‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ ভাবতে ভাবতেই শ্যামল সবুজ নীলিমার দেশ থেকে শ্যামের বাঁশির টানে ছুটেছিলাম সিয়াম দেশ, শ্যামদেশে, থাইল্যান্ডে। ভারত নাকি থাইল্যান্ডে- এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পথ চলার ভাবনা ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে চিকিৎসার প্রয়োজনে অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল। ‘রথ দেখা আর কলা বেচা’র পথিক সবসময়ই পথকে প্রয়োজনের আপন সীমানা পেরিয়ে কল্পনার বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকে প্রিয়জনের সাথে জীবনানন্দে পরিভ্রমণে। তেমনই এক কল্পনার মতোই আনন্দময় বেড়ানোর অভিজ্ঞতা লাভ করি প্রকৃতির অনন্য সুন্দর থাইল্যান্ডের ক্রাবিতে।
অতি সুন্দর প্রকৃতিকে একান্ত আপন অনুভব করার মোহে ঘুরে বেড়াতে আমি ভালোবাসি। বহমান জীবনের সবচেয়ে কল্পনাপ্রবণ এবং উদ্দাম সময়ের পারিপার্শ্বিকের বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের লোভের কমতি পড়েনি আজো। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতেও টের পাই বাইরের বিশাল বিশ্ব প্রকৃতির প্রতি আমার আকর্ষণ ও আসক্তি গভীর। সমুদ্রের তীরে, স্বচ্ছ পানির ধারে ঘুরে বেড়াতে কার না ভালো লাগে? আর সই সমুদ্র সৈকত যদি হয় বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু দ্বীপে অবস্থিত, তবে তা উপভোগ করার ইচ্ছা জাগাটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া সরকার ও রাজনীতির শিক্ষার্থী হিসেবে আর্ন্তজাতিক রাজনীতির পাঠে থাইল্যান্ডের অপরাজেয় ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ যেমন ছিল তেমনি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোসহ থাইল্যান্ডের আশ্চর্যজনক বিস্ময়গুলো সারা বিশ্বের পর্যটকদের মতোন আমারও অন্যতম আকর্ষণের কারণ হয়ে উঠেছিল। জেনেছিলাম নির্মল সৌন্দর্য এবং বিস্তৃত ক্রিয়াকলাপের পাশাপাশি, থাই রান্না বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। যদিও আমি কোন কালেই খাবার প্রেমিক, খাদ্য রসিক নই। তাই রসনা বিলাসী কথকতা মূলতবিই থাকুক আপাতত।
আমাদের দু’জনেরই করোনাক্রান্ত অসুস্থতা, বিশেষত শান্তার ডেঙ্গুজনিত শারীরিক নানাবিধ জটিলতার সুচিকিৎসার্থে থাইল্যাণ্ডে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হয় ২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে। শুরুতে বেশ কয়েকটা দিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গোছাতে অপচয় হলেও এক সময় ব্যাংকক হাসপাতালের চিকিৎসকদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে যাই। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের দু’জনের জন্যই আবশ্যক ভ্রমণ ছুটি ও বহিঃবাংলাদেশ চিকিৎসার অনুমোদন, জিও’র জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুততর সময়ে তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেই। সরকারি জিও পাবার চরম অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ জটিলতার অবসান শেষে দ্বিগুণ দামে বিমানের টিকেট কিনতে ও হোটেল ভাড়া গুণতে বাধ্য হই। জরুরি চিকিৎসাসেবার সরকারি অনুমোদনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কাহিনী আর নাই-বা বলি! তবে খুশি হয়েছি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দুই দেশের সমঝোতা চুক্তির সুবিধায় আগে থেকেই ভিসা গ্রহণের প্রয়োজন না থাকায় অনেক ঝামেলা কমে যাওয়ায় অবশেষে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে উড়ালের সুযোগ হয়। ঢাকা বিমানবন্দরে ঢুকেই পেয়ে যাই সেখানে দায়িত্ব পালনরত আমার এক প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে। তার আন্তরিক সহযোগিতায় সহজেই আমাদের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ইমিগ্রেশন পার হয়ে প্রথমেই দু’জনের মোবাইলে ডাটা রোমিং করে নেই ফোন কোম্পানির বিমানবন্দর অফিসে গিয়ে। ফলে থাইল্যান্ড গিয়ে আর সেখানকার মোবাইল সিম কেনার ঝামেলায় পড়তে হয়নি। কাজ শেষে বিভিন্ন ব্যাংকের সৌজন্যে প্রতিষ্ঠিত বলাকা লাউঞ্জে গিয়ে কফি, নাস্তার সুবিধা গ্রহণ করি। আগে কখনো এই সুযোগ গ্রহণ করা হয়ে ওঠেনি আমাদের। সেখানে এবার সময়টা ভালোই কাটলো।
অবশেষে যথাসময়েই থাই এয়ারওয়েজের সুপরিসর বিমানটি আকাশে উড়াল দেয়। জানালার পাশের সিটটি সহযাত্রী ম্যাডামের বদান্যতায় পেয়ে যাওয়ায় প্রায় দু’ঘণ্টার পুরো যাত্রাকাল মেঘ, পাহাড়, সাগর প্রকৃতিকে উপভোগের সুযোগ পাই, মুগ্ধ হয়ে দেখেছি পাখির চোখে। এক সময় থাই খাবার দিলো, বিমানের খাবার ততটা ভালো না লাগলেও কফির টেস্ট দারুণ ছিল। এক সময় অবতরণ করে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে। সেখানকার ইমিগ্রেশনে যেতে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়, অভ্যন্তরীণ মেট্রোরেলেও চড়তে হয়। ইমিগ্রেশনে গিয়ে সেখানকার ভিড় দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ! তবে বাঁচোয়া যে আগে থেকেই অনলাইনে (টিডিএসি- থাইল্যান্ড ডিজিটাল অ্যারাইভাল কার্ড) আগমনের সকল তথ্য পূরণ করায় এবং অফিসিয়ালদের জন্য আলাদা বুথ থাকায়। ফলে ব্যাংকক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের ভয়াবহ ভিড়ের যন্ত্রণা এড়িয়ে কোনো কথা না বলে এক মিনিটেই এক মাসের জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থানের অনুমতি মেলে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাগেজ সংগ্রহ করে বেরুতেই দেখি ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। বাইরে বেরিয়ে আগে থেকেই বলে রাখা ট্যুর কোম্পানির অপেক্ষমাণ গাড়ি খুঁজি, পেয়েও যাই আমাদের নাম লেখা কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে। তিনি চালককে আমাদের গন্তব্যস্থল সুকুম্ভিত এলাকার ন্যানা বিটিএস স্টেশনের কাছের হোটেল রয়েল বেঞ্জার কার্ড দেখিয়ে বুঝিয়ে দেন। পরিচয়ের শুরুতেই চালক ইংরেজি জানেন না বলে জানালেন। মোবাইলের অনুবাদ অ্যাপসের সহায়তার তার সাথে সামান্য তথ্যবিনিময় হলো। জীবনে এই প্রথম তথ্য প্রযুক্তির অনুবাদ অ্যাপসের উপযোগিতায় মুগ্ধ হলাম। রাতের অন্ধকারের শহর আর বিলবোর্ডগুলো দেখতে দেখতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শহরের প্রাণকেন্দ্রের হোটেলে চলে এলাম।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক- একদিকে বিশাল আর আধুনিক, অন্যদিকে ঐতিহ্যে ভরপুর। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের এই শহরে মেলে ছড়িয়ে গিয়ে জড়িয়ে থাকা বিশ্বকে। রঙিন রাজধানীতে নিষিদ্ধ আনন্দ উপভোগের অপার সুযোগসহ রয়েছে জীবনকে শিহরিত করার নানা আয়োজন। সেই সাথে মেলে চাও ফ্রায়া নদীর ধারে শান্তির ছোঁয়া, অনন্য সাফারি, বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরের মহিমা আর রাতের রঙিন জগৎ ও রাস্তায় বাহারি খাবারের স্বাদ। এই শহরের বড় দু’টি আকর্ষণ হলো চাই ওয়াট অরুন ও ওয়াট ফ্রা কেও নামের দু’টি বিখ্যাত মন্দির। পর্যটনের পিক টাইমে ডিসেম্বরে গিয়েছিলাম বলেই মুগ্ধ করা বড়দিনের নানা আয়োজন সর্বত্র দৃশ্যমান ছিল। ফলে ভিড় ও সমারোহ দুটোই ছিল লক্ষ্যণীয়। ভ্রমণ ব্যয়ও ছিল তুলনামূলক বেশি। ভালো লেগেছে হাঁটার জন্য উপযোগী রাস্তাগুলো। ভিড় থাকলেও অকারণ শব্দ নেই কোথাও। চলতিপথে সবাই সতর্ক। রাস্তায় বাইক দিয়ে তৈরি টুকটুক বা ভ্যানগাড়িগুলো দেখতে দারুণ লেগেছে। কিন্তু আমরা চড়ে আরাম পাইনি। রিকশার সুখ কী আর টুকটুকে মেলে! আবেগি বাঙালি বলে কথা! বিস্ময়কর ব্যাপার অধিকাংশ থাইদের ইংরেজি না জানা এবং জানলেও অবোধ্য উচ্চারণ। ইংরেজি না জানা ড্রাইভারের অসচেতনতায় একবার তো ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শান্তার জীবনপ্রদীপ প্রায় যায় যায় হয়ে উঠেছিল। স্টপ শব্দের মানেও যে চালক জানে না, এটা জেনে আরো বেশি আতঙ্কে ভুগেছি।
ব্যাংককের প্রাণকেন্দ্র ন্যানা এলাকায় হোটেলটির ২০ তলার রুমে প্রবেশ করেও প্রবল প্রাণচাঞ্চল্য তীব্রভাবেই টের পাই। ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়ি খাবারের খোঁজে। বাঙালি রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করে বিস্মিত হই মালিকের বাড়ি আমাদেরই পাবনায় জেনে। এমন বিস্মিত হয়েছি বারবার হাসপাতালে ও বিভিন্ন স্থানে বাঙালি স্বজনদের আকস্মিকভাবে আবিষ্কার করে। টানা কয়েকদিন হাসপাতালে ছোটাছুটির পর কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পেতে দিন দশেক সময় লাগবে বলে জানালেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ। আমরা চিকিৎসার জন্য সবসময়ই হাতে বেশি সময় নিয়ে যাই বলে চিকিৎসার মাঝে অলস সময় পেলে বসে না থেকে ভ্রমণের কাজে লাগাতে কখনো কার্পণ্য করি না। এবারও দু’জনে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মন দিলাম। আমাদের প্রায় সবসময়ের ভ্রমণ পরামর্শক, ট্যুর কোম্পানির স্বজনের সহযোগিতায় পরবর্তী চিকিৎসার সময় হাতে রেখে তাদের ব্যবস্থাপনায় বেরিয়ে পড়ি। ফুকেট, ফিফি অ্যাইল্যান্ড হয়ে চলে যাই আমাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণের ভ্রমণকেন্দ্র ক্রাবিতে। পাহাড়ি দ্বীপের নগরী ক্রাবিতে তিনদিনের ভ্রমণ আমাদের জীবনের সেরা আনন্দভ্রমণ হয়ে ওঠে।
ব্যাংককের পরেই থাইল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় শহর ক্রাবি। দক্ষিণ থাইল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের ক্রাবি প্রদেশের রাজধানীর নাম ক্রাবি। সাধারণত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত হলেও এই জায়গার শহুরে আকর্ষণ অন্যরকম। প্রকৃত থাই সংস্কৃতির দেখা মেলে যেখানে। আন্দামান উপকূলের কাছাকাছি এই রিসোর্ট শহরটি ব্যাংকক থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। আন্দামান সাগরে অবস্থিত, ক্রাবি তার অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এর স্ফটিক-স্বচ্ছ জল, সুমিষ্ট জঙ্গল, উঁচু চুনাপাথরের পাহাড় এবং আদিম সৈকতসহ ক্রাবি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এই শহরে আছে টাইগার মন্দির এবং বিখ্যাত রেইলে সমুদ্রসৈকত। চুনাপাথরের কার্স্ট এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে অবস্থিত এই শহর থেকে ক্রাবি নদী ফাং নাগা উপসাগরের সঙ্গে মিশেছে। প্রদেশটিতে হাট নপফরাত থারা-মু কো ফি ফি ন্যাশনাল পার্ক এবং থান বোক খোরানি ন্যাশনাল পার্কসহ বেশ কয়েকটি জাতীয় উদ্যান রয়েছে, যা রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। ক্রাবির নৈসর্গিক সৌন্দর্য এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। প্রদেশটি পান্না পুল, উষ্ণ প্রস্রবণ, লুকানো গুহা, জলপ্রপাত এবং কার্স্ট পর্বত সহ প্রচুর প্রাকৃতিক বিস্ময়ের আধার। প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চার অন্বেষণকারী, বা কেবল সমুদ্রসৈকতে বিশ্রাম নিতে প্রত্যাশী সকলকেই ক্রাবি সাদর আমন্ত্রণ জানায়, মোহ-মায়ায় পিছু ডাকে।
থাইল্যান্ডের প্রতিটি দ্বীপই যেন সৌন্দর্যের আধার। যে পাহাড়ের পাশাপাশি সাগরও আমাদের সমান টানে। সেই টানের প্রমাণ মেলে ভ্রমণকালে, যেখানে আমরা প্রত্যাশিত আনন্দ উপভোগ করি। অপরূপ রূপের বৈচিত্র্য নিয়ে ক্রাবি প্রকৃতির বিস্ময় জাগায়। সাগর ও পাহাড়ের সহবাসে নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে অনন্য করে তোলে। সেই মনোরম দৃশ্য দেখে দেখে দূর অজানায় হারিয়ে যায় মন। মানসিক প্রশান্তির নীল দিগন্ত সব বেদনাকে ভুলিয়ে দেয়। প্রকৃতি এভাবেই আমাদের চিকিৎসিত করে। ছবির মতো সুন্দর ছোট ছোট দ্বীপগুলো সকল ক্লান্তি, অবসাদ দূর করে। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত প্রকৃতির দুই রঙিন মুহূর্ত, যা আমাদের মনকে শান্তি ও প্রশান্তি দেয়। প্রকৃতির এই রঙিন ক্যানভাস নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করতে এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে সহায়তা করে। ক্রাবিতে সূর্যাস্তের দৃশ্য তেমনই এক কথায় অতুলনীয়। সূর্য যখন ধীরে ধীরে সমুদ্রের তীরে মিশে যায়, তখন সোনালি আকাশের সঙ্গে সমুদ্রের ঢেউগুলোর খেলা এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করে।
ক্রাবিতে ফোর আইল্যান্ডের নীল জলরাশির মাঝে অবিশ্বাস্য উপভোগ্য আনন্দময় দিন কাটানোর স্মৃতি আমৃত্যু স্মরণে থাকবে। যদিও প্রবল ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক অসুস্থতার সীমাবদ্ধার কারণে নানা ধরনের জলক্রিয়ায় অংশ নিতে পারিনি তবে বালুকাময় তীর ধরে পা ভিজিয়ে হেঁটে হেঁটে দারুণ সময় কাটাতে কার্পণ্য করিনি। সারা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত ভ্রামণিকদের আনন্দময় উপভোগ দেখেও জীবনকে নিজের মতোন করে যাপন করার প্রেরণা পেয়েছি। দ্বিধা-সংকোচহীনভাবে তাদের এই সমুদ্র স্নান, রোদে পোড়ার বৈচিত্র্যময় চেষ্টা আসলেই এক জীবনে হয় না জানা, আরেক জীবন চাওয়ার প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয়। সেখানকার মোহন মায়ার নাইট লাইফ ছাড়াও প্রকৃতিকে উপভোগ করার উৎকৃষ্ট জায়গাগুলোর আকর্ষণ তীব্রভাবে অনুভব করা যায়। আর থাই ম্যাসাজের কথা আর কী বলবো! আমরাও ম্যাসাজের উপকারিতা উপভোগ করেছি, প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেছি। সাথে নিয়ে এসেছি ম্যাসাজ উপকরণ।
ফুকেট ভ্রমণের বৈচিত্র্যের শিহরণ রেশ নিয়ে নির্ধারিত দিন সকালে ফুকেটের হোটেল থেকে ট্যুর কোম্পানির গাড়িতে রওনা হই সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ভ্রমণ গন্তব্যে। আমরা ক্রাবিতে গিয়েছিলাম ফুকেট রাসাদা হারবার ফেরি ঘাট থেকে থেকে জাহাজে। যেতে প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগে। সড়ক পথেও ফুকেট কিংবা ব্যাংকক থেকেও এখানে আসা যায়। তবে জাহাজে ভ্রমণই সবচেয়ে আনন্দময়, উপভোগ্য হয়ে হয়ে ওঠে। ডেকে দাঁড়িয়ে পাহাড়-সাগরের সহবাসের নৈসর্গিক অপররূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে, ছবি তুলে আঙ্গুল ব্যথা করে ক্রাবি জেটিঘাটে পৌঁছালাম।
ক্রাবিতে আমরা উঠেছিলাম আও নাং কালারস হোটেলে। আও নাং বিচ থেকে মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটা দূরত্বে। প্রবেশকালেই অনেকটা রিসোর্টের মতো ভীষণ সুন্দর হোটেলের প্রেমে পড়ে যাই। ডিলাক্স কক্ষের ছোট বারান্দাটাও ছিল দারুণ। হোটেলের ছাদের সুইমিংপুলটাও বেশ পছন্দ হয়। পরে সুযোগ বুঝে সুইমিংপুলের জলেও স্নাতক হওয়ার সুযোগ হারাইনি। ছাদের পুল থেকে দূরের সাগরের নীল চোখ-প্রাণকে উজ্জীবিত করে। হোটেলে চেক-ইনের পর আওনাং বিচে চলে যাই, সন্ধ্যার সূর্যাস্তলগ্ন উপভোগ করতে করতে দু’জনা হাত ধরে হাঁটলামও অনেকক্ষণ। এরপর শুরু হলো রাতে অভিসার। রাতের আও নাং বিচ অন্যরকম সুন্দর। সৈকতের পাশে নাইট মার্কেট ও বিভিন্ন ধরনের মোহন মায়ার চিত্তাকর্ষক ইভেন্টে অংশ নিতে মায়াবীনিরা চারপাশ থেকে ডাকছে। সেখানকার মায়াবী রাতে মোহমুক্ত থাকতে পারাটা নিজের ইচ্ছা ও পকেটের সামর্থ্যরে উপর নির্ভর করে। চাইলে উদাসী মনে তীরে বসেও সময় কাটাতে পারেন, অনুভব করবেন যেখানে সমুদ্রের স্বাদ পাবেন অসীম আকাশের সাথে সাগর জলের স্নাতক হওয়াকে, দেখতে দেখতে ঘুম এলেও ক্লান্তি আসবে না চোখে, যতদূর চোখ যায় তাকাবেন আর মায়ার মোহন মাধুরীতে আটকা পড়বেন। ঘুরে বেড়িয়ে কেটে যায় আমাদের ক্রাবির প্রথম রাত।
পর্যটকদের জন্য ক্রাবির সেরা আকর্ষণগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে আও নাং বিচের নাম। ক্রাবির সেরা আকর্ষণ, জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত হল আও নাং বিচ, যেখানে সমুদ্র স্নান শেষে বালিতে আরাম করা যায় এবং সাগরের নীলজলে মিতালীতে আকাশের রঙ পরিবর্তনের বৈচিত্র্য দেখা যায়। এই সৈকত রেস্তরাঁ, বার এবং রোমাঞ্চকর জল ক্রীড়া কার্যক্রমসহ বিস্তৃত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। এটি কাছাকাছি দ্বীপগুলো অন্বেষণ বা ভ্রমণ করার জন্য একটি দুর্দান্ত কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ ফোর আইল্যান্ডসহ রেইলে সমুদ্রসৈকত। ক্রাবি থেকে এই সৈকতে নৌকায় চড়ে কিংবা স্পিডবোটে যাওয়া যায়। তাছাড়া গুহা অভিযান, চুনাপাথরের পাহাড়ে চড়ার পাশাপাশি ১ হাজার ২৬০ ধাপের সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেখা যায় ওয়াট থাম সুয়া মন্দিরের সৌন্দর্য। ক্রাবির সেরা আকর্ষণগুলোর সবক’টি ঘুরে দেখার পর্যাপ্ত সময় পাইনি বলে আফসোস থেকেই গেল।
ক্রাবির দ্বিতীয়দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে হালকা নাস্তা সেরেই রওনা হলাম স্পিডবোট ঘাটের উদ্দেশ্যে। যথাসময়ে গাড়ি এলো তুলে নিতে। ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৯টার ঘরে। হাজির হলাম নো ফারাত ধারা বিচে গ্রুপ ট্যুরের দলে। ট্যুর প্যাকেজ এজেন্সির দলনেতা মেয়েটির নাম সানা। হাস্যরসের মধ্য দিয়ে সকলকে সজীব করে রেখেছিল সারাটি দিন সে ও তার দল। নিজেদের নিরাপত্তা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে সচেতন থাকার প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ব্রিফ শেষে তার সাথে গিয়ে উঠলাম স্পিডবোটে। এর আগে গ্রুপের পরিচিতি সূচক ব্যান্ড লাগিয়ে দিলো আমাদের প্রত্যেকের হাতে। ফোর অ্যাইল্যান্ডের পথে দিনব্যাপী ভ্রমণ যাত্রা শুরু হলো। বোটে ভারতীয়দের সংখ্যাই বেশি ছিল, বাঙালিও ছিলেন কয়েকজন।
ফোর আইল্যান্ড বলা হলেও যেতে যেতে চোখে পড়ার মতো অনেক দ্বীপ দেখেছি। রেইলে দ্বীপ, ফ্রা নাং বিচ, টাফ আইল্যান্ড এবং সবশেষে পোডা আইল্যান্ড। ক্যালেন্ডারে স্থান পাওয়া ছবির মতো নীল জলের সাগরের মাঝে দেখলাম পাহাড় আর পাহাড়। এর মধ্যে মুরগির গলার মতো প্রকৃতির বিস্ময় চিকেন আইল্যান্ড দূর থেকে দেখে মজাই লাগে। যদিও সেখানকার বিচে নামার সুযোগ ঘটে না।
ক্রাবির রাই লেহ বা রেইলে দ্বীপটি উঁচু চুনাপাথরের ক্লিফ দ্বারা পরিবেষ্টিত, এটি রক ক্লাইম্বারদের জন্য একটি আগ্রহের প্রিয় জায়গা করে তুলেছে। উঁচু চুনাপাথরের পাহাড় মূল ভূখণ্ডের প্রবেশপথকে বন্ধ করে দিয়েছে। তাই ক্রাবির সবচেয়ে জনপ্রিয় সৈকত রেইলে বিচে, এই নির্জন সৈকতে শুধুমাত্র নৌকার মাধ্যমে যাওয়া যায়। এখানে একটি শান্তিপূর্ণ এবং শান্ত পরিবেশ পাওয়া যায়। সমগ্র রেইলে চারটি প্রধান এলাকায় বিভক্ত। ফ্রা নাং, পশ্চিম রেইলে, পূর্ব রেইলে এবং টন সাই। পূর্ব দিকের বাংলো এবং রিসোর্ট থেকে শুরু করে পশ্চিম কোণের বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো এখানকার পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এগুলোর মধ্যে কোনও কোনওটি সাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং যেখানে সৈকত ঘেষে রয়েছে শান্ত রেস্তরাঁ। টন সাই বিশ্ব জোড়া পর্বতারোহীদের প্রিয় গন্তব্য। তবে এটি আধুনিক পূর্ব ও পশ্চিম রাইলের তুলনায় বেশি কাঁচা।
ফোর অ্যাইল্যান্ডের শেষ গন্তব্য ছিল ক্রাবির পোডা আইল্যান্ড। দুপুরের বুফে খাবারের আয়োজন ছিল এখানেই। আও নাং থেকে ৮ কিমি দূরের পোডা আইল্যান্ডে সবচেয়ে ভিড় দেখা গেল। সাদা বালির দ্বীপটি মালদ্বীপের প্রাইভেট অ্যাইল্যান্ডের স্মৃতি জাগিয়ে দেয়। গভীর সমুদ্রে গাঢ় নীল জলে গা ভাসিয়ে দিতে, স্নোরকোলিং করতে দারুণ লাগলো। বিকিনি বিচের সমুদ্র স্নানে কিংবা রৌদ্রতাপে গা পুড়িয়ে নেওয়ায় মগ্ন মানুষদের দেখে নিজেরও আগ্রহ না বাড়ার কোনো কারণ ছিল না।
টাইগার কেভ টেম্পলের কথা না বললেই নয়। ক্রাবির সবচেয়ে বিখ্যাত এই দর্শনীয় স্থানটির স্থানীয় নাম ওয়াট থাম সিউয়া। যা টাইগার কেভ টেম্পল (ঞরমবৎ ঈধাব ঞবসঢ়ষব) নামেও সুপরিচিত। এটি শহরের অদূরে অবস্থিত। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরটি শীর্ষে যাওয়ার জন্য ১ হাজার ২৬০টি সিঁড়ির পথ পেরুতে হয়। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের এই যাত্রার পর মন্দিরটির সামনে দেখা মেলে প্রধান আকর্ষণ সোনালি বুদ্ধ মূর্তির। শুধু তাই নয়, পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যাবে একপাশে ছোট ছোট শহুরে জীবন, আর অন্যপাশে ফেনীল সমুদ্র। মন্দির ছাড়িয়ে ছোট লুপের ট্রেইল অনুসরণ করে গেলে চোখে পড়বে বন উপত্যকা আর বুদ্ধের বেদিতে লুকিয়ে থাকা চুনাপাথরের গুহাগুলো। উপাসনার জন্য নির্ধারিত এই এলাকাটি ঘুরে বেড়ানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য যেন অক্ষণ্ন্ন থাকে।
ক্রাবিতে দর্শনীয় সূর্যাস্তের দৃশ্যের স্মৃতি মনের জন্য আনন্দদায়ক। যেখানে আন্দামান সাগরের উপরে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আকাশ কমলা, গোলাপী এবং বেগুনি রঙের হয়ে যায়। এই মোহনীয় সূর্যাস্তের দৃশ্যের জন্য ক্রাবি স্মরণীয়। ক্রাবিতে বেশ কিছু জায়গা আছে যেখানে এই বৈভবময় রোমাঞ্চকর দৃশ্যের সাক্ষী হতে পারা যায়। ক্রাবিতে সূর্যাস্ত দেখার সেরা জায়গাগুলোর মধ্যে একটি হলো ফ্রা নাং গুহা সৈকত থেকে। এখান থেকে চুনাপাথরের পাহাড় এবং অস্তগামী সূর্যের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
ক্রাবিতে রোমাঞ্চকর এডভেঞ্চার স্পোর্টসের অভিজ্ঞতা গ্রহণের নানা ব্যবস্থা আছে। রক ক্লাইম্বিং থেকে কায়াকিং থেকে জিপ-লাইনিং পর্যন্ত, এডভেঞ্চারে আগ্রহী প্রত্যেকের জন্যই কিছু না কিছু ব্যবস্থা আছে। রক ক্লাইম্বিং ক্রাবির অন্যতম জনপ্রিয় এডভেঞ্চার স্পোর্টস, এর সুউচ্চ চুনাপাথরের পাহাড়ের জন্য। ক্লাইম্বিং স্পটগুলো উপভোগ করতে গাইড ভাড়া করতে পারেন বা ক্লাইম্বিং ট্যুরে যোগ দিতে পারেন। ক্রাবির আরেকটি জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্ট হল কায়াকিং। যে কেউ একটি কায়াক ভাড়া নিয়ে এবং লুকানো গুহা, উপহ্রদ এবং ম্যানগ্রোভ বন ঘুরে দেখতে পারেন যা দ্বীপাঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এটি প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার এবং ক্রাবির সুপ্ত সৌন্দর্যের আবিষ্কার করার একটি দুর্দান্ত উপায়। ক্রাবিতে এডভেঞ্চার স্পোর্টসে অংশগ্রহণ করার সময় নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হতে দেখে ভালো লেগেছে। নদী ও নৌকার দেশের মানুষ আমি কায়াকিং করেও শৈশবের আনন্দ উপভোগ করেছি।
ক্রাবির দ্বীপদেশের মনমুগ্ধতার নেপথ্যে রয়েছে রোদের আলোয় চিকচিক করা বালি আর আলোক ছটা দেওয়া ঢেউ। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বালুকাবেলায় ঝিনুকের আঁকিবুকিগুলো যেন সাবধানে পা ফেলতে বলে সৈকতপ্রেমিককে। এরপরেও উপেক্ষা করা যায় না খালি পায়ে হাঁটা বা সূর্যস্নানের হাতছানি। সমুদ্রের বিশাল বিস্তৃতির উপর দিয়ে ছুঁয়ে দিগন্ত রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তোলে। জ্বলজ্বলে ক্রাবির নাইট লাইফ উল্লাসে কাঁপিয়ে তোলে জীবনরসিকের মনকে। মনোরম শহরের ডিসেম্বরে বিচের ফায়ার শো আলাদা আনন্দ দেয়। থাইল্যান্ডের ক্রাবিকে সৈকতের পাশাপাশি ধর্মীয় স্থাপনাগুলো এক স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রদেশে পরিণত করেছে। মন্দিরগুলোর গাম্ভীর্য এবং স্থানীয়দের বিচিত্র বেশভূষা অন্য সব দ্বীপাঞ্চল থেকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দেয়। তাছাড়া দর্শনীয় জায়গাগুলোর অনন্য নামগুলো সরবে ঘোষণা করে থাইল্যান্ডের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা। এই অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারলে চিরাচরিত সৈকত দর্শন থেকে ভিন্ন অভিব্যক্তির অবতারণা ঘটাতে পারে ক্রাবি ভ্রমণ। ফলশ্রুতিতে ফিরে আসার সময় আরও সময় কাটানোর সাধ জাগবে এই অনুপম উপকূলে।
ক্রাবির স্থানীয় সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা নিতে প্রদেশের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত রাতের বাজারগুলো দেখতে পারেন। এই বাজারগুলো রাস্তার খাবার, হস্তশিল্প এবং লাইভ পারফরম্যান্সের জন্য বিখ্যাত। স্থানীয় বৌদ্ধ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার জন্য ক্রাবির মন্দিরগুলোও দেখতে পারেন, যেমন ওয়াট থাম সিউয়া (টাইগার কেভ টেম্পল)। ক্রাবির নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং আকর্ষণগুলো ট্রাকৃতিক বিস্ময় এবং দুঃসাহসিকতার সন্ধানকারী ভ্রমণকারীদের জন্য এটিকে অবশ্যই একটি দর্শনীয় গন্তব্য করে তোলে। পান্না পুল এবং উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে সুমিষ্ট জঙ্গল এবং কার্স্ট পর্বত, ক্রাবি ভ্রমণকারীদের প্রত্যেকের জন্য কিছু না কিছু আছে। আদিম সৈকতে আরাম করতে, লুকানো গুহা এবং জলপ্রপাত অন্বেষণ করতে বা স্থানীয় রন্ধনপ্রণালী এবং সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ হতে চাইলে, ক্রাবিতে তার প্রায় সবই রয়েছে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে কুমিরের ভূমিকা দেখা মেলে ক্রাবিতে। বিশ্বজুড়ে আছে কুমিরের মাংসের চাহিদা। থাইল্যান্ডের রেস্তরাঁ আর পর্যটক গন্তব্যগুলোতেও বেশ ভালো চাহিদা আছে এই কুমিরের মাংসের। বিশেষ চাহিদা আছে কুমিরের পিত্ত আর রক্তেরও। সেইসাথে কুমিরের চামড়াই শুধু নয়, চামড়াজাত পণ্যেরও বিশাল বাজার আছে থাইল্যান্ডে। পুরো থাইল্যান্ড জুড়ে কুমিরের খামারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আলাদা একটি পর্যটন শিল্পও। প্রাকৃতিক পরিবেশে কুমিরদের জীবনযাত্রা খুব কাছ দেখতেই অনেকেই পাড়ি জমান এই কুমির খামারগুলোতে। পাশাপাশি এসব পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দেখার সুযোগ মিলবে কীভাবে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা কুমিরের মুখের ভেতরে মাথা ঢুকিয়েও অক্ষত অবস্থায় তা আবার ফেরত নিয়ে আসছেন! সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতাই বটে!
ক্রাবিতে সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বসবাস। একটু খুঁজলেই হালাল খাবার পাওয়া যায়। এক রাতে বাঙালি খাবার হোটেল খুঁজে বের করি। আমাদের খোঁজ পেয়ে বাঙালি মালিক ভাইটি চলে আসেন, সঙ্গ দেন। অনেক অজানাকে জানা হয় তার সাথে আলাপনে। জীবন ও জীবিকার টানে প্রায় দুই যুগ আগে আসেন এদেশে। কঠোর পরিশ্রমের ফলে ক্রাবি ও পাতাইয়াতে দু’টি হোটেলের মালিক হয়েছেন। বেড়াতে আসা তার ছেলের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেন। প্রবাসে বাঙালি মাত্রেই সজ্জন সত্যবচনে তিনিও আমাদের বিশেষভাবে আপ্যায়িত করেন। তিনি জানান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা মুসলিম হওয়ায় এটি মুসলিম পর্যটনের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে একটি প্রধান গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। আকর্ষণীয় পর্যটনস্থলের পাশাপাশি ভোজনরসিকদের নানাপদের বিচিত্র সব খাবারসহ বিভিন্ন হালাল থাই রেস্তরাঁর খাবার খেয়ে দেখার জন্য এটি একটি উত্তম জায়গা। জানালেন থাইল্যান্ডের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর ক্রাবি। তিনি বললেন, অবশ্যই থাই ফ্রেশ ফ্রুটস, ডাব ও ফ্রুটস জুস খেতে ভুলবেন না। তার কথার সত্যতা আমরা সর্বত্রই পেয়েছি।
ভ্রমণকালে ভারতীয় হোটেলে, কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডসের ভরসায় আমাদের পেটপূজা চলে। খাবার হোটেলের পাশাপাশি নানা ধরনের ফল, জুস, মিল্কশেক দোকান আমাদের পরম ভরসা জুগিয়েছে। ডাবের দেশে প্রিয় পানীয় ডাবের দাম ৮০-১০০ বাথ (প্রতি বাথ বাংলাদেশি ৪ টাকার সমান) শুনে পানের আগ্রহ কমে যায়। বিশাল সাইজের কুমিরের কাবাব, শূকরের মাংস, লবস্টার, ঝিনুকের মাংসসহ নানা চেনা-অজানা মাছ-মাংসের বিচিত্র পদের বাহারি রান্না বিক্রি হতে দেখে জিবেহ জল আসে, ভয়ও হয়। সেক্ষেত্রে সুপার শপ সেভেন ইলেভেনের দোকানগুলো যে কোনো প্রয়োজনে সহযোগী ভূমিকা রাখে। থাইল্যাণ্ডের সর্বত্র- ব্যাংকক, ফুকেট, ফিফি আইল্যান্ড, ক্রাবি, পাতাইয়াতে দেখেছি বোতলজাত পানির চেয়ে অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়র দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সিগারেটের দাম অনেক বেশি এবং যেখানে সেখানে ধূমপান করা যায় না, দণ্ডনীয় অপরাধ। রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য বার, সীসা, গাঁজা, হাসিস, মারিজুয়ানার দোকান কিন্তু মাতাল হতে কাউকে দেখিনি। সর্বত্র স্পা, ম্যাসাজ পার্লারের আধিক্য থাকায় চলতি পথে প্রতিনিয়ত আবেগি আহ্বান শোনা যায় কিন্তু উত্তেজনার উগ্রতার প্রকাশ দেখতে পাইনি। যৌনকর্মীদের দেখাও মিলেছে কিন্তু তারাও ভ্রামণিকদেরকে অনিরাপদ আচরণে বিরক্ত করেননি। সভ্য-ভব্যতার একটা অলিখিত সীমারেখা দৃশ্যমান হয়েছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের স্ব-ক্ষমতার সংস্কৃতিবোধের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়েছি। শোভন আচরণের সংস্কৃতি সাধনার প্রয়োজনও তীব্রভাবে অনুভব করেছি। সেই সাথে রাত দুপুরেও থাইল্যান্ডের সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা বিস্মিত করেছে। পুলিশের দেখা খুব একটা না পেলেও মানুষের নিরাপত্তার কমতি দেখিনি। আসলে নিরাপত্তার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছে থাইল্যান্ড। ধর্মীয় আচার-আচরণের অস্বাভাবিক বাড়াবাড়িও দেখিনি। মুসলিম নারীদের যেমন হিজাব পরে কাজ করতে দেখেছি বিকিনি বিচে কিংবা দোকানে, তেমনি যেমন খুশি তেমন সাজো পোশাকের পূর্ণ স্বাধীনতার দৃশ্যও সেই সমাজের মূল্যবোধের প্রতি সম্মান বাড়িয়েছে। সভ্যতার সংস্কৃতি শিখতে থাইল্যান্ড ভ্রমণ ছিল সত্যিই শিক্ষণীয়। তাছাড়া আয়ুর্বেদী চিকিৎসার বিভিন্ন উপকরণের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার দেখে এর প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
জীবনের ভ্রমণপথকে বৈচিত্র্যময় রাখতে হলে ক্রাবিতে ঘুরতে আসার কথা মোটেই ভোলা যাবে না। চিরকাল মনে থাকার মতো কিছু মুহূর্তের খোঁজে অফ-শোর দ্বীপের এই রাজ্যে সবার এক বার হলেও যাওয়া উচিত। অনন্য নান্দনিকতায় ভরপুর ক্রাবি ভ্রমণের স্মৃতি আসলেই অমলিন থাকবে। ডিসেম্বরের শেষে ভ্রমণকালে শীতের দেখা মেলেনি অথচ থাইল্যান্ডের ক্রাবিতে পর্যটনের সেরা মৌসুম হলো নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে। এই সময়ে গড় তাপমাত্রা থাকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ঠাণ্ডা বাতাসে আবহাওয়া বেশ আরামপ্রদ থাকে। অন্যদিকে জুন থেকে অক্টোবর ক্রাবিতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। তাই ঝামেলাহীন ভ্রমণের জন্য এ সময়টা এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম।
দৃষ্টিনন্দন সমুদ্রতট, পাহাড়ি উপত্যকা থেকে রঙিন সব গ্রাম বা প্রাচীন নগরীÑ নানা কারণে একটি দেশ ছবির মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। নিজের চোখে সেই সৌন্দর্য দেখতে ভ্রমণপিপাসু মানুষ সেসব দেশে ভ্রমণে যান। নিজের চোখে না দেখলে, নিজের পায়ে ঘুরে না বেড়ালে কারও পক্ষে কোন দেশ কত সুন্দর, তা নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। কোনো দেশে বেড়াতে গিয়ে চোখজুড়ানো কোনো দৃশ্য দেখে যদি পর্যটকদের মনে প্রশ্ন জাগে, যা দেখছি, তা কী সত্যি? তবেই না বেড়ানোর সার্থকতা। এসব ভ্রমণস্থল থেকে ফিরে যাওয়ার পরও পর্যটকদের মনে অনেক দিন সেদেশ ভ্রমণের রেশ থেকে যায়। তারা বারবার সেখানে ফিরে যেত চান। যে কারণে থাইল্যান্ড ছুটি কাটানোর জন্য সবচেয়ে মনোরম জায়গা হিসেবে আলোচিত। ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের ফলে থাইল্যান্ডের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে পর্যটন খাত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে পর্যটনের ওপর ভিত্তি করে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত বাড়ছে। সেখানকার পর্যটন শিল্পের সাফল্যের অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারি। সেজন্য দরকার ইতিবাচক মানসিকতার পাশাপাশি সহায়ক সুব্যবস্থাপনা।
ক্রাবিতে পৌঁছানো সহজ, কিন্তু মনোরম সৌন্দর্যের কারণে সেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। সেখানকার পাহাড়ের পাশাপাশি সাগরও সমান টানে। সেই টানকে আরও বাড়তে না দিয়ে ক্রাবি পর্ব শেষ করে বড়দিনে আমাদের যাত্রা শুরু হয় ব্যাংকক হয়ে পাতাইয়া। নিয়ে চলি বৈভবময় আনন্দ স্মৃতি। মনোমুগ্ধকর ক্রাবির পর্যটন স্থানসমূহ ভ্রমণের সেই সুখটানের শিহরণ স্মৃতির জলে নিত্য ভিজি একান্ত অবসরে। এত স্বচ্ছ, পরিষ্কার নীলজলে বিশ্বনাগরিকদের সঙ্গে, অনিন্দ্য সুন্দরীদের সাথে সাঁতার কাটার আনন্দ অন্যরকম বৈচিত্র্যেরই বটে! জলপরিদের মাঝে নিজেকে খুঁজে পেতে কষ্টই হয়। হায়! এমন সুখ এত ক্ষণস্থায়ী কেন? এমন সব স্বর্গের নিসর্গে এলে ‘অর্থই সকল সুখের মূল’- এই ভুল ভাবনাকেই সত্যি মনে হয়!!! সেই ভাব-অনুভবে আজো প্লাবিত আমি।
ক্রাবিতে পৌঁছানো সহজ, কিন্তু মনোরম সৌন্দর্যের মায়ার টান কাটিয়ে সেখান থেকে ফেরা কঠিন।
সুন্দর অনুভব কিংবা সুখানুভব ক্ষণস্থায়ী হয় বলে মনে করি। তাই যাদের পেশাগত জীবনের কারণে ছুটি কম, হাতে সময় অল্প কিন্তু বিদেশ ভ্রমণের ইচ্ছা প্রবল এমন অবস্থার ভ্রামণিকদের জন্য হয়ে উঠতে পারে থাইল্যান্ড আদর্শ গন্তব্য। থাইল্যান্ডে যেমন নানান রঙিন আয়োজনে আকর্ষিত হয়েছি, বিমোহিত হয়েছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে, তেমনি দেখেছি শহুরে জীবনের বিপুল উত্তেজনাও। এ কারণেই বুঝি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য এখন থাইল্যান্ড। তাদের অন্যতম আকর্ষণ হলো নিজেদের সংস্কৃতি ও অতিথি আপ্যায়ন যা আপনাকে দেবে এক সুন্দর অভিজ্ঞতা। থাইল্যান্ডে ঘুরে দেখার মতো সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী এবং জাতীয় উদ্যান, প্রাণবন্ত ও ব্যস্ত শহর, সেরা কিছু স্ট্রিট ফুড, সেই সঙ্গে নৈসর্গিক দ্বীপেও আছে উপভোগ করার মতো বৈচিত্র্যময় রঙিন আয়োজন। থাইল্যান্ড হানিমুন স্পট হিসেবেও সুন্দর জায়গা। বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি, পূর্ণিমা উদ্যাপন, সুন্দর সৈকত বিলাস, ভাসমান বাজার ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে দেখার মতো। ক্রাবি, মায়া বে, ফিফি আইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি সুপরিচিত এবং রোমাঞ্চকর পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে যা থাইল্যান্ড ভ্রমণে গেলে অবশ্যই দেখা উচিত। পূর্ব পরিকল্পনায় কম বাজেটেও এখানে ভ্রমণ সম্ভব বলেই মনে হয়েছে। এজন্য চাই আন্তরিক উদ্যোগ এবং সঠিক অনুসন্ধান। আমাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় তেমনটাই মনে হয়েছে। আর সে কারণেই বুঝি ভ্রামণিকদের মোহন মায়ায় মুগ্ধ করা কল্পনার স্বর্গ ক্রাবি নিসর্গে ভ্রমণ হয়ে থাকে আমাদের জীবনের অনন্য অভিজ্ঞতা, মুগ্ধ করা আনন্দ অভিযাত্রার রোমাঞ্চ স্মৃতি। Í
