বৃষ্টিমুখর মেঘলা দিনে পুনহিল ট্রেক

অ ভি যা নে র গ ল্প

বৃষ্টিমুখর মেঘলা দিনে পুনহিল ট্রেক

ফন্ট সাইজ:

সহজে অল্পদিনে পর্বত-দর্শনের জন্য নেপালের ঘোরেপানি পুনহিল ট্রেকের কথা শুনেছি। একটু খোঁজ করতেই কাঠমান্ডুর অ্যামেজিং নেপাল ট্রেক থেকে সন্তোষ এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানায়। আমি এভারেস্ট বেজক্যাম্প, গোকিও রি, এরকম কয়েকটা ট্রেক সেরে এসেছি। এরপর থোরাংলা হয়ে পুরো অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক বেশ দীর্ঘ। সেখানে তুষার-ঢাকা থোরাং-লা গিরিপথ পার হতে হবে। তার আগে অল্প কয়েকদিনে ঘোরেপানি-পুনহিল ট্রেক সেরে আসা যায়।

আগের দুটো ট্রেকে আমি একা গিয়েছি। অন্নপূর্ণা সার্কিটে যাবো মালয়েশিয়া ও বৃটিশদের বড় একটা দলের সঙ্গে। পুনহিলে কি স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া যায়? রানী হাঁটা-চলা জিম ও ফিটনেসের ব্যাপারে যথেষ্ট নিয়মিত। সামান্য প্ররোচনাতেই ও আমার সঙ্গে এই ট্রেকে যেতে রাজি। বসন্ত আর শরৎ এই দুই ঋতুই হিমালয়ে যাওয়ার জন্য ভালো সময়। এবার শরতের হিমালয় দেখতে চাই বলে অক্টোবরের শুরুর সময়টা বেছে নিই।

পার্বত্য পথে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা কতোটা, প্রকৃতি কেমন প্রবল হতে পারে, আর মেঘ-বৃষ্টি-ঢলের ভেতর দিয়ে কীভাবে ট্রেক করে যেতে হয় তার একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়ে গেল নেপালে ঘোরেপানি-পুনহিল ট্রেকে গিয়ে।
বিরেটহাটি থেকে উল্লেরি হয়ে ঘোরেপানি পর্যন্ত ট্রেকিং পথটি অন্নপূর্ণা অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ। স্বল্প দূরত্বের এ পথে মাত্র চার-পাঁচদিনে ট্রেক সেরে আসা যায়। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য এবং শারীরিক চ্যালেঞ্জের দিক থেকে এটা খুবই আকর্ষণীয়। প্রকৃতিপ্রেমী ও অভিযাত্রীদের জন্য এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। রানী ও আমি সেই অভিজ্ঞতা পাবার জন্য কাঠমান্ডু থেকে ইয়েতি এয়ারলাইন্সের প্লেনে সকালবেলা পোখরা এয়ারপোর্টে গিয়ে নামি। আগের মতোই এখানেও তেজ আমাদের গাইড। পোখরা থেকে গাড়িতে করে যাই নয়াপুল। সেখানে পোর্টার ভরতের হাতে আমাদের জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিয়ে কফি খেয়ে আমরা ট্রেক শুরু করার জন্য তৈরি হই। গাড়িতে আর একটু এগিয়ে গিয়ে আমাদের ট্রেক শুরুর জায়গা, বিরেটহাটি।
শান্ত শ্যামল বিরেটহাটি থেকে যাত্রা শুরু করতেই চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ নদীর কলকল ধ্বনি এবং গ্রামবাংলার মতো সরল মাটির পথ। দু’পাশে পাহাড়ি বসতি। একটু পরেই আমাদের এক পাশে নদী দেখতে পাই। প্রথমে শ্বেতি নদী। তারপর শ্বেতিবেনি। কিছুক্ষণ চলার পরেই এ পথে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় সুন্দর উচ্ছল আরেক পাহাড়ি নদী। সে নদীর নাম মোদি খোলা। নদীর চঞ্চল স্রোতধারা আমাদের পথ চলাটাকে ছন্দময় করে তোলে। ট্রেককে করে তোলে আরও সজীব। নদীর পাশে কোথাও ধানখেত, পাথরের তৈরি ছোট ছোট ঘর, আর স্থানীয় মানুষের আন্তরিক হাসি ও নমস্তে। সবমিলিয়ে খুবই মায়াবী পরিবেশ।
পথ যত এগোয়, প্রকৃতির রূপ ততই বদলে যায়। কখনো ঘন অরণ্যের ছায়া, কখনো খোলা আকাশের নিচে পাহাড়ি ঢাল। প্রতিটি বাঁক নতুন নতুন দৃশ্য উপহার দেয়। বসন্তকালে রঙিন রডোডেনড্রন ফুলে পাহাড় সেজে ওঠে। আর এখন, এই শরতে নীল আকাশ ও উজ্জ্বল রোদ। পাহাড়ের গায়ে সবুজের সমারোহ। দূরের তুষারাবৃত পর্বতশিখরের আভাস। অন্নপূর্ণা রেঞ্জের কয়েকটি শিখর দেখা যায়। সূর্যের আলো-ছায়ার খেলায় পাহাড় জীবন্ত হয়ে ওঠে। পথের পাশে ছোট ও বড় ঝরনা দেখতে পাই। কোথাও ঝরনার পাশে বসে তার কলস্বর শুনতে ভালো লাগে। ছবি তোলা হয়। সামান্য বিরতির পর আবার হাঁটতে শুরু করি।
সকালে বেশ ঠান্ডা ছিল। উজ্জ্বল সূর্যের নিচে প্রখর রোদে হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণের মধ্যেই গরম লাগতে শুরু করে। গায়ের জ্যাকেট আগেই খুলে নিয়েছি। এরপর টি-শার্ট খুলে ফেলি। আজ আর্দ্রতাও বেশি। ফলে ঘামে ভিজে গিয়েছে আমার গেঞ্জি। তার ওপর পিঠে ব্যাকপ্যাক। দু’একটা ছোট বিরতির পর একটা টি-হাউজে আমরা লাঞ্চের জন্য থামি। রীতিমতো সাইনবোর্ড দেয়া- সানাম রেস্তরাঁ। সামনে একটুখানি খোলা জায়গাতে চেয়ার-টেবিল আছে। সেখানেই বসি আমরা। ব্যাকপ্যাক নামিয়ে রেখে গায়ের গেঞ্জি খুলে সেটা নিংড়ে নিয়ে রোদে শুকাতে দিই। তিনজনের একটা ছোট্ট দল এখানে লাঞ্চ করছে। মালয়েশিয়া থেকে আসা ভারতীয় যুগল। সঙ্গে পুরুষটির বোন। ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমাদের খাবার আসে। মোমো আর স্যুপ খেয়ে একটু পরেই আবার হাঁটতে শুরু করি।
তেজ আমাদের বলে রেখেছে, বিকালের দিকে অনেকখানি চড়াই ধরে উপরে উঠতে হবে আমাদের। কিন্তু সেটা যে এত কঠিন হবে তা ভাবতেই পারিনি। কখনো গাছের ছায়ায়, কখনো সরাসরি সূর্যের নিচে অপরূপ আরণ্যক পথে হেঁটে চলেছি। কিছুক্ষণ পর দেখি সেই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিরেটহাটি থেকে উল্লেরি পর্যন্ত পথের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘ ও খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওঠা। তিন হাজারেরও বেশি পাথরের সিঁড়ি ট্রেকারদের শারীরিক সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা নেয়। রানী ও আমি প্রথম দিনেই সে কঠিন পরীক্ষা মোটামুটি দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করি।
উচ্চতা এখানে খুব বেশি নয়। তবুও কিছুক্ষণ পরপর আমরা হাঁপিয়ে উঠি। একটু থেমে আবার শুরু করি আমাদের আরোহণ। শ্বাসকষ্ট, পায়ে ব্যথা ও ক্লান্তিতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। আমি আগে এর চেয়ে অনেক বেশি অলটিচুডে ট্রেক করে এসেছি। সুতরাং এখানে ক্রমাগত উপরে ওঠার কষ্টটা পায়ের ওপর চাপ ফেললেও শ্বাসকষ্ট দুঃসহ নয়। রানী কীভাবে এতটা চাপ নিচ্ছে তা ভেবে উদ্বিগ্ন বোধ করি। একটু পর পর তাকিয়ে দেখি। এবং ওর ধীরস্থির অবিচল পায়ে উঠে আসা দেখে চমৎকৃত হই। আমার একটু পেছনে রীতিমতো স্বাভাবিক ছন্দে পা ফেলে আসছে রানী। তেজ আছে ওর কাছাকাছি। মাঝে মাঝে তেজের সঙ্গে এটাসেটা নিয়ে গল্প করে। একটু পর-পর থেমে আমরা দু’জনেই পানি খাই। তারপর আবার পথ চলি।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। হঠাৎ বাতাসে হিম ঠান্ডার ছোঁয়া পাই। অন্ধকারে এ পথ পাড়ি দেয়া কঠিন হবে। তাই আমরা চেষ্টা করি যতটা সম্ভব গতি বাড়াতে। প্রথমে দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি। মাথার উপরে গাছের পাতা ঘন হয়ে আছে বলে খুব বেশি ভিজতে হয় না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঝিমঝিম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। ঠিক তখনই চোখে পড়ে উল্লেরির লজের বাতি। বেশ কয়েকটা লজ পেরিয়ে আমরা আমাদের নির্দিষ্ট লজে পৌঁছে যাই। অনেকটা উপরে আমাদের সুপার ভিউ গেস্ট হাউজ।
এখানে আসার জন্য ওই তিন হাজার সিঁড়ি শুরু হওয়ার আগে ঠিকেডুঙ্গা নামে একটা লোকালয় আছে। কেউ কেউ ওখানেই রাতযাপন করেন। একটু আগে অন্ধকার হয়ে আসার সময় ভাবছিলাম একদিনে এতটা পথ ট্রেক না করে আমরাও ঠিকেডুঙ্গাতেই থামতে পারতাম। এখন অবশ্য এ পর্যন্ত উঠে এসে খুব ভালো লাগছে। যদিও পথটি কঠিন, তবুও প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল অদ্ভুত আনন্দ। চ্যালেঞ্জ জয় করার তৃপ্তি ট্রেকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। উল্লেরিতে পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে মনে হলো কষ্ট সার্থক। পাহাড়ের নির্জনতা, নির্মল বাতাস ও প্রকৃতির অমলিন সৌন্দর্য সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
মালয়েশিয়ান ট্রেকাররা অনেকটা পথ বৃষ্টিতে ভিজে এসে পৌঁছান প্রায় এক ঘণ্টা পর। একটু দেরিতে রাতের খাবার খাই আমরা। এরপর ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হয় না। বাইরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি।
পরদিন ভোরে যখন ঘুম ভাঙে তখন বৃষ্টি থেমেছে। তবে আকাশ হয়ে আছে ভারী। মেঘেরা পাহাড়ের কাঁধে হাত রেখে বসে আছে। আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে বের হই। উল্লেরির পাথরের বিখ্যাত সিঁড়িগুলো- হাজার হাজার ধাপ- বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে। প্রতিটি ধাপ পিচ্ছিল, তবু তার মধ্যেই এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হয়।
আমরা ব্যাকপ্যাক পলিথিনের ঢাকনায় মুড়ে নিই। রানী রেইন পঞ্চো পরে নেয়। আমার গায়ে রেইন জ্যাকেট। আবার হাঁটতে শুরু করি। রেইনকোটে পড়া বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ আর দূরে অদৃশ্য ঝরনার গর্জন- সবমিলিয়ে এক অনন্য সিম্ফনি। প্রবল বৃষ্টিতে উল্লেরি থেকে ঘোরেপানি পর্যন্ত ট্রেক অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা। চড়াই শুরু হতেই শ্বাস দ্রুত হয়, কিন্তু ঠান্ডা বাতাস ফুসফুস ভরে দেয় সতেজতায়। মাটির গন্ধ ও ভেজা পাতার সোঁদা সুবাস এই শরতেও মনে করিয়ে দেয় বর্ষার গভীরতা।
উল্লেরি পেরিয়ে পথ ঢুকে পড়ে ঘন অরণ্যে। বসন্তকালে এখানে রডোডেনড্রন ফুলে পাহাড় রাঙা হয়ে ওঠে, কিন্তু বর্ষায় ও শরতে তার রূপ অন্যরকম- পাতায় জমে থাকা জলের ফোঁটা, কুয়াশায় মোড়া ডালপালা। আর মাঝে মাঝে মেঘের দল নেমে এসে পথ ঢেকে দেয়। মনে হয় যেন মেঘের ভেতরেই হাঁটছি আমরা।
পথের ধারে ছোট ছোট ঝরনা নেমে এসেছে পাহাড় বেয়ে। ঝরনার পাশে দাঁড়ালে দেখা যায় কুয়াশা আর জলের মিশেলে তৈরি হচ্ছে স্বপ্নময় দৃশ্য। পাহাড়ের গায়ে শ্যাওলা আর ফার্নের সবুজে জলকণা মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। কিছু ঝরনা সরু রুপালি রেখার মতো, আবার কিছু প্রচণ্ড স্রোতে গর্জন করছে। বৃষ্টির কারণে এরা আরও প্রাণবন্ত- জলের শব্দে চারদিক মুখর। কোনো কোনো ঝরনায় জলের ধারা একেবারে পাহাড়ি ঢলের মতো প্রবল গর্জনে নেমে আসছে।
কয়েক জায়গায় জল বয়ে যাচ্ছে পুরো পথের উপর দিয়ে। সাবধানে পা ফেলতে চেষ্টা করি। তবু একসময় জলের স্রোত পায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, আমার ট্রেকিং বুটজোড়ার ভেতরে জল ঢুকে একাকার। এখানে সব ট্রেকারেরই জুতো ভিজে যায়, তবু কারও মুখে বিরক্তি নেই। বরং এই ভিজে যাওয়াতেই আছে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অনুভূতি। ঠান্ডা জলের ছিটে গায়ে পড়তেই শরীর কেঁপে ওঠে, আর মন ভরে যায় আনন্দে। তবে ভেজা পাথরের উপর খুব সতর্কভাবে পা ফেলতে হয়। কারণ, একবার পিছলে পড়লে জলের তীব্র স্রোতের সঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কোনো কোনো জায়গাতে সদ্য ঘটে যাওয়া পাহাড়ধসের দৃশ্য দেখি। ভূমিধসে মাটি-পাথরের বিরাট টুকরোসহ শেকড় উপড়ে প্রাচীন এক গাছ ডালপালা ছড়িয়ে পড়ে আছে পথের উপর। আমরা খুব সাবধানে গাছের ডাল ডিঙিয়ে বাধা পার হয়ে যাই।
বৃষ্টির দিনে পথ যেমন অন্যরকম পাহাড়ের সৌন্দর্যও বেশ নাটকীয়। এক মুহূর্তে চারপাশ সাদা কুয়াশায় ঢেকে যায়- দশ হাত দূরের কিছুই দেখা যায় না। আবার হঠাৎ মেঘ সরে গেলে দূরের পাহাড়ের ঢেউ, সবুজ উপত্যকা, আর গাঢ় অরণ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই লুকোচুরি খেলাই ট্রেকের আনন্দ বাড়িয়ে দেয়।
দুপুরে লাঞ্চের জন্য একটা টি-হাউজে থেমে দেখি সেই দুপুর বেলাতেও ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে। ব্যাকপ্যাক নামিয়ে রেইন জ্যাকেট ও ভেজা জামা খুলি। তেজ আমার পেছনে ছিল। দৌড়ে এসে ও আমাকে ধরে। আমার পিঠ থেকে কিছু একটা জিনিস টেনে তুলে নেয়। একটা জোঁক। সেটা যে এতক্ষণ আমার গায়ে ছিল তা টেরও পাইনি। এখন রক্তের একটা ধারা নেমে আসছে। তেজ যত্ন করে সেটা মুছে সেখানে লাগিয়ে দেয় একটা ব্যান্ড-এইড।
বৃষ্টি তো আছেই। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা বাড়ে। বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে, কানে ভেসে আসে দূরের বজ্রধ্বনি। কোথাও কোনো ছাউনি নেই। পথের শেষ অংশে ক্লান্তি চেপে বসে, কিন্তু সামনে ঘোরেপানির টি-হাউজ আর উষ্ণ স্যুপের কল্পনা নতুন শক্তি জোগায়।
প্রবল বৃষ্টিতে উল্লেরি থেকে ঘোরেপানি ট্রেক করা মানে শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়। আসলে এ এক অন্তর্মুখী যাত্রা। প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি ঝরনা, প্রতিটি মেঘ-কুয়াশার পর্দা আমাকে মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির শক্তি ও সৌন্দর্য।
ট্রেক শেষ করে যখন গন্তব্যের কাছে পৌঁছে যাই তখন ভেজা কাপড়, কাদামাখা জুতো, ক্লান্ত পাÑসব কিছুর মধ্যেই খুঁজে পাই তৃপ্তি ও প্রশান্তি। এটা লিখে বোঝানো কঠিন। ঘোরেপানিতে পৌঁছে দেখা যায় মেঘে ঢেকে পাহাড়চূড়া। পরিষ্কার দিনে এখান থেকে অন্নপূর্ণা ও ধৌলাগিরি পর্বতমালার দৃশ্য দেখা যায়, কিন্তু আজ বৃষ্টির দিনে সেই দৃশ্য রয়েছে আড়ালে। তবু মেঘের আড়ালেও পাহাড়ের উপস্থিতি অনুভূত হয়Ñ গম্ভীর, স্থির, বিশাল।
ঘোরেপানিতে যে ক’টা লজ আছে তার মধ্যে আমাদেরটাই মনে হয় সবচেয়ে উঁচুতে। জানালার কাছে বসে বাইরের মেঘ, বৃষ্টি ও আবছা পর্বতশিখর দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের প্রধান কাজ হলো ফায়ারপ্লেসের কাছে বসে নিজেদের উষ্ণ রাখা আর ভেজা জামাকাপড় ও জুতো শুকাতে দেয়া। ফায়ারপ্লেসের চারদিকে কাপড় শুকাতে দেয়ার জন্য কাঠের ফ্রেম তৈরি করে দেয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিরুপায় ট্রেকারদের জামা-কাপড় ও নানা আকারের বিচিত্র রঙের ইনটিমেট গার্মেন্টস সেখানে ঝুলছে। তারই মধ্যে ফাঁক খুঁজে আমি আমার গেঞ্জি, প্যান্ট, টি-শার্ট, মোজা ঝুলিয়ে দিই। পাসপোর্ট শুকাতে চেষ্টা করি নিজের হাতে রেখে। ব্যাকপ্যাকের ভেতরে থেকেও বৃষ্টি ও বাষ্পে ল্যাপটপ আর ফোনের যে ক্ষতি হয়েছে তা সারানো অসম্ভব। কিছু ছবিও হারিয়ে গেল।
পরদিন খুব ভোরে উঠে আমাদের পুনহিলে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার কথা। নেপালের ঘোরেপানি থেকে পুনহিলÑ এই পথটি সূর্যোদয়ের জন্যই বেশি বিখ্যাত। আমরা সেটা মিস করলাম। সারাদিন অপেক্ষা করলাম। দুপুরের দিকে বৃষ্টি থামলে সেই মেঘলা বিকেলেই আমরা পুনহিলে উঠতে শুরু করি। এখানে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখা হলো না। এরকম মেঘলা দিনে পাহাড়ের রূপ যেন অন্য এক গল্প বলে। সে গল্প নিঃশব্দ, গভীর ও ধীর।
বিকাল তিনটার দিকে ঘোরেপানি থেকে যাত্রা শুরু। আকাশে ঘন মেঘ, সূর্যের মøান আলো ছড়িয়ে পড়ছে ধূসর আবছায়ায়। ভোরের ভিড় নেই, পথ প্রায় নির্জনÑ এটাই বিকালের ট্রেকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। পথটি মূলত পাথরের সিঁড়ি আর মাটির ট্রেইল। শুরুতে ধীরে ধীরে চড়াই। অনেকটা উঁচুতে উঠবো, তাই একটু ধীর গতিতেই হাঁটা ভালো। ঠান্ডা বাতাসে শ্বাসের বাষ্প স্পষ্ট দেখা যায়।
ট্রেকের প্রথম অংশ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। রডোডেনড্রন, ওক আর পাইন গাছের সারি। পায়ের নিচে অজস্র ঝরা পাতা। মেঘ এত নিচে নেমে এসেছে যে মনে হচ্ছিল আমরা আকাশের মাঝখান দিয়ে হাঁটছি। কখনো চারপাশ পুরো সাদাÑ সামান্য দূরও দেখা যায় না। আবার হঠাৎ হালকা বাতাসে কুয়াশা সরে গেলে দূরের পাহাড়ের রেখা ভেসে ওঠে। এই লুকোচুরিই মেঘলা বিকালের সৌন্দর্য। প্রায় এক ঘণ্টার ট্রেক শেষ করে চূড়ায় পৌঁছে দেখি ভিউপয়েন্ট টাওয়ার কুয়াশায় আধাআধি ঢাকা। সূর্যাস্তের বদলে এখানে দেখলাম বিকালের মøান আলো আর মেঘের বিন্যাস।
পুনহিলের উচ্চতা ৩,২১০ মিটার বা ১০,৫৩১ ফুট। নেপালের মায়াগদি জেলাতে এর অবস্থান। অন্নপূর্ণা ও ধৌলাগিরি পর্বতমালার প্যানোরামিক ৩৬০ ডিগ্রি ভিউয়ের জন্য এ জায়গাটা বিখ্যাত। প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে এই পাহাড়কে একটা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন টেক বাহাদুর পুন। পাহাড়ের নিচের দিকে একটা সাইনবোর্ডে তার নাম লেখা আছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন তিনি।
পরিষ্কার দিনে এখান থেকে দেখা যায়Ñ অন্নপূর্ণা, ধৌলাগিরি, মাছাপুচ্ছ্রে, ও নীলগিরি। কিন্তু সেদিন পাহাড়গুলো পুরোপুরি দেখা যায়নি। বরং মেঘের ফাঁকে ফাঁকে তুষারঢাকা শিখরের আভাসÑ যেন প্রকৃতি ইচ্ছে করেই সবটা দেখাচ্ছে না। আংশিক দৃশ্য রহস্যময় লাগে।
বিকালের ট্রেকের আরেকটা সৌন্দর্য হলো নীরবতা। সূর্যোদয়ের সময় যেখানে ভিড় থাকে, বিকালে সেখানে শান্ত পরিবেশ। মেঘের চলাচল, বাতাসের শব্দ, আর দূরের অদৃশ্য পাহাড়- সবমিলিয়ে এক ধ্যানমগ্ন পরিবেশ। মনে হয়, এই ট্রেক শুধু চোখের জন্য নয়- মনের জন্যও। মেঘ-পাহাড়ের চিকিৎসা। আর সব শেষে ঘোরেপানিতে ফিরে গরম হানি-জিনজার-লেমন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানালার বাইরে মেঘের চলাচল দেখা। এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই পুরো ট্রেকের সবচেয়ে স্থায়ী স্মারক হয়ে রইলো। Í


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন