রহস্যঘেরা আর্মেনিয়ান গির্জা

ঈদ সংখ্যা ২০২৬

রহস্যঘেরা আর্মেনিয়ান গির্জা

ফন্ট সাইজ:

বই পাগল মানুষদের দেখতাম কেউ কেউ রিডার ডাইজেস্ট পড়তেন। আমাদের বাড়িতেও ছিলেন তেমন একজন। তার কাছ থেকেই মাঝে মধ্যে রিডার্স ডাইজেস্ট নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতাম। পড়তে ভালো লাগতো সেখানকার ড্রামা ইন রিয়েল লাইফ সিরিজের লেখাগুলো। সাধারণ মানুষের জীবনে কখন যে কীভাবে উদ্ভট বা অকল্পনীয় কিছু ঘটে যায়- তা নিয়েই থাকতো লেখাগুলো, দারুণ রোমাঞ্চকর। কিন্তু তখন ভুলেও ভাবিনি আমার জীবনেও একটি অদ্ভুত দিন অপেক্ষা করে আছে।
২০০২ সাল। দুপুরে হঠাৎই অফিসের এমডি বৃটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের ডাক। তার কাছে যেতেই বললেন- ‘একুশে আপাতত বন্ধ, তাই বলে ভেবো না আমরা আর ফিরে আসবো না। তোমরা যদি ঘরে বসে থাকো, তাহলে তো কাজের প্রতি আগ্রহ থাকবে না। কিছু ফিচার ধর্মী কাজ করো না কেন?’
সায়মনের কথা মুহূর্তেই আদেশ হয়ে মাথায় ঘুরতে লাগলো। বিকালে সীমার সঙ্গে দেখা ধানমণ্ডিতে। ওর বাবাকে দেখতে হাসপাতালে এসেছিল। ওর সঙ্গে গল্প করতে চাইতেই বললো- আমি তো বাসায় যাচ্ছি। বললাম বেশ তো আমি দিয়ে আসি, যেতে যেতে কথা বলবো। সীমাকে নিয়েই আমরা রিকশা করে চললাম পুরান ঢাকার আরমানিটোলার পথে...
রিকশায় যেতে যেতে হঠাৎই সীমা বললো- তুমি কি কিছু ভাবছো। চমকে গিয়ে ভাবলাম- সীমা কি ভাবছে আমি ওর প্রতি খুব দুর্বল? পর মুহূর্তেই বুঝলাম, মেয়েদের সেই অদ্ভুত ক্ষমতা সীমার মধ্যেও আছে। সে ঠিকই বুঝতে পারছে আমি ভিন্ন কিছু ভাবছি। বললো কী ভাবছো বলো? বললাম দুপুরে সায়মনের কথা, নতুন একটা ফিচার করতে হবে। শুনেই সীমা বললো- দারুণ- আমার বাসার সামনেই একটা ভুতুড়ে গির্জা আছে, কেউ যায় না সেখানে, অনেক দিন বন্ধ। তুমি এটা নিয়ে একটা স্টোরি করো। ইউনির্ভাসিটি এলাকা পার হয়ে পুরান ঢাকার এলাকায় ঢুকতেই এক অন্য আবহ। আমাদের রিকশা আটকে গেল একটি তাজিয়া মিছিলের পেছনে, তখন মহররম। শোক মিছিলটির পিছু পিছু ধীরে চলছি আরমানিটোলার দিকে। ভিড়ভাট্টা ঠেলে আমরা যখন গির্জার কাছে তখন প্রায় সন্ধ্যা। ভাবলাম আজকেই একটু দেখে যাই। কিন্তু কাউকেই পেলাম না দরজা বন্ধ, কেউ সাড়া দিলো না। সীমা বললো, ঠিক আছে আমি কাল সকালে সব খোঁজ নিয়ে তোমাকে জানাচ্ছি। আমিও সেই আশায় সীমাকে তার বাড়িতে নামিয়ে ফিরে এলাম।
পর দিন সকালেই সীমার ফোন, জানালো সমাধান পাওয়া গেছে। যেকোনো দিন সকাল ১০টার পরে গেটে ইনু নামে একজনক খোঁজ করলেই গির্জায় প্রবেশ করা যাবে। ইনু এখানকার কেয়ারটেকার। আমিও সেই মতো প্ল্যান করে একদিন সকালে একুশের ক্যামেরা টিম নিয়ে হাজির গির্জার গেটে। ‘ইনু ভাই, ইনু ভাই’ বলে ডাকতেই কিছুক্ষণ পর গির্জার বিশাল দরজা খুলে গেল। মুহূর্তেই মনে হলো এ যেন পুরনো এক বইয়ের পাতা। যেখানে কল্পনায় ভাসে এ কালের দূষণ আর দখলের ইতিহাস ছাড়িয়ে বুড়িগঙ্গার জৌলুসময় দিন। ইংরেজ, আর্মেনীয় বণিকেরা এসে ভিড়ছেন তার তীরে গড়ে ওঠা ছোট্ট শহর ঢাকায়। বাণিজ্য শেষে কেউ ফিরে গেছেন, কেউবা ফেরেননি, খুঁটি গেড়ে রয়ে গেছেন সারিবদ্ধ কবরের এপিটাফ হয়ে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমরা কীভাবে এখানে শুটিং শুরু করবো। আসলে প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে কোথাও আমি দাঁড়াতেই পারছিলাম না- পুরোটা পথেই ছিল কবর বিছানো। যাই হোক, এর মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করলাম। গির্জার যে হল রুম সেটা বন্ধ। আর যিনি এর দেখাশোনা করেন, অর্থাৎ ফাদার তিনি অসুস্থ , তার সঙ্গে দেখা হবে না- এ কথা বলে ইনু ভাই হঠাৎই হাওয়া। তাকে আর পেলাম না। অগত্যা আমরা ছবি তুলতে শুরু করলাম। হলরুম বন্ধ থাকায় বাইরের জানালা দিয়ে ছবি নেয়ার চেষ্টা করলাম। দেখলাম- রুমটির এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত একটি অস্বচ্ছ পর্দা ঝুলছে। ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম- সেটা আসলে পর্দা নয়, বিশাল এক মাকড়শার জাল! কবে যে শেষ সভা হয়েছে এই গির্জায় কে জানে!
ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে তৈরি গির্জার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম হাতের বাঁদিকে একটি কাঠের প্যাঁচানো সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে। একটি স্বতন্ত্র হাঁটাপথ মেঝেকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। মনে হলো ডান-পাশে নারী ও শিশুদের এবং বাঁ-পাশে পুরুষদের বসার স্থান রেখে স্বতন্ত্র পথটি সোজা গিয়ে মূল বেদিতে শেষ হয়েছে। সেখানে উঁচু বেদিতে যিশুখ্রিষ্টের কয়েকটি চিত্রকর্ম ও ক্রুশ চিহ্ন আঁকা। আর এদিকে বাইরে গির্জার আঙিনা জুড়ে রয়েছে প্রায় তিনশ’ কবর।
কবরগুলোও বেশ বৈচিত্র্যময়। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি কবরেই শোভা পাচ্ছে মার্বেল পাথর। তাতে মৃতের স্বজনদের আবেগময় নানা উক্তি লেখা। কোনো কোনো কবরে মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে, কোথাও মৃত সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার। আবার কোথাও স্বামী-স্ত্রীর প্রেমময় উক্তি শত বছরের বিরহের জানান দিচ্ছে। এই সমাধি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে ১৮৭৭ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর প্রয়াত ক্যাটচিক এভিটিক থমাসের সমাধিটি। কারণ এর পাশেই শ্বেতপাথরের একটি নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। এটি থমাসের স্ত্রী কলকাতা থেকে এনে এখানে স্থাপন করেছিলেন তার মৃত স্বামীকে উৎসর্গ করে। তবে, আশপাশে কোথাও খুঁজেও থমাসের স্ত্রীর নাম কিংবা সমাধি কিছুই পাওয়া গেল না। এখানে শেষ যাকে সমাধিস্থ করা হয় তার নাম ভেরোনিকা মার্টিন। কবরস্থানে গেলে মানুষের মন এমনিতেই একটু বিষণ্ন হয়ে যায়। এখানে অসংখ্য বাগান বিলাস আর কিছু বুনো গাছের পাতা বাতাসে যেভাবে দলবেঁধে কবরের উপর পড়ছিল আবার আরেকটি দমকা বাতাস এসে এপিটাফের উপর থেকে সরে যাচ্ছিলো- মনে হচ্ছিলো যেন হঠাৎই একটি মিউজিক্যাল উইন্ড বইছে। ক্যামেরা পারসন সুকি বলেই বসলেন- ভাইয়া হিচককের মুভির দৃশ্য মনে হচ্ছে। আর ঠিক তখনই গা হিম হয়ে গেল একটি দৃশ্য দেখে। ঝরা পাতা মাটিতে পড়ে যে কবরগুলো ঢেকে দিচ্ছিলো- সেগুলোরই দুটি হঠাৎ চোখে পড়লো। চিকন চিকন দুটি ছোট কবর। তাতে ভৌতিক দুটি মুখ অঙ্কিত। দুটির উপরই ইংরেজিতে লেখা ‘ডেঞ্জার’। এর কোনো মানে আমরা আর উদ্ধার করতে পারলাম না। ইনু ভাইকেও তো তখন পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু ক্যামেরা পারসন সুকি নাছোড়বান্দা। সে গির্জার পেছনে যেখানে অসুস্থ ফাদার রয়েছেন বলে শুনেছি- সেদিকে গেল ইনুকে খুঁজে আনতে। সুকির জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। ভয়ানক এক চিৎকারে পিলে চমকে গেল। দেখলাম পুরনো বাড়ির দিক থেকে দৌড়ে আসছে সুকি পেছনে তিন-চারটে কালো কুকুর। পালাবার পথও বন্ধ। মূল দরজায় তালা। আমরা- শুধু তখন ইনু ইনু বলেই ডাকছি। দেখলাম ৬ ফুট লম্বা সুকি কয়েকবার দেওয়াল টপকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ। অগত্যা ক্যামেরার ট্রাইপড হাতে নিয়ে আমি শেষ রক্ষার চিন্তা করছি। ঠিক তখন সব কিছু স্তব্ধ করে দিলো একটি ঠাণ্ডা হাত। হঠাৎ আমার ডান হাত চেপে ধরে একটি লোক বললেন- আপনি মানুষ ভালা আছেন, আসেন আপনারে বাইর কইরা দেই। আমি ঠিক কি বলবো বুঝে ওঠার আগেই- লোকটি বলে চললেন- আমি ওই দূরে ভাঙা কবরের মধ্যে থাকি। দেখতাছিলাম, আপনি কবরে পাড়া দেন না, দেইখা দেইখা হাঁটেন, ঈশ্বর আপনার ভালো করবে। সাহস করে একবার তাকিয়ে দেখলাম আসলে এই লোক ইনু ভাই কিনা- কিন্তু না- লোকটি ভয়ঙ্কর, বাঁ দিকে চোখ প্রায় ঝুলে গেছে রুগ্‌ণ দেহ। ধন্যবাদ দিতেও হয়তো মনে নেই- দেখলাম গির্জার দরজাটি খোলা। 



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন