যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্যমান সামরিক ঘটনাগুলোর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, কৌশলগত বিভ্রান্তি এবং নীতিগত অসামঞ্জস্য। এই সংঘাতের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে এটি আর কেবল একটি প্রচলিত যুদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট, যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় হলো ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের ধারাবাহিক পরিবর্তন। একদিকে তিনি প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন যে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে দুর্বল করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে, অন্যদিকে আবার গভীর রাতে সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। এই দ্বৈত অবস্থান কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; বরং এটি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা এবং সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিফলন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে যখন একই সময়ে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা, বিশেষ করে মেরিন ইউনিট, ওই অঞ্চলে পাঠানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ কথায় যুদ্ধ শেষের আভাস থাকলেও বাস্তবে যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছে।
এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিগত অবস্থানের পেছনে যে গভীর বিভাজন কাজ করছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তুলসী গ্যাবার্ডের মূল্যায়নে। তিনি যে গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তাতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ইরান তাৎক্ষণিক কোনো পারমাণবিক হুমকি তৈরি করছে না। এই মূল্যায়ন সরাসরি সেই যুক্তিকে দুর্বল করে দেয়, যার ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধের নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যখন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে এমন ফারাক দেখা যায়, তখন তা শুধু নীতিগত সংকটই নয়, বরং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্নও তুলে ধরে।
এই প্রেক্ষাপটে জো কেন্টের পদত্যাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সামনে আসে। একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে এই যুদ্ধ তার বিবেক এবং বাস্তব মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার পদত্যাগ কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি প্রশাসনের অভ্যন্তরে জমে থাকা অসন্তোষের একটি প্রকাশ্য প্রতিফলন। একইভাবে ক্যারি প্রিজিন বোলারের প্রকাশ্য সমালোচনা দেখিয়ে দেয় যে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘাঁটির মধ্যেই বিভক্তি তৈরি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে বহিরাগত তথা ইসরায়েলের প্রভাব কাজ করছে, যা পুরো বিতর্ককে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ইরান ধারাবাহিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এমনকি ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন বেনগুরিয়েন বিমানবন্দর, আক্রমণের আওতায় এসেছে। আরও বিস্ময়কর হলো ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ডিয়েগো গার্সিয়ার মতো দূরবর্তী সামরিক ঘাঁটিতেও ইরানের হামলার চেষ্টা, যা তাদের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে পূর্বের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই পরিস্থিতিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলও আক্রমণাত্মক অবস্থান বজায় রেখেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইরানের বিরুদ্ধে হামলা আরও তীব্র করার ঘোষণা দিয়েছেন, এবং ইতোমধ্যেই নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় পুনরায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ইসরায়েলের আরাদ এবং ডিমোনা শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সবসময় সফল হচ্ছে না। এতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে, যা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে।
ইরানের কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে তারা সরাসরি সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও তাদের যুদ্ধ কৌশল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তারা একদিকে সরাসরি হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্র এবং প্রক্সি শক্তিগুলোর মাধ্যমে বহু ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন আক্রমণ এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এর ফলে যুদ্ধ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে একটি আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হচ্ছে।
এই বিস্তৃত সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের প্রধান পথ, এখন কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ইরান যদি এই পথ নিয়ন্ত্রণে রাখে বা বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। ইতোমধ্যে তেলের দাম ১১৫ থেকে ১২০ ডলারের কাছাকাছি ওঠানামা করছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে দেখালেও, বৈশ্বিক বাজারের এই অস্থিরতা তাদের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
এই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করেছে, যা একটি বাস্তববাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর ফলে ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ আবার ইরানি তেল কেনার চিন্তা করছে। কিন্তু এই পদক্ষেপ একই সঙ্গে একটি দ্বৈত বার্তা দেয়—একদিকে যুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্বার্থে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এটি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অসঙ্গতিকে সামনে নিয়ে আসে।
এদিকে রাশিয়া ও চীনের অবস্থানও এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভ্লাদিমির পুতিন প্রকাশ্যে ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন এবং এই যুদ্ধকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও রাশিয়া ও চীন সরাসরি সামরিক জড়িত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি, তবুও তাদের রাজনৈতিক সমর্থন ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা।
এই পুরো প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—যুদ্ধটি একটি অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের কথা বলছে, অন্যদিকে বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে সংঘাত ক্রমশ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন যেখানে ২০০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেখানে এটি পরিষ্কার যে তারা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই দীর্ঘায়িত যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলছে। রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই মতভেদ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই স্থলসেনা পাঠানোর বিরোধিতা করছেন এবং দ্রুত একটি এক্সিট স্ট্র্যাটেজি তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখনও জনমনে তাজা, ফলে নতুন করে একটি দীর্ঘ যুদ্ধের সম্ভাবনা জনসমর্থনকে দুর্বল করে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে এই সংঘাত এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে কোনো পক্ষই সহজে বিজয় অর্জন করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শক্তি অত্যন্ত উন্নত হলেও তারা যে ধরনের বিকেন্দ্রীভূত এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছে, তা দ্রুত পরাজিত করা কঠিন। অন্যদিকে ইরান সরাসরি বিজয়ের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে, যা প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে তুলতে পারে।
এই বাস্তবতায় বলা যায়, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি শুধু একটি যুদ্ধ নয়; এটি একটি জটিল কৌশলগত সংঘাত, যার প্রভাব বহু বছর ধরে অনুভূত হতে পারে। সামরিক সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্গঠন। আর এই তিন ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই যুদ্ধের শেষ এখনও অনেক দূরে।
লেখক: শিক্ষক, পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
