, লেগুনা, অটোরিকশা চালকসহ পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মাঝেও বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে। সরজমিন দেখা যায়, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি সতর্ক অবস্থানে ছিল। পাশাপাশি পুলিশ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নজরদারিতে ছিল। তবে ঈদ উদ্যাপন করতে গিয়ে তাহিরপুর উপজেলার শিমুল বাগান এলাকায় যাদুকাটা নদীতে খেয়া নৌকা ডুবির ঘটনায় সুফিয়া বেগম নামে এক শিশু নিহত হয়। একই সময়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুইজনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজন পর্যটক আহত হয়েছেন। সিলেট থেকে আসা পর্যটক নিলা বলেন, এ জেলার সীমান্ত এলাকার পর্যটন স্পটগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এসব স্থান সরাসরি না দেখলে বোঝা যায় না কতোটা মনোমুগ্ধকর। তবে এসব স্পটের রাস্তাঘাট একেবারে নাজুক। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে এখানে আরও বেশি পর্যটক আসতো। ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক আইরিন বলেন, এখানের প্রাকৃতিক স্পটগুলোর সৌন্দর্য বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। তবে মোটরসাইকেল, সিএনজি, লেগুনা ও অটোরিকশা চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত এলাকাসহ পুরো জেলায় পুলিশ ও বিজিবি সতর্ক অবস্থানে ছিল। কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে তৎপর রয়েছে।
