ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এখন ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। একসময় যাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছিল, সেই ইরানকে যুদ্ধ শেষে দুর্বল, ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আর না ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। দেশটির ওপর দুই হাজারের বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
আমিরাত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলার ৮০ শতাংশেরও বেশি ছিল বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর। যার মধ্যে রয়েছে তেল স্থাপনা, রিফাইনারি, বিমানবন্দর, বন্দর, হোটেল ও ডেটা সেন্টার। এতে ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৫৭ জন আহত হয়েছেন। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ছয়টি দেশ এখন পর্যন্ত সরাসরি পাল্টা হামলা থেকে বিরত রয়েছে, কেবল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আমিরাতের শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তি মন্ত্রী সুলতান আল-জাবের এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এটি কোনো সামরিক সংঘর্ষ নয়। এটি একটি শান্তিপূর্ণ দেশের ওপর হামলা- যে দেশ কূটনীতির জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিষয়টি অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কথা বললেও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুতি, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া।
ইরানি নেতারা সামপ্রতিক সময়ে বলেছেন, তারা কেবল তখনই যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে, যদি ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা পায়। তবে তারা দাবি করেছে, তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্বার্থ লক্ষ্য করেই হামলা চালাচ্ছে। যা গালফ দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাজেদ আল-আনসারী বলেন, কাতারে ইরানের হামলা শুরুর পর থেকেই বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা থামেনি। গালফের সব দেশেই বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যদিও উন্নত মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হয়নি।
গালফ অঞ্চলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ইরানের নির্বিচার হামলার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ফলাফল হবে এমন এক ইরান, যা এতটাই দুর্বল হবে যে, ভবিষ্যতে প্রতিবেশীদের জন্য আর হুমকি হয়ে উঠতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের বিমান ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হলেও এবং শীর্ষ নিরাপত্তা নেতা আলি লারিজানির মৃত্যুর পরও ইরান এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সমপ্রতি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ডিপোতে আগুন লাগিয়ে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়েছে তারা।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ পুরো বিশ্বের অর্থনীতির ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বে ৩৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ২০ শতাংশ এলএনজি পরিবাহিত হতো। এতে বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুলতান আল-জাবের বলেন, হরমুজকে জিম্মি করে ইরান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অর্থনীতি মন্থর হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। কাতারের দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুম বলেন, ইরান সব সীমা অতিক্রম করেছে। এখন সবার স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই কাজ শেষ করতে হবে। যুদ্ধ যদি এখনই থেমে যায় এবং ইরান বিজয় দাবি করে, তাহলে তারা পুরো অঞ্চলকে জিম্মি করে ফেলবে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সমপ্রতি একটি প্রস্তাবে ইরানের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন ও অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের যুগে সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত প্রণালি খুলে দেয়া অত্যন্ত কঠিন।
উপসাগরীয় কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, ইরানকে বাধ্য করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলের হুমকি দিতে হবে। যেখান দিয়ে দেশটির ৯০ শতাংশের বেশি তেল রপ্তানি হয়। এ লক্ষ্যে মার্কিন মেরিন বাহিনীর একটি ইউনিট ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে।
এদিকে ইরান গালফ অঞ্চলের তেল স্থাপনা, বন্দর ও রিফাইনারিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি এডিএনওসি তাদের কিছু অফশোর কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
তবে সুলতান আল-জাবের বলেন, আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি এবং বিশ্ববাজারে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবো। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যুদ্ধ শেষে তারা দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে আগের সক্ষমতায় ফিরতে পারবে।

Lima
২ মাস আগেমুসলমান মাথানত করার কথা নয়।