প্রিয় পাঠক, আয়নায় অতীতের কিছু দৃশ্য তুলে ধরছি। মিলিয়ে দেখুন তো কার সঙ্গে কতোটুকু যায়? কতোটুকু মিলে? ঈদের নতুন কাপড়ের জন্য দর্জি বাড়িতে কে কে ধরনা দিয়েছেন? ঈদের আগের রাতেও নতুন জামা, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার কামিজের জন্য কে কে অপেক্ষার প্রহর কাটিয়েছেন? ঈদের নতুন পোশাক কে কে লুকিয়ে রাখতেন? যাতে ঈদের আগেই অন্য কেউ পোশাক দেখতে না পায়। ঈদের সিনেমা দেখার জন্য টিকিটের লম্বা লাইনে কে কে দাঁড়িয়েছেন? ব্ল্যাকারদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেও কে অধিক দামে সিনেমার টিকিট কিনেছেন, অথবা টিকিট কিনতে পারেননি? ঈদের দিন আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশীর খাবার টেবিলে অথবা খাবারের আয়োজনে কার কার অবাধ স্বাধীনতা ছিল। দাওয়াত করেনি তাই ওদের বাসায় যাবো না- এমন মানসিকতা কেউ কি পোষণ করেছিলেন? নাকি দাওয়াত ছাড়াই প্রতিবেশীর বাড়িতে খাবারের আয়োজনে যোগ দিতেন? ঈদের দিন কিসের দাওয়াত? বরং দাওয়াত ছাড়াই প্রতিবেশীর বাড়িতে কে কে যেতেন? ড্রয়িং রুমে পরিবারের সবাই এক সঙ্গে টেলিভিশনে ঈদের অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান কে কে দেখেছেন? একবার হাত তুলুন তো? বড়দের কাছ থেকে ঈদ সেলামি কে কে পেয়েছেন? ঈদের ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে গেলে কার কেমন অভিজ্ঞতা হতো? কার কার বৃদ্ধ বাবা-মা অথবা ভাইবোন বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল অথবা রেলস্টেশনে আপনার জন্য বিরামহীন অপেক্ষার প্রহর গুনতো? বাস অথবা রেলগাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সবাই এক সঙ্গে জড়িয়ে ধরতো। এমন মধুর স্মৃতি কার কার আছে?
অনেকেই হাত তুলেছেন। তাদের মধ্যে প্রবীণের সংখ্যা বেশি। কিশোর, তরুণেরা হয়তো একটু অবাক হয়েছে। কারণ দর্জি বাড়ি নামটাই তো তাদের কাছে অচেনা। দর্জি বাড়ি আবার কি? ঈদের নতুন পোশাকের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে কেন? দর্জি বাড়িতেই বা যেতে হবে কেন? মার্কেটে গেলেই তো পছন্দের কতো পোশাক। পছন্দ করে কিনলাম। বাসা অথবা বাড়িতে নিয়ে এলাম। সবাই দেখুক ক্ষতি কি? ঈদের নতুন পোশাক আগে-ভাগে দেখা, দেখানোর মধ্যেও তো মহা আনন্দ।
ঈদের সিনেমা দেখার জন্য কেন ব্ল্যাকে টিকিট কিনতে হবে? আজকাল মানুষ সিনেমা হলে যায় নাকি? মোবাইলফোনেই তো কতো সিনেমা, কতো নাটক দেখা যায়। কাজেই এত কষ্ট করে কে যাবে সিনেমা হলে? কাজেই ব্ল্যাকে টিকিট কেনার প্রশ্নই আসে না। ড্রয়িং রুমে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখার সময় কোথায়? ফেসবুক, ইউটিউব সহ আরও অনেক মাধ্যম বিনোদনের বিশাল দুনিয়া গড়ে তুলেছে। যেখানে শুধু ‘হ্যা’ বললেই আনন্দ বিনোদনের দৈত্য এসে হাজির হয়। মাথা নুয়ে বলে- কি দেখবেন? হুকুম করুন মালিক শুধু দেশ নয়, বিদেশেরও সকল ধরনের আনন্দ বিনোদনের ফেরিওয়ালা সেই দৈত্য। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি হাজির করে। দর্শককে চমকে দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাট ক্ষমতার অধিকারী এই দৈত্য। কল্প কাহিনীর দৈত্যরা সাধারণত ভয়ঙ্কর হয়। গোটা দুনিয়ার ক্ষেত্রে বিনোদনের নেতৃত্বে থাকা এই দৈত্যও ভয়ঙ্কর। তবে সে চালাকও বটে। ভয় দেখায় না। বিনয় দেখিয়ে কাজের কাজ হাসিল করে নেয়। বিনোদনের এই দৈত্যের প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত নিজেদের সিনেমা দেখে না। টিভি নাটক না দেখেই বলে এই দেশে ভালো নাটক হয় না। পত্রিকা তেমন একটা পড়ে না। দেশের টেলিভিশনও তেমন একটা দেখে না। প্রিয় পাঠক, আসুন না এবার নিজেদেরকে একটু বদলাই। এই খবর ইতিমধ্যে সবারই জানা। পবিত্র ঈদ উপলক্ষে দেশের প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল ৭ দিনব্যাপী ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, এবার ঈদে সব টেলিভিশন মিলে প্রায় আড়াইশ’ টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম প্রচার হবে। পাশাপাশি সিনেমা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, গানের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আরও নানা ধরনের অনুষ্ঠান আছে। আমরা কি এবার একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, ঈদের ৫/৭ দিন দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেই চোখ রাখবো। দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঈদ অনুষ্ঠানের নামে আসলে কি করলো, কি দেখালো, তা জানার জন্য তো ঈদের অনুষ্ঠানগুলো দেখা দরকার। যারা বলেন, আমাদের দেশে ভালো টিভি নাটক হয় না, ভালো সিনেমা হয় না, আসলে কি হয় না? নাকি এটা এক ধরনের উন্নাসিকতা? দেশেরটা ভালো নয়, বিদেশের টাই ভালো... যারা এ কথা বলেন, তাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, এবারের ঈদে দেশি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিন। আশাকরি আপনার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে। ঈদের আনন্দের অনুষঙ্গ বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যা। করোনাকালে দেশের পত্র- পত্রিকাগুলোর পক্ষ থেকে ঈদ সংখ্যা প্রকাশের নান্দনিক ধারায় ছেদ পড়ে। পরবর্তী সময়ে নতুন করে ঈদ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ শুরু হয়। এবার দেশের প্রায় প্রতিটি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক পত্রিকার বর্ণাঢ্য ঈদ সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে। ঈদের উপহার হিসেবে বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যাকে গুরুত্ব দিন। পাশাপাশি প্রিয় কবি-লেখকদের নতুন বই হতে পারে ঈদের শ্রেষ্ঠ উপহার। একবার কল্পনা করুন এই ঈদে আপনার ঠিকানায় একটি সুদৃশ্য ব্যাগে প্রিয় কবি লেখকের নতুন বই সঙ্গে প্রিয় পত্রিকার ঈদ সংখ্যা এলো। আপনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন। তাহলে ঈদ উপহারের তালিকায় আপনারও উচিত বই আর ঈদ ম্যাগাজিনে ভরা একটি ব্যাগ প্রিয়জনকে উপহার দেয়া।
ঈদের মতো আনন্দ দিনে আমরা গান শুনি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পাশের দেশের চটুল গানকেই আমরা বেছে নেই। দূরপাল্লার বাসে চেপে গন্তব্যে যাচ্ছেন, সেখানেও দেখবেন চটুল গানই বাজছে। এটাও এক ধরনের উন্নাসিকতা। কেন আমাদের দেশের শিল্পীদের ভালো গান নেই। বলছি না সারাক্ষণ দেশের শিল্পীদের গানই শুনতে হবে। কিন্তু অনেকেই যখন দেশের শিল্পীদের গানকে পাত্তা দিতে চান না তখনই প্রশ্নটা ওঠে। আমরা পরকে ভালোবাসতে গিয়ে আপনাকে ভুলে যাচ্ছি না তো? ভবিষ্যতে এর পরিণাম কিন্তু ভালো হবে না। শেষে একটা অনুরোধ করি। ঈদের এই ছুটিতে যে যেখানেই থাকুন না কেন দেশের যা কিছু আছে তাই নিয়েই যেন ব্যস্ত থাকি। টেলিভিশনে যেন দেশের অনুষ্ঠান দেখি। পত্র-পত্রিকার ঈদ সংখ্যাগুলো যেন সংগ্রহে রাখি। দেশের নাটক, সিনেমাই যেন হয় প্রথম প্রায়োরিটি। গান শুনবো দেশের শিল্পীর। ভ্রমণে যাবো দেশেরই ভেতরে। সবার আগে দেশ- এই হোক এবারের ঈদের আন্তরিক স্লোগান। শুভকামনা সবার জন্য। ঈদ মোবারক।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।
