পেশীশক্তি বনাম নাগরিক চেতনা

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন

পেশীশক্তি বনাম নাগরিক চেতনা

ফন্ট সাইজ:

ভারত আজ এক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাত্রা করছে। একদিকে সংকট, অন্যদিকে রূপান্তর—এই দুইয়ের মাঝের দোলাচলেই যেন দোল খাচ্ছে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো। শেষ পর্যন্ত তা কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটাই এক বড় প্রশ্ন।
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে হিন্দুত্বের উত্থান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মেরুকরণ আর বহুত্ববাদী সমন্বয়ের সংস্কৃতিতে তীব্র টানাপোড়েন চলছে। এসবই যেন ভারতের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের বিপরীতে এক সংঘাতকে নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দিচ্ছে। তবে, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অন্ধকারের মধ্যেই প্রতিরোধের আলো, বহুত্ববাদী চর্চা ও নাগরিক সচেতনতার শক্তিটা কম উজ্জ্বল নয়। এই দ্বন্দ্বেরই সবচেয়ে তীব্র প্রতিফলন ঘটছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে। এখানকার ভোট যেন শুধু সরকার বদলের প্রতিযোগিতা নয়, বরং দু’টি দর্শনের মধ্যে সংঘর্ষের রণক্ষেত্র।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী আবহ এক স্পষ্ট প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—রাজনীতিতে ‘শক্তির প্রয়োগ’ বলতে আমরা কী বুঝি? এটি কি পেশীশক্তির জবরদস্তি, নাকি জনগণের ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া? রাজনৈতিক দলগুলো যখন একে অপরকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আর ‘গোষ্ঠীগত’ লেবেল দিয়ে আক্রমণ করে, তখন গণতন্ত্রের প্রকৃত ইস্যুগুলো যেন ধুলোয় মিলিয়ে যায়। হিন্দুত্ববাদী বিজেপির গেরুয়া রঙে রঞ্জিত আগ্রাসী স্লোগান এমন এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে সবাইকে নিয়ে এক সঙ্গে থাকার সুযোগ কমছে এবং মানবতা, মুক্ততা, বহুত্ব ও একতার পরিসর কমছে।
এই বিভাজিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য খুবই মারাত্মক, যা দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মেনে নিতে পারছে না। ঘৃণা, হিংসা ও বিভেদের আবহের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বহুত্ববাদী মানসিকতা। এখানকার সাধারণ মানুষ, যারা বহু বছর ধরে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে প্রতিহত করে এসেছেন, তারা আজও বুঝে নিচ্ছেন কে আসলে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, আর কে বিভাজনের আগুন জ্বালাচ্ছে।
খোলা চোখেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির এই লড়াইয়ের গভীরতা বোঝা যায়। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন শুধু দলীয় জয়-পরাজয়ের প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি একটি আদর্শের যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পক্ষ যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতিকে অস্ত্র করে সমাজকে খণ্ডিত করতে চায়, অপর পক্ষ সেখানে সংকীর্ণ পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে গণতান্ত্রিক নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে রাখতে চায়। কিন্তু সেখানেও জটিলতা আছে। এই দ্বিতীয় পক্ষটিও প্রায়শই নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ‘শক্তির প্রয়োগ’-এর অপপ্রয়োগে মেতে ওঠে। তখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি থেকে সরে এসে পেশীশক্তির মাধ্যমে বিরোধী কণ্ঠ চাপা দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এই অবস্থায় নির্বাচন হয়ে ওঠে এক সঙ্কটের নামান্তর—যেখানে ভোটারকে ভোট দিতে হয় ‘অধিকতর সেকুলার’ কে, আর যার হাতে শক্তি দিয়ে ক্ষমতা কতটা ‘সংযত’ থাকবে, সেই হিসেব মিলিয়ে।
তবে ইতিহাসের এপিঠ-ওপিঠ দেখলে একটা সত্যি ফুটে ওঠে—এই রাজনৈতিক মতাদর্শিক লড়াই শেষ পর্যন্ত কোনো একক পরিচয়ের জয়ে গিয়ে থামে না। যদিও ভিন্ন ভিন্ন বলয়ে, বিভিন্ন রাজপথে, সোশ্যাল মিডিয়ার আলাদা একাউন্টে, সাহিত্যে আর কলকাতার আড্ডায় এখনও জ্বলজ্বল করছে বহুত্ববাদ ও সংলাপের প্রদীপ। মানুষের মধ্যে এখনও সেসব জায়গা বেঁচে আছে যেখানে তারা ধর্ম, বর্ণ বা দলের গন্ডি পেরিয়ে ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু সেগুলো সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধ নয়। অনেকেই স্বার্থ ও ক্ষমতার জন্য কখনো ধর্মনিরপেক্ষ ও কখনো ধর্মপন্থী হচ্ছে। এই স্খলন বাংলা ও বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ঐক্যকে বার বার বিপদজনক বাঁকে নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একটি চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে—ভয় আর বিভাজনের রাজনীতি অল্প সময়ের জন্য আবহ তৈরি করতে পারবে, নাকি টেকসই ভিত্তি গড়ে ওঠে সংলাপ ও মানবিক মর্যাদার ভিতের উপর তাণ্ডব চালাবে? এখানকার ভোটার, যিনি একদিকে যেমন উপবাসী মানুষের চালের দাম দেখেন, অন্যদিকে তেমনই দেখেন কোন রাজনৈতিক শক্তি তাঁকে গণতান্ত্রিক নাগরিক হিসেবে কতখানি মর্যাদা দেয়। এই নাগরিক ক্ষমতায়নের বোধটাই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিরোধের মূল সুর এবং বাংলার অস্তিত্ব রক্ষার শেষ আশ্রয়।
শেষ পর্যন্ত, সংকট আর অস্থিরতার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ শুধু একটি নির্বাচনের ফলাফল নয়, বরং একটি বার্তাই দেবে। বার্তাটি হবে—পেশীশক্তি নয়, বিভেদ নয়, আত্মধ্বংসী কলহ নয়, ঐক্য, সমন্বয় ও ন্যায়ের শক্তিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। সাম্প্রদায়িকতা নয়, বহুত্ববাদই চিরায়ত বাংলার প্রকৃত পরিচয়। বাঙালির উদারতা ও সর্বধর্ম-সম্প্রদায়ের বহুত্ববাদী মিলনবার্তাই সবচেয়ে বড় শক্তি। যার ভিত্তিতে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের বাংলা ও বাঙালি মানবিক মর্যাদার টিকে থাকবে এবং আশাবাদের প্রদীপ হাতে শুভবোধের আলোক শিখায় আগামীর পথ দেখাবে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)

Golam Ali

২ মাস আগে

চমৎকার লেখা।

মন্তব্য করুন