গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়: আজকের ভোট, জাতির আশা

গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়: আজকের ভোট, জাতির আশা

ফন্ট সাইজ:

আজকের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে সমগ্র জাতি এক বিশেষ মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বিশ্বাস করি, অনিয়ম ও অন্যায়ের বিচার একদিন না একদিন হবেই। এই বিশ্বাস কেবল ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়, এটি মানুষের নৈতিক চেতনার গভীরে প্রোথিত এক অনড় সত্য। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা, অর্থ বা প্রভাব দিয়ে সত্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করা গেলেও অন্যায়ের পরিণতি এড়ানো যায় না। ব্যক্তি হোক বা রাষ্ট্র, কেউই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। যে শক্তি অন্যায়ের ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়, তার ভিত একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথচলাও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।
দেশের রাজনীতিতে জুলুম, নির্যাতন ও অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান সব সময় মানুষের আশা জাগায়। যখন কোনো নেতৃত্ব গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন সাধারণ মানুষ তাকে বিশ্বাস করে এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশায় পাশে দাঁড়ায়। সেই বিশ্বাসের জোরেই বহুবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। জনগণ আশা করেছিল, দীর্ঘ অস্থিরতার অবসান ঘটবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় যখন দেখা যায় সহনশীলতা কমছে, বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন মানুষের আস্থায় চিড় ধরে। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে ক্ষমতায় আসেন, তারাই যদি অন্যায়ের আশ্রয় নেন, তবে জনগণ হতাশ হয়। ইতিহাস তখন নির্মোহভাবে তাদের মূল্যায়ন করে।
পরপর কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক, অনিয়ম ও একতরফা প্রতিযোগিতার অভিযোগ তৈরি হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বিরোধী দলের সীমিত অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন বহু নাগরিকের মনে সংশয় সৃষ্টি করেছিল। অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন, তাদের ভোট কতটা কার্যকর। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি নিহিত থাকে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে। যখন সেই অংশগ্রহণ সীমিত বা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। জনগণের আস্থা হারালে কোনো শাসনই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না, এই শিক্ষা ইতিহাস বহুবার দিয়েছে।
আজকের এই নির্বাচন তাই কেবল আরেকটি ভোটগ্রহণ নয়, এটি আস্থার পুনর্গঠনের একটি সুযোগ। দীর্ঘ সময় পর মানুষ নতুন উদ্দীপনা নিয়ে ভোটকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরেছে। বাস, ট্রেন, নৌপথ ও আকাশপথে ঘরে ফেরার ভিড় যেন উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। শহরগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে, আর গ্রামগঞ্জে বেড়েছে সরব উপস্থিতি। এ দৃশ্য প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকারকে কতটা মূল্য দেয়। ভোট তাদের কাছে কেবল একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি মর্যাদা ও অংশগ্রহণের প্রতীক।
এই মুহূর্তে জাতির প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট। নির্বাচন অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। প্রত্যেক ভোটার যেন ভয়, চাপ বা প্রলোভন ছাড়াই নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে। নির্বাচন পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দৃশ্যমানভাবে স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি মজবুত করতে এবং নির্বাচিত সরকারের নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পরিস্থিতি শান্ত রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রে বিজয় ও পরাজয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ফল ঘোষণার পর যদি সহিংসতা, প্রতিশোধ বা অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে তা জাতীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তাদের কর্মী ও সমর্থকদের সংযত রাখা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ নিশ্চিত করা। পরাজিত পক্ষ যদি কোনো আপত্তি জানাতে চায়, তা সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই করা উচিত। বিজয়ী পক্ষের উচিত উদারতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব প্রদর্শনকরা। নির্বাচনোত্তর শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং আবেগপ্রবণ। তারা তাদের পছন্দের দল ও প্রার্থীকে ভালোবাসে। কিন্তু সেই ভালোবাসা অন্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে বাস্তব প্রত্যাশা। কৃষক চান ন্যায্য ফসলের দাম, শ্রমিক চান নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি, শিক্ষার্থী চান মানসম্মত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, ব্যবসায়ী চান স্থিতিশীল নীতি ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ। সাধারণ নাগরিক চান নিরাপত্তা, সেবা ও ন্যায়বিচার। এই বহুমাত্রিক প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। জনগণ বিশ্বাস করে, সঠিক নেতৃত্ব তাদের জীবনমান উন্নত করতে সক্ষম।
কিন্তু রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা দখল ও ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণ হয় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও রাষ্ট্রের স্বার্থে তারা সহযোগী। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব যার হাতে থাকবে, তার জবাবদিহি বেশি। নীতি প্রণয়ন, আইন বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা অপরিহার্য। অন্যদিকে বিরোধী দলের ভূমিকা হলো গঠনমূলক সমালোচনা করা, বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া এবং সংসদে সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করা। শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল গণতন্ত্রকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের গুরুত্ব আরও বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে অভ্যন্তরীণ ঐক্য অপরিহার্য। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়, উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের অবস্থান দুর্বল হয়। তাই অভ্যন্তরীণ শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল দলীয় স্বার্থের বিষয় নয়, এটি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন।
এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে আইনের শাসন। আইনের শাসন মানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত প্রভাব বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবে না। বিচারব্যবস্থা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। উন্নয়নের দৃশ্যমান সাফল্য থাকলেও যদি আইনি কাঠামো দুর্বল থাকে, তবে সেই অগ্রগতি স্থায়ী হয় না।
অতীতে যারা অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, তাদের ন্যায়বিচার পাওয়া অধিকার। তবে সেই বিচার প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে হবে। প্রতিহিংসা নতুন করে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ আদালত ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই পারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। নতুন করে কোনো রাজনৈতিক অন্যায় যেন জন্ম না নেয়, সে দায়িত্বও সমানভাবে সবার।
রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দলীয় আনুগত্যের চেয়ে পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিক মানদণ্ডকে প্রাধান্য দিলে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর জবাবদিহি কাঠামোই পারে উন্নয়নের ভিত্তিকে স্থায়ী করতে।
আজকের এই নির্বাচন তাই কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি নৈতিক পরীক্ষা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেবে, নাকি কেবল ক্ষমতার অঙ্ক কষবে, সেটিই দেখার বিষয়। জনগণের আস্থা অর্জন কঠিন, কিন্তু হারানো সহজ। তাই এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, সংলাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ। অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, নির্বাচনোত্তর শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর এগিয়ে যেতে পারবে।
আজ ভোটের দিনে প্রত্যেক নাগরিক যখন ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তখন তারা শুধু একটি প্রতীকে সিল মারবেন না, তারা দেশের ভবিষ্যতের পক্ষে অবস্থান নেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এটি দায়িত্বশীল আচরণের মুহূর্ত। যদি সরকার ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই জনগণের রায়কে সম্মান করে এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি ইতিবাচক অধ্যায় হয়ে থাকবে। অন্যথায় ইতিহাস আবারও কঠোর মূল্যায়ন করবে। এখন সময় প্রমাণ করার, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পথে এগোতে প্রস্তুত।

লেখক- প্রফেসর ড. খালিদুর রহমান
পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন