বিস্ময়কর তিন চরিত্র

ঈদ সংখ্যা ২০২৬

বিস্ময়কর তিন চরিত্র

ফন্ট সাইজ:

ফজলে লোহানী: সময়ের চেয়ে এগিয়ে
আমাদের টেলিভিশন জগতে বিনোদন সম্রাট বলা যায় তাকে। তিনি একজন উচ্চস্তরের সাংবাদিক। ষাট দশকে সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন মওলানা ভাসানীর সঙ্গে। নাম তার ফজলে লোহানী। ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। আমরা টেলিভিশনের সঙ্গে জড়িত তারা জানি তিনি টেলিভিশনে কী করেছেন। যেমন ফিল্ম রিপোর্টিং তিনিই শুরু করেছিলেন টিভিতে। তিনি আউটডোরে গিয়ে রিপোর্ট করতেন এবং তার যদি ‘কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের একটি পর্বে সেটা প্রচার করতেন। স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সূচনা তার হাত ধরে। সাহিত্য চর্চা করতেন, কবিতা লিখতেন, তারপরে সাংবাদিকতা। তিনি অগত্যা নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সঙ্গে ছিলেন এম আর আক্তার মুকুল। দুর্দান্ত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তার এই পত্রিকাটি। সত্তর দশকে তিনি চলে যান লন্ডনে সেখানে বিবিসি’র বাংলা বিভাগে কিছুদিন কাজ করেন। শোনা যায় ঢাকা থেকে লন্ডন গিয়েছিলেন মোটরসাইকেল চালিয়ে। ফিরে এসে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শুরু করেন যদি কিছু মনে না করেন। শুনেছি ১৯৬৭-৬৮ সালেও এই অনুষ্ঠানটি তিনি পাকিস্তান টেলিভিশনেও কিছুদিন করেছিলেন। সেটি ছিল কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ধাঁধার অনুষ্ঠান। ফজলে লোহানী ছিলেন এক বিস্ময়কর চরিত্র। টেলিভিশন নিয়ে তার একটি নিজস্ব পৃথিবী ছিল। বয়স যাই হোক তারুণ্য ছিল তার মনে। তিনি নিজস্ব এক বিষয় ছিলেন। তিনি অনুষ্ঠান করতেন নিজের মতো করে, কারও কোনো প্রভাব ছিল না। একটু অবসর পেলেই তিনি দুপুরে আমাদের খাবার দাবার পিঠাঘরে আসতেন। বড় কই মাছ বা চিংড়ির সঙ্গে ডাল তার প্রিয় ছিল। খেতে খেতে গল্প করতেন। আমি আর শাইখ সিরাজ তখন দিনের অধিকাংশ সময় বিটিভিতে পড়ে থাকি। নানা ধরনের কাজ করি তিনি জানতেন। আমাদেরকে তিনি টেলিভিশন সম্পর্কে দীক্ষা দিয়েছেন। অনেক ব্যাখ্যা দিতেন। আইডিয়া দিতেন। তারা যে আধুনিক মনস্ক সেটা তিনি নানাভাবে বুঝিয়ে দিতেন। আমরা তার ভক্ত ছিলাম।
একবার অভিনেতা আফজাল হোসেন বিটিভি’র আনন্দমেলা উপস্থাপনা করবেন। আফজাল হোসেন একদিন দুপুরে খাবার দাবারে। বসে বসে অনুষ্ঠানে কি হবে সেটা ঠিক করছে। তখন আমি আফজালকে বুদ্ধি দিলাম আনন্দমেলায় ফজলে লোহানীকে নিয়ে শুরু করতে। ফজলে লোহানীর কপালে একটি কয়েন লাগিয়ে দেয়া হবে। হাত ব্যবহার না করে তিনি কপাল থেকে কয়েনটি ফেলে দিবেন। দেখবে অনুষ্ঠান জমে যাবে। সত্যি সত্যি অনুষ্ঠানে দেখা গেল ফজলে লোহানী কয়েনটি ফেলার জন্য মাথা ঝাঁকাতে থাকলেন। এক পর্যায়ে তিনি লাফাতে থাকলেন কিন্তু কয়েন আর পড়ে না। দর্শক তো হেসে ঢলে পড়তে লাগলেন। পরে আফজাল হোসেন বুঝতে পেরেছিলেন যে, ফজলে লোহানী প্রথম থেকেই বুঝেছিলেন যে তার কপালে কোনো কয়েন নেই কিন্তু অনুষ্ঠানের স্বার্থে তরুণ একজন উপস্থাপককে তিনি বুঝতে দেননি। আফজাল সবসময় বলেন এই যে তারুণ্য, তিনি যে পারফরমেন্স করলেন এটাই রিয়েল পারফরমার। এটা ফজলে লোহানীর দ্বারাই সম্ভব। তার মতো এমন ব্যক্তিত্ব আমরা টেলিভিশন মিডিয়ায় দেখিনি। ফজলে লোহানীর এই তারুণ্যকে আমরা শ্রদ্ধা করি। খাবার দাবার-এ তিনি নিয়মিতই আসতেন, আড্ডা দিতেন। একদিন তিনি রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠছেন-তখন আমাকে ডাকলেন। আমি দৌড়ে গেলাম তার কাছে।
বললেন, সাগর শোনো জীবনকে যদি দ্রুতগতির করতে চাও, জীবনকে যদি সহজ করতে চাও তাহলে একটি গাড়ি কিনো। গাড়ি না কিনলে জীবন সহজ হয় না।
কথাটি আমার আজও মনে আছে। কেউ গাড়ি কিনলে আমি তাকে স্বাগত জানাই এবং এই গল্পটা তাকে শোনাই। আমিও সেদিন তার কথা শুনে এতটাই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম একটি গাড়ি কেনার জন্য। গাড়ি কিনলে যাতায়াত সুবিধা আর যাতায়াত সহজ হলে কাজও সহজ হয়ে যাবে। এটা আমি শিখেছি ফজলে লোহানীর কাছ থেকে। যদি কিছু মনে না করেন অনুষ্ঠানটি মাসে দুটো পর্ব যেতো। এই অনুষ্ঠানটির কাঠামো ছিল সেটার বাইরে তিনি যেতেন না। কুইজ ছিল, কইনছেন দেহি পারফরমেন্স ছিল। একটা রিপোর্ট ছিল, হাস্যরসাত্মক গান থাকতো। কখনো বা আলোচনা থাকতো- এভাবেই সাজানো হতো অনুষ্ঠানটি। কিন্তু খুবই জীবন্ত অনুষ্ঠান ছিল এটা। অনুষ্ঠানটি এমনভাবে সাজানো হতো তাতে কোনো ম্যাড়মেড়ে ভাব থাকতো না। তার কথাবার্তায় খুব স্মার্টনেস থাকতো। তাই অনুষ্ঠানটি অনেক জনপ্রিয় ছিল সবার কাছে। আমরা অনেকেই তাকে ভুলে গেছি। অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছেন অনেকের কাছে। কিন্তু আমাদের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে, সাংবাদিকতায় তার নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে। আমরা যারা অনুসন্ধিৎসু, যারা কাজের জন্য মেতে থাকি তাদের কাছে তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ টেলিভিশন যে ক’জন মানুষের কারণে সাধারণের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে ফজলে লোহানী তাদের অন্যতম পথিকৃৎ। যদি কিছু মনে না করেন অনুষ্ঠানের বাইরে তিনি টকশো সহ কিছু অনুষ্ঠানও করেছিলেন। বাংলাদেশ বেতারে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হলে তিনি সেখানে উপস্থাপনা শুরু করেন। ’৭৭-’৭৮ সালে বেতারে ‘ফিলিপস সোপান’ নামে একটি অনুষ্ঠান হতো। লীনু বিল্লাহ ছিলেন সেই অনুষ্ঠানের প্রযোজক। জিঙ্গা শিল্পী গোষ্ঠী এই অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করতো। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করতেন ফজলে লোহানী। তিনি আমাদের কাছ থেকে বিস্মৃত হবেন না। তার সেই ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানটি দর্শকদের স্মৃতিতে থাকবে অনেক অনেক দিন। আমরা কখনো তাকে ভুলে যাবো না।

টেলিভিশনে আলী ইমাম
সালটা সত্তর, ‘কলম্বাস’ নামে ছোটদের একটা নাটক হবে তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। প্রযোজক ওয়ালিউল্লাহ ফাহমী। সবাই তাকে ‘চামু ভাই’ নামে ডাকে। তিনি অনেক বড় কর্মকর্তা। কেউ তাকে স্যার ডাকে না। তিনি সকলের চামু ভাই। আরেকজন বড় কর্মকর্তা মনিরুল আলম। তিনি ছিলেন বাবার বন্ধু। সেই সূত্রে তাকে চাচা সম্বোধন করতাম। সেই সময়ে একদিন টেলিভিশনে মনিরুল আলমের সঙ্গে দেখা হলো। ফলে টেলিভিশনের গম্ভীর পরিবেশটিও আমার জন্য প্রথম দিনেই সহজ-স্বাভাবিক হয়ে গেল। এক ধরনের আন্তরিক ও মমতাময় পরিবেশ। টেলিভিশন আমার মন জয় করে নিলো। এ ছাড়া বিখ্যাত মুস্তাফা মনোয়ারকে নিমা রহমানের মামা সূত্রে আমরা মন্টু মামা ডাকতাম। বাবার বন্ধু হলেও আবদুল্লাহ আল মামুন, মুসা আহমেদ প্রমুখকে আমরা ভাই বলেই সম্বোধন করতাম। টেলিভিশন ভবন আমাদের শৈশবেই হয়ে উঠলো প্রিয় এক ঠিকানা।
‘অমর জীবন’ নামের একটা অনুষ্ঠানে কলম্বাস নাটকটি সরাসরি সম্প্রচার হবে। মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী ভিত্তিক ২০/২২ মিনিটের এই নাটক। তখন একটা নাটকের ৩/৪ দিন রিহার্সেল হতো। প্রত্যেকদিন রিহার্সেলের জন্য সম্মানী দেয়া হতো আট টাকা।
তখন ডিআইটি ভবনে (এখনকার রাজউক) ছিল টেলিভিশন স্টেশন। একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিহার্সেল শেষে আমরা আড্ডা দিচ্ছি। সেই আড্ডায় একজন ঝাঁকড়া চুলের কিশোর এসে বললো, আমার নাম আলী ইমাম। ‘কলম্বাস’ নাটকটি আমি লিখেছি।
আমি উৎসাহী হয়ে বললাম, আমি আপনার অনেক লেখা পড়েছি। কচি-কাঁচার আসর, মাসিক কচি ও কাঁচা, টাপুর টুপুর-এ আপনি তো নিয়মিত লিখে থাকেন।
পত্রিকার পাতায় লেখকদের নামের সঙ্গে পরিচয় হয়। কিন্তু টেলিভিশনে কেউ নাটক লেখে তার সঙ্গে পরিচয় থাকাটা নিশ্চয়ই খুব গর্বের। আমি অভিভূত হলাম। বয়স আমাদের চেয়ে খুব বেশি নয়। পরিচয়ের পর কত যে টেলিভিশন অনুষ্ঠান তার সঙ্গে করেছি তার কোনো হিসাব নাই। ছোটদের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, নাটকের সিরিজ, রহস্য কাহিনী, সাধারণ নাটক, ভৌতিক কাহিনী, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, গানের অনুষ্ঠান- কিছুই বাদ যায়নি। সীমাবদ্ধ সুযোগ কিন্তু আন্তরিকভাবে আমরা নিত্য নতুন অনুষ্ঠান করার স্বপ্ন দেখতাম। আলী ইমাম প্রায় ৬০০ এর মতো বই লিখেছেন। কিন্তু টেলিভিশনে অগণিত অনুষ্ঠান তিনি করেছেন। গ্রন্থনা, উপস্থাপনা, পরিচালনা করেছেন অসংখ্য অনুষ্ঠান। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে যাওয়ার মতো। কাজী কাইয়ুম, আলী ইমাম যে কতরকম ছোটদের অনুষ্ঠান করেছেন তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে।
টেলিভিশনের সূচনা লগ্নে আলী ইমামের সঙ্গে ছিলেন প্রখ্যাত প্রযোজক রিয়াজউদ্দিন বাদশা, চলচ্চিত্রকার সাইদুল আনাম টুটুল। পরে আমি। আমার পরে লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, রহীম শাহ কাজ করেছে। সত্তরের শেষ ভাগে শুরু হলো ছোটদের উপযোগী মজাদার খবর-বার্তা নিয়ে চমকপ্রদ অনুষ্ঠান ‘ছোট্ট খবর’। খুব জনপ্রিয় হলো এই অনুষ্ঠানটি। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এত এত উন্নত ছিল না। ইন্টারনেট ছিল না, আন্তর্জাতিক টেলিফোন কলের সুবিধাও নেই। অবাক বিস্ময়ে দেখতাম আলী ইমাম অর্থাৎ আমাদের হেলাল ভাই কীভাবে কীভাবে যেন বিচিত্র খবর সংগ্রহ করতেন। তথ্যের সঙ্গে ছবি ব্যবহার করে ছোট্ট খবর গ্রন্থনা করতেন তিনি।
আলী ইমাম টেলিভিশনে যে টাকা আয় করতেন ছাত্র বয়সে সেই টাকা দিয়ে বই কিনতেন। পড়ালেখার খরচ জোগাতেন। সেকালে ঠাটারি বাজারে তার চিলেকোঠায় যারা গিয়েছেন তারা জানেন আলী ইমামের কি বিপুল সংগ্রহশালা ছিল। ঘরভর্তি বই আর বই। ’৭১ এ যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো তখন তিনি আর টেলিভিশনে যাননি। অনুষ্ঠান করা থেকে বিরত ছিলেন। স্বাধীনতার পর আবার টেলিভিশনে ফিরলেন। টেলিভিশনের মাধ্যমে নতুন দেশের নতুন স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করলেন। তখন দেখেছি, আলী ইমাম নিয়মিত রেডিও অনুষ্ঠানও করতেন। সুললিত ভাষায়, মধুর কণ্ঠে তার বক্তৃতার সুনাম ছিল সর্বত্র।
এরপর শুরু হলো টেলিভিশনে তার পেশাগত কর্মজীবন। সম্ভবত টেলিভিশনে তিনি সবচেয়ে বেশি অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন। প্রযোজক হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় বিচিত্রা শুরু করলেন। কত বৈচিত্র্য যে এই অনুষ্ঠানে ছিল। আজকের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি তখন ছাত্র বয়সে বিশ্ববিদ্যালয় বিচিত্রায় অংশ নিতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালকও ছিলেন তিনি। জনসংখ্যা বিষয়ক একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। রাবেয়া খাতুনের একটা প্রেমের গল্প নিয়ে নাটক। বৈচিত্র্যময় বিষয়। পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে নাটক। শেষ মুহূর্তের দৃশ্যে দেখা যায় বিয়েতে একটা উপহার দেয়া হয়েছে। বাক্সের ভেতরে লেখা ছিল ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’। আলী ইমাম ও রিয়াজউদ্দিন বাদশা এই নাটকটি প্রযোজনা করতেন।
একক গানের অনুষ্ঠান ছিল ‘মালঞ্চ’। আলী ইমাম প্রযোজনা করেছিলেন কয়েকটা পর্ব। ‘পাপিয়ারে পাপিয়া’ সেই গানটা শুটিং করেন আলী ইমাম। বড় একটা আয়নার সামনে পাপিয়া সারোয়ারকে দাঁড় করানো হয়। দুই পাশে দুই পাপিয়া। গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন তুখোড় প্রযোজক। সরাসরি ধারা বর্ণনা দিতেন ফুটেজের ওপর। কোনো স্ক্রিপ্ট প্রয়োজন হতো না। তার এই নিপুণ ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হতাম। মনে পড়ে, একদিন রুম থেকে বের হয়ে দ্রুত ছুটে গেলেন কন্ট্রোল রুমে। দ্রুতই ফিরে এলেন।
কি করলেন হেলাল ভাই?
একটা টোকা দিয়ে এলাম।
মানে কি?
আলী ইমাম ভাই বললেন, গীতাপাঠের ব্যাকগ্রাউন্ডে সাধারণ একটা ভবনের ছবি। ওটাকে সরিয়ে মন্দিরের ছবি দিয়ে দিলাম টোকা মেরে।
এরকম শত শত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে তার সঙ্গে। আলী ইমাম ভাই জেনারেল ম্যানেজার পদে নিয়োগ পান। তারপর অবসর গ্রহণ করেন। একটা জীবন তিনি কাটিয়েছেন টেলিভিশনের সঙ্গে। তার ধ্যান জ্ঞান ছিল এই নতুন মিডিয়া ঘিরে।
শেষে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। আশির দশকের শুরুতে, তুমুল জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’র ঈদ বিশেষ সংখ্যায় আলী ইমাম লিখলেন একটি আলোচিত কিশোর উপন্যাস-অপারেশন কাঁকনপুর। বিখ্যাত অভিনেতা, নাট্যকার মমতাজউদ্‌দীন আহমদ ছোটদের সেই উপন্যাসটিকে নাটক বানালেন। বড়দের আসরে ছোটদের নাটক। এমন অনেক ঘটনার জন্মদাতা আলী ইমাম।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে তার কথা কখনো ভোলা যাবে না।

ফরিদ আলী: বিটিভি’র আরেক ইতিহাস
হঠাৎ করে বিস্ময় লাগতে পারে তার নাম শুনে। তাকে সবাই চেনে। তার কথা হয়তো অনেকে ভুলে গেছে। আমাদের এই চলচ্চিত্রে, আমাদের টেলিভিশনের জগতে অনেক শিল্পী এসেছেন। চলেও গেছেন। তাদের কারও কথা আমাদের মনে আছে। কারও কথা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রে কি টেলিভিশন জগতে যাদের অবদান কখনো কখনো হয়তো ভুলেও যাই কারও অবদান চেষ্টা করলেও ভোলা সম্ভব না।
ফরিদ আলী সেই বিরল গোত্রের এক শিল্পী। সেরকমই একজন মানুষ তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম নাটকের শিল্পী ছিলেন ফরিদ আলী। তৃতীয় নাট্যকার ফরিদ আলী। এই কথাটি যারা টেলিভিশন নিয়ে গবেষণা করেন, যারা টেলিভিশন ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্ট জন। তাদের প্রায় সবারই জানা। টেলিভিশন নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা ইতিহাস সংশ্লিষ্ট। পরবর্তী পর্যায়ে টেলিভিশনের মানুষেরা ব্যক্তির বাইরে কারও সম্পর্কে জানতে অনেক চেষ্টা করেছেন। রিসার্চ হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। অথচ টেলিভিশনে প্রথম নাটক ছিল ‘এক তলা দোতলা’। মুনীর চৌধুরীর নাটক। সেই নাটকের সবাইকে নিয়ে নানা আলোচনা হতে পারে। হতে পারে টকশো। গবেষণা লব্ধ অনুষ্ঠান। একতলা দোতলা নাটকে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন রামেন্দু মজুমদার। নাট্যজন।
এই ভূমিকায় কাজ করতে তখন বলা হয় আরেকজনকেও। তিনি ছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম। কিন্তু সৈয়দ হাসান ইমাম তখন মঞ্চের নিবেদিত প্রাণ অভিনয় শিল্পী। চলচ্চিত্রের ডাকসাঁইটের অভিনেতা। তিনি টেলিভিশন নামের একটা নতুন মাধ্যমে অভিনয়ের জন্য কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চাননি। হয়তো সময়ও দিতে পারেননি বলে রামেন্দু মজুমদার মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন। ফরিদ আলীও তখন ছিলেন নিষ্ঠাবান মঞ্চের অভিনেতা। তার অবয়ব, চেহারার কারণে স্বভাবসুলভ অভিনয় করতেন। করতেন কৌতুক অভিনয়। সেই সময়টাতে- চৌষট্টি পঁয়ষট্টি সালে আলোচিত এক কমেডিয়ান ছিলেন ফরিদ আলী। টেলিভিশনের পর্দাতেও তিনি সেভাবেই এলেন। সফল কৌতুক অভিনয় শিল্পী হিসেবে। কমেডিয়ান হিসেবে অনেক নাটক করলেন ফরিদ আলী। স্বাধীনতার পরে আমজাদ হোসেন সফল নাটক করেছিলেন ঈদ উপলক্ষে। ঈদ উপলক্ষে তিনি ঈদের বিশেষ নাটক করেছিলেন। এইসব নাটকগুলোতে বেঙ্গা নামের একটা চরিত্র থাকতো। এটা মূলত কাজের লোকের চরিত্র। এই সিরিজ নাটকগুলোর মধ্যে ছিলেন- টেলি সামাদ, সাইফুদ্দিন ও ফরিদ আলীর মতো সফল অভিনয় শিল্পীও। আরও অনেকের পাশে ফরিদ আলী আকর্ষণ করতেন তার অভিনয় প্রতিভায়। এই প্রতিভাদীপ্ত অভিনয়শিল্পীটি ছিলেন একাত্তরের একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। সরাসরি তিনি মুক্তিযুদ্ধে অভিনয় করেছিলেন। দেশ মুক্ত হলো। স্বাধীনতার পরে তিনি আবারো শিল্প চর্চা শুরু করেন।
নাটক করেছেন মঞ্চে। টেলিভিশনে, চলচ্চিত্রে। বিখ্যাত সব চরিত্র করেছেন ফরিদ আলী। ফরিদ আলীর প্রতিভার কথা বলি। তিনি কাগজে মাঝেমধ্যে কলাম লিখতেন। রাজনৈতিক সচেতন এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে দেখা হলে দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে আলোচনা করতেন। ফরিদ আলীর রচনায় বেশ কিছু নাটক আলোচনায় এসেছে। সেইসব নাটক বক্তব্যধর্মী। দর্শককে আলোড়িত করেছে। কখনো কখনো হাসির নাটক লিখেছেন সফলভাবে। আলোচিত হয়েছে এইসব নাটকগুলো। পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন অসংখ্য। করেছেন প্যাকেজ নাটক- অভিনয়ে, লেখায়, পরিচালনায়। চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে ফরিদ আলীর আত্মিক সম্পর্ক ছিল সারাজীবন। তিনি বারবার বলে গেছেন কথাটি।
বলেছেন, আমার মৃত্যুর পরে আমার নাম নিয়ে কেউ বিটিভি ভবনে যাবেন না। আসবেন চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেই অনুযায়ী সেটাই করা হয়েছিল। এমন এক শিল্পীর মৃত্যু হয় না। আজীবন তিনি থেকে যান দর্শক হৃদয়ে। ফরিদ আলীর মতো শিল্পীর মৃত্যু হয় না। আমার জীবনে ফরিদ আলীর ভূমিকা আরেকটু গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় সারাটা জীবন টেলিভিশনের সঙ্গে কাটালাম সেই টেলিভিশন অফিসে আমাকে প্রথম নিয়ে যান ফরিদ আলী। আমাদের ফার্মগেটের বাসায় সবেমাত্র টেলিভিশন নামের যন্ত্রটি এসেছে। সন্ধ্যাবেলা সেখানে শুরু হয় নানা রকম অনুষ্ঠান। প্রায় প্রতিদিন শুরু হয় ছোটদের অনুষ্ঠান। তখন রেডিওতে কবি আহসান হাবীব একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। সেখানে নিয়মিত অংশ নিই। ফরিদ আলী তখন আমাদের বাসায় নিয়মিত আসতেন। ফরিদ আলী একদিন আব্বাকে বললেন, সাগর তো রেডিওতে অনুষ্ঠান করছেই। টেলিভিশনে ক্যান করে না?
আব্বা বললেন, রেডিও তো কাছে। তাই বন্ধুদের সঙ্গে চলে যায়। টিভি তো ডিআইটিতে। যাবে কীভাবে?
ফরিদ আলী বললেন- এটা কোনো কথা হলো- আমিই তো নিয়ে যেতে পারি।
একদিন সত্যি সত্যি আমাকে নিয়ে গেলেন টেলিভিশন ভবনে। পরিচয় করিয়ে দিলেন মুস্তাফা মনোয়ার আর মাসুমা খাতুনের সঙ্গে। মাসুমা খাতুন আমাকে নিয়ে গেলেন খালেদা ফাহমীর কাছে। একটি আবৃত্তির ছোটদের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হচ্ছে। খালেদা ফাহমী বললেন- কবিতা জানো? একটা কবিতা শোনাও। আমি অনেকগুলো কবিতা শোনালাম।
সেই শুরু। ফরিদ আলী যে আগ্রহ ভরে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তা না হলে আমার একজীবনে টেলিভিশন হতো না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন