কলেজ স্টেশনের পাখপাখালি

ঈদ সংখ্যা ২০২৬

কলেজ স্টেশনের পাখপাখালি

ফন্ট সাইজ:

বাংলার পাখি বইটা লিখেছিলেন প্রয়াত শ্রদ্ধেয় অজয় হোম। অজয় দা’র সান্নিধ্য পেয়েছিলাম উড়িষ্যার বিখ্যাত সিমলিপাল শালজঙ্গল ও সুন্দরবনে। প্রকৃতির নানান অঙ্গনে বিচরণ করলেও পাখিদের সম্পর্কে তার কাছ থেকে অমূল্য সম্পদ আহরণ করতে পেরেছিলাম। সেসব কথা মনে পড়লেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি। পাখিদের প্রতি আমার আগ্রহ সেই থেকেই বেড়ে গেছে। ওদের ডাক শুনে, সবুজ পাতার আড়ালে এক টুকরো রঙ দেখে তার পরিচিতি জানবার অদম্য কৌতূহল আমার শরীর মনে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

যেখানেই যাই না কেন, চোখ দুটো খুঁজে ফেরে সেই এলাকার পাখপাখালিদের। অচেনা অজানা জায়গার পাখিদের দেখে দেশের পাখির সাথে মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি। কখনো তেমন মিল খুঁজে পাওয়ার পর আহ্লাদে আটখানা হবার পর যখন জানতে পারি আমার জানা পুরোটাই ভুলের জালে জড়ানো, তখন একটু হতাশ হই। কিন্তু হাল ছাড়ি না। খুঁজে বার করি আসল পাখিটা কে!
আজ সেইরকম একটা অভিজ্ঞতার ঘটনা শোনাবো।
আমেরিকার দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগরের তীরে অবস্থিত টেক্সাস স্টেট। সেই স্টেটের অন্তর্গত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শহর কলেজ স্টেশন। রাজধানী অস্টিন থেকে পূর্ব দিকে এবং হিউস্টন থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত এই শহরে মাঝে মাঝে থাকতে হয় পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতনির সান্নিধ্য পাওয়ার লোভে। সালটা ২০২৪। নভেম্বরের শেষ দিক। ঠান্ডা আমাদের দেশের মতনই। তবে কখনো কখনো শীতের তীব্রতা তুষারপাত পর্যন্ত ঘটিয়ে ফেলে। সেটা অবশ্য এক-দু’দিনের জন্য। যাইহোক শীতের আনুষ্ঠানিক ফি’তে কাটা সেরে এখন মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।

প্রথম কিছুদিন ওদেশের উপযোগী বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক হতে সময় লাগলো। বাড়ির আশপাশে বেশ সবুজে ঢাকা। সেখানে প্রতিদিন ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। পাখির সাহচর্য পাই সকাল থেকে সন্ধ্যার অন্ধকার যখন গাছ-মাটি ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পর্যন্ত। এ আমার চরম উপলব্ধির কথা।

এবারে আসি শহরের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে। কলেজ স্টেশন এমন একটা শহর যেখানে কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও খাঁড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেই বনাঞ্চলের নাম দিয়েছে উলফ পেন ক্রিক। সেখানে জঙ্গলের মাঝে নানান জাতের গাছগাছালি আর লতাপাতার হৃদ্বন্ধন। খাঁড়ির জলের মধ্যে যেমন দেখেছি কচ্ছপ, ছোট ছোট মাছের দল, তেমনি গাছে গাছে দেখেছি নানা রঙের পাখি। ওই জঙ্গলের ভেতরে রয়েছে পথভ্রমণের জন্য সিমেন্ট বাঁধানো পথ এবং মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেবার জন্য ধাতব চেয়ার। প্রকৃতি এখানে সামান্য কৃত্রিমতার অলংকার গায়ে চড়িয়েছে মানব পুত্রদের মনকামনায়। জঙ্গলের ভেতরে অসংখ্য পাখির কুজনে প্রাণ ভরিয়ে দেয়। মনেই হয় না শহরের মাঝে কৃত্রিম সাজানো বনভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। যতক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে থাকি নিজেকে বন্য হিসেবে ভাবতে ভালো লাগে। আগে পুত্রের বাসস্থান ছিল হোলম্যান ড্রাইভের আরবার এপার্টমেন্টে। উলফ পেন ক্রিকের কাছেই। আবাসন এলাকার ভেতরে তেমন গাছপালা ছিল না। শুধুমাত্র শকুনের দল ভিড় জমাতো আবর্জনা জমা রাখা গাড়ির কাছে।

প্রাকৃতিক উলফ পেন ক্রিক থাকায় এপার্টমেন্টের এলাকাটা পাখিদের পছন্দের জায়গা ছিল না। তাই পাখিদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ছুটে যেতাম উলফ পেন ক্রিকে। এখন পুত্রের বাসস্থান সরে এসেছে আরও দক্ষিণে, স্টোন ফরেস্ট এলাকার সেফায়ার ড্রাইভে। এটা এপার্টমেন্ট নয়। বাড়ি। এখানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতি বাড়িতেই গাছেদের মেলা। তাই পাখিদের মনপছন্দ জায়গা।
সকাল থেকেই পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়ে যায়। চড়ই, ঘুঘু থেকে শুরু করে কতরকমের পাখি আসে সারাদিনে। সকালে হাঁটাহাঁটি করতে এলাকার পথচলার সময় কতরকমের সংগীত মূর্ছনা ভেসে আসে গাছের ডাল থেকে। ভালো করে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি, চড়ই’-এর দেশজ রূপ ছাড়িয়ে কত বিচিত্র রূপে সেজেজেন তিনি। কখনো কালো-সাদা চিত্রবিচিত্র সাজ। আবার স্নিগ্ধ হলুদ রঙে রূপবতী হয়েছেন। কোনোদিন গাছের ডালের ফাঁকে অনেক কষ্টে আবিষ্কার করলাম কালোয়-সাদায় মেশানো চড়ই।
শীতে অনেক গাছের পাতা ঝরে শ্রীহীন হয়ে পড়ে। বসন্তের শুরুতে পাখপাখালি নৃত্য-গীতের অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে। অনেক গাছেই তখনো সবুজের দেখা না গেলেও ফুল ফুটতে শুরু করে। এই সময় বিহঙ্গের আনন্দ কোলাহল যেন আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তোলে। আমিও কান পেতে শুনতে শুনতে বিহ্বল হয়ে যাই। শ্লথ হয়ে যায় পথ চলা। কখনো দাঁড়িয়ে যাই পাখির রূপমাধুর্যে মোহিত হয়ে।
সেদিন সকালে হৈ হৈ করে রোদ উঠেছে। বাড়ির পেছনে আগাছা তুলছিলাম এক মনে। মাঝে মাঝে চোখ যাচ্ছিল গাছের ডালে। নাতনি টুটুই ডাক দিলো, দাদা তোমার মাথার উপরে কি সুন্দর পাখি। আস্তে আস্তে নড়াচড়া বন্ধ করে ঘার উঁচু করে দেখি, একি! আমাদের মাছরাঙা এখানে! ঠিক মাছরাঙার মতন কত রঙে যে সেজেছে! আহা! মন-প্রাণ জুড়িয়ে গেল। তবে সে বেশিক্ষণ সময় দিলো না। উড়ে গেল পাশের বাড়ির গাছে, তারপর উধাও। পরে জানলাম তিনি পেইন্টেড বান্টিং।
সেদিন সকালে বেশ খানিকটা হেঁটেছি। হঠাৎ লাল টুকটুকে আমাদের আলতাপরী পাখির মতন একটা পাখি দেখি মনের আনন্দে ডেকেই চলেছে। যেন বলছে, ওগো, দেখ আমার রূপ। এই রূপ আমি দেখেছিলাম উড়িষ্যার সিমলিপাল জঙ্গলে আলতাপরী পাখির মধ্যে। এখানে তার নাম হয়েছে সামার টানাগার। কি যে মোহময়ী সে রূপ, তা আর বলার মতন নয়। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, হঠাৎ ‘এক্সিকিউজ মি’ শুনে দেখি রাস্তা আটকে আমি দাঁড়িয়ে মগ্ন হয়ে পাখি দেখছি। লজ্জা পেয়ে সরি সরি বলতে বলতে সরে যাবার পর মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি ওমা! কোথায় তিনি! নেই তো নেই! নাহ্ আর লালপরীকে আর দেখতে পেলাম না। পরে জেনেছি এদেশে নাম দিয়েছে ‘সামার টানাগার’।
তার দু’দিন পরেই বাড়ির পেছনে আবার তার দেখা পেলাম। বাড়ির পেছনের গাছে একা বসে আছে। লাল রঙ দেখে বাইরে বেড়িয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ও হরি এ তো আর এক রূপসী। এর আবার মাথার উপরে লাল ঝুঁটি আছে। লম্বা লেজ। ঠোঁটের গোড়ায় কালো দাগ। এখানে একে বলে নর্দার্ন কারডিনাল। এর ডাকটাও অন্যরকম। অনেকটা পাপিয়ার মতন। আহা দেখবার মতন বিহঙ্গ! মনে হোলো সারাদিন ওকে দেখি। মন ভরে গেল।
ক্রমশ: পাখি দেখার তাগিদ বেড়ে গেল। একটা মজার অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক। কুচকুচে কাকেদের দেখে মনে হলো এদেশের কাকেরা হাবিজাবি খায় না বলে কাকেদের চেহারাটা আমাদের দেশের কাকেদের মতন অতটা নাদুসনুদুস নয়। একটু দূর থেকে দেখে কাক বলে কয়েকবার ভুল করে নিজেই।

জিভ কামড়ে ফেলেছিলাম। সমস্ত পাখনা কালো। চেহারাটাও কাকেদের পালকের মতন। দূর থেকে কাক ভেবে সরে আসছি এই সময় তার জুড়ি এসে হাজির। ভালো করে তাকিয়ে দেখি না না এটা কাক নয়। এর ডানায় কালোর মধ্যে একটু গাঢ় নীল রঙ লেগে আছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এটা পার্পেল মার্টিন (পুরুষ)।
যাচ্ছিলাম বাজার করতে। ওয়ালমার্ট’-এর চত্বরে একটা গাছে মনে হলো একটা কাক বসে আছে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালো করে দেখি, না না ইনি কাকেশ্বর কুচকুচে নন। রঙ কালো হলে কি হবে, লেজটাই তো অন্যরকম। শুনলাম এটাকে এরা লম্বা লেজওয়ালা গ্রাকেল বলে। তবে তিনি ডেকে শোনাননি বলে বুঝতে পারিনি তার ডাকে কাকেদের ছোঁয়া আছে কিনা। আর একদিনও ঠকতে ঠকতে বেঁচেছি। ইনি তো একশ’ ভাগ কাক বলেই জানতাম। ঠোঁটটা মিলছে না দেখে পাখিওয়ালাদের পরামর্শ নিয়ে বুঝলাম, ইনি রাস্টি ব্লাকবার্ড। কালো হলেও এর রূপে আলাদা একটা মাধুর্য আছে।
বসন্তে এখানে হামিং বার্ড খুব দেখা যায়। অনেকটা ফরিং-এর মতন দেখতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেদিন নীল বনেট ফুল দেখতে গিয়ে পাতার আড়ালে একটা হামিং বার্ড দেখলাম, অনবদ্য তার রূপ। গলার কাছে কমলা রঙের প্রলেপ। ডানায় একটা সবুজাভ ছোপ। বুকটা ধূসর রঙের। একজন পাখিওয়ালা বললেন, আপনি পুরুষ পাখি দেখেছেন। যদিও পাখিদের মধ্যে পুরুষ পাখিদের রূপ-মাধুর্য স্ত্রী পাখিদের চেয়ে অনেক বেশি (অবশ্য মানুষদের ক্ষেত্রে একটু আলাদা)।
আরও একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করলাম। আকাশ যখন মেঘে ছেয়ে যায় তখন পাখিদের স্ফূর্তি যেন অনেকটা স্থিমিত হয়ে যায়। মেঘ কেটে সূর্যের ছটফটে আলো বেড়িয়ে এলে পাখিদের রূপ ফিরে আসে। আরও একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, সেটা হল সকালে ও বিকালে পাখিদের মধ্যে যে সুরের মূর্ছনা শোনা যায়, দুপুরে সে সুর আর শোনা যায় না।
পাখিদের রূপ রঙ দেখে আর তাদের বিচিত্র সুরলহরী শুনে মনে হয় আমরা কেন এমন হৈ হৈ করে দিন কাটাতে পারি না? দু’চোখ ভরে এদের দেখেও যেন শেষ করা যায় না। এখানে ছাত্র, মাস্টারমশাই ও উৎসাহী মানুষরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাখিদের চেনা, জানার জন্য প্রতিবছর বিভিন্ন জায়গায় জমায়েত হয়। তারা কেন্দ্রীয়ভাবে একটা তালিকা তৈরি করে বিজ্ঞানসম্মতভাবে। আমার লোভ হয়, আহা! আমি যদি চলে যেতে পারতাম ওদের সাথে।
দেশে ফিরে এই কাজটা করার জন্য খোঁজ-খবর করতে হবে। আমার অভিজ্ঞতায় প্রকৃতির বিভিন্ন রূপকে হাজির করার চেষ্টা করি। যা আমার ভালো লাগে তা অনেকেরই হয়তো ভালো লাগবে। 


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন