প্রথম আলো
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে নতুন করে উত্তাপ’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ তৈরি হচ্ছে। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আজ রোববারের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। না হলে রাজপথে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। অন্যদিকে সরকারি দল বিএনপি বলেছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, আজ সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার শেষ দিন। নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিন দুটি শপথ নেওয়ার কথা। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে; অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন দুটি শপথের প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথই নিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তাঁরা বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের বিষয়ে সংবিধানে কিছু নেই। ভবিষ্যতে এটি যুক্ত হলে তখন শপথের বিষয়টি আসবে। এর পর থেকে সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা চলছে। এর আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাবে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপির মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংসদে বিক্ষোভ দেখান জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা। তাঁরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন।
বিরোধী দলের একটি সূত্র জানায়, আজ রোববার অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের বৈঠকেও উত্তাপ তৈরি হতে পারে। আর এটি হতে পারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিষয়টি অনির্ধারিত আলোচনায় উত্থাপনের চিন্তা আছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। এই আদেশ ও জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে গণভোটে রায় এসেছিল। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করার কথা সংবিধান সংস্কার পরিষদের।
অন্যদিকে বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান সম্পর্কে বলা আছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একইভাবে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের পর (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। জুলাই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার শেষ সময় আজ রোববার। আদেশ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির এই অধিবেশন আহ্বান করার কথা; কিন্তু সেটি হয়নি।
এরই মধ্যে এ–সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের চিঠি, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্দিষ্ট সংসদ সদস্যের শপথ পরিচালনা এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিল প্রশ্নে রুল হয়েছে। পৃথক দুটি রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ৩ মার্চ পৃথক রুল দেন। বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে পৃথক রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন ঝুলে গেছে।
বিরোধী দলের অবস্থান
গতকাল শনিবার বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৫ মার্চ সরকারের ৩০ দিন পূর্ণ হবে। এর মধ্যে যদি সরকার জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকে বা ডাকার ব্যবস্থা না করে, তাহলে তারা জাতির কাছে ক্ষমা পাবে না। সংসদ নেতাসহ সরকারকেই এর দায়দায়িত্ব নিতে হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। শিগগিরই শীর্ষ নেতারা বৈঠক করে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক বলেন, একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে, দুটি অধিবেশনই ডাকার কথা। কিন্তু অধিবেশন ডাকা হয়েছে শুধু জাতীয় সংসদের। বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তে সংসদ সদস্যের শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এতে বোঝা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের আগের অবস্থান থেকে ইউটার্ন নিয়েছে, সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে চলে গেছে। এর মাধ্যমে জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে, তাদের অপমান করা হয়েছে।
সরকারি দলের আপত্তি যেখানে
জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান–সম্পর্কিত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো, কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, নিম্নকক্ষের ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা; ন্যায়পাল, সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে।
যেমন বিএনপি চায় উচ্চকক্ষ গঠিত হবে সংসদে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে। অর্থাৎ সংসদ নির্বাচনে একটি দল যতটি আসন পেয়েছে, তার অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন পাবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। বিএনপি তাদের প্রস্তাবগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছিল। অন্যদিকে গণভোটে প্রস্তাবগুলো ছিল জুলাই সনদে যেভাবে আছে সেভাবে, বিএনপির ভিন্নমতের উল্লেখ ছাড়া।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, তাঁরা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের ফরম যুক্ত হলে, কে এই শপথ পড়াবেন, তা নির্ধারিত হলে, তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যাবে।
সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান হলো, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়নে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এই পরিষদ পূর্ণতা পায়নি।
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আলোচনা, এটা ফ্লোরে (সংসদ অধিবেশনে) হতে পারে।’
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘উত্তাপ ছড়াতে পারে সংসদ ও রাজপথে’। খবরে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে জাতীয় সংসদ ও রাজপথ। বিষয়টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল এখন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। সরকারি দল বিএনপি বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংবিধান বলবৎ থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি কোনো আদেশ জারি করতে পারেন না। ফলে এই পরিষদের বৈধতা নেই। দলটির মতে, এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। অপরদিকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রায় দিয়েছে। আর গণভোট অস্বীকার করলে এবারের নির্বাচন, সরকার, সংসদ-সবই অবৈধ। তাই গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারই বৈধতার একমাত্র পথ বলে তারা মনে করছে। এই জোট বলছে, আজ রোববারের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা হলে তারা রাজপথে আন্দোলনে নামবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে-আজকের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন হচ্ছে না। ফলে অনিবার্যভাবেই রাজপথ উত্তপ্ত হচ্ছে, এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে পুরো বিষয়টি দুঃখজনক এবং এর পরিণতি অমঙ্গলজনক।
প্রসঙ্গত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ১৩ নভেম্বর জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ওই আদেশের ওপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। সে হিসাবে অধিবেশন ডাকার সময়সীমা আজ রোববার শেষ হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে গণভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। অর্থাৎ ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা আদেশে বলা নেই।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতি যে আদেশ দিয়েছেন, সেখানে ক্ষমতাসীন বিএনপির আপত্তি ছিল না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের ক্ষেত্রেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল। নির্বাচনে বিএনপিও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে। এরপর জনগণের ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পর তারা মানছে না। এটি দুঃখজনক। গণভোটের রায় না মানার অর্থ হলো জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করা। এর পরিণতিও অমঙ্গলজনক। তবে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এ প্রসঙ্গে শনিবার যুগান্তরকে বলেন, দেশের সংবিধান কীভাবে সংশোধন হবে, তা বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে বলা আছে। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কিছু বলা নেই। তিনি বলেন, সংবিধান বলবৎ থাকাকালীন আরেকটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের কী আইনি ভিত্তি আছে, তা আমার বুঝে আসে না।
এদিকে শনিবার এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত হবে। এর আগে মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আরোপিত আদেশ একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ সময়ে তিনি ১৩ নভেম্বর জারি করা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আদেশটি (জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ) স্ত্রীলিঙ্গ বা পুংলিঙ্গ, তাই তো বুঝি না। সংবিধান কার্যকরের পর আদেশ জারির আর সুযোগ নেই।
কালের কণ্ঠ
দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার খবর ‘অবসরের টাকা পেতে পদে পদে হয়রানি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলেও অবসরের টাকা পেতে পদে পদে হয়রানির মধ্যে পড়ছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন এমনিতেই কম, তাঁদের পেনশন সুবিধাও নেই, ফলে শেষ জীবনে অবসরের এককালীন টাকাই তাঁদের ভরসার জায়গা। কিন্তু আবেদনের চার বছর পরও অবসরের টাকা পাচ্ছেন না শিক্ষক-কর্মচারীরা। এমনকি টাকা না পেয়ে অনেক শিক্ষক রোগ-শোকে ভুগে মারাও যাচ্ছেন।
দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও আগের সরকার এদিকে ভ্রুক্ষেপই করেনি। সম্প্রতি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় শিক্ষকরা আশা করছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক থাকায় তাঁদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে সরকার বিশেষ নজর দেবে। এই খাতে প্রয়োজনে আগামী বাজেটেই বিশেষ বরাদ্দ রাখবেন। আর ভবিষ্যতেও যেন সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য প্রতিবছর বাজেটেই বরাদ্দ রাখবেন।
সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের জন্য রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট। শিক্ষকদের প্রতি মাসের মূল বেতন থেকে অবসর বোর্ডে কেটে নেওয়া হয় ৬ শতাংশ টাকা ও কল্যাণ ট্রাস্টে কেটে নেওয়া হয় ৪ শতাংশ টাকা। কিন্তু বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থে পেনশনের পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। আর সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর বাজেটে এবং চাহিদামতো এককালীন থোক বরাদ্দ না দেওয়ায় প্রায় এক লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদনের স্তূপ জমে আছে।
এর মধ্যে অবসর বোর্ডে আবেদন জমা আছে প্রায় ৬৫ হাজার ও কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন জমা আছে প্রায় ৪৫ হাজার। ফরিদপুরের সদর উপজেলার একটি স্কুলের শিক্ষক আবদুল হাই কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন বছর আগে অবসরে গেছি। ছেলেমেয়েরাও সেভাবে সচ্ছল নয়। নানা রোগ ভেতরে বাসা বেঁধেছে। মনে করেছিলাম অবসরের পুরো টাকাটা পেলে একটু ভালো করে চিকিৎসা করাব, ছেলের একটা কাজের ব্যবস্থা করব, কিন্তু কবে টাকা পাব, তা বলতে পারছে না কেউ। প্রয়োজনেই যদি টাকা না পাই, তাহলে পরে পেয়ে কী লাভ? আসলে শিক্ষকদের দুঃখ কেউ বোঝে না।’
অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া ৬ শতাংশ অর্থে প্রতি মাসে জমা হয় ৭০ কোটি টাকা। আর বোর্ডের এফডিআর থেকে আসে তিন কোটি টাকা। প্রতি মাসে মোট আয় হয় ৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে যতসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে যান, তাঁদের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে প্রয়োজন হয় ১১৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি থাকে ৪২ কোটি টাকা। এভাবে আবেদন জমতে জমতে চার বছরেরও বেশি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এতে একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার চার বছরেরও বেশি সময় পরে টাকা পাচ্ছেন।
সমকাল
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে টানাপোড়েন সংসদে উত্তাপের আভাস’-এটি দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহবানের যে সময়সীমা ছিল আজ রোববার তা শেষ হচ্ছে। কিন্তু আজ এই সভা হবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বিষয়াট নিয়ে সরকারদলীয় জোট ও বিরোধীদলীয় জোটের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের আজকের অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিকে সামনে আনতে পারে বিরোধী দল। এতে প্রথম দিনের মতো আজও সংসদে উত্তাপ ছড়াতে পারেন নেতারা।
গতকাল শনিবার বিএনপি বলছে, পরিষদের বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। অনাদিকে সভা আহবানে সরকারকে আলটিমেটাম দিয়ে জামায়াতে ইসলামী বলছে, গণভোটের রায় কার্যকর না করলে তারা রাজপথে যেতে বাধ্য হবে। আর এনসিপির দাবি, সভা আহবান না করে প্রধানমন্ত্রী গণভোটের গণরায় অমান্য করেছেন।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। এ হিসাবে আজ ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। সময় পার হওয়ার পর কী হবে- এ বিষয়ে সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও মন্তব্য করতে রাজি হননি
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহবানের অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের সভা আহবান করতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি পরিষদের অধিবেশন আহবান করবেন। সভা আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা বলা নেই আদেশে।
এদিকে পরিষদের ভবিষ্যৎ গণভোট এবং আদেশের বৈধতা নিয়ে করা রিটে হাইকোর্ট ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন। ফলে কেউ কেউ বলছেন, আদালতের ওপরও বিষয়টি নির্ভর করছে।
ঐকমত্য কমিশনের সাবেক একজন সদস্য সমকালকে বলেন, এটি হলো সংসদীয় রাজনীতির 'দুই-তৃতীয়াংশের অভিশাপ' বিএনপি ২০০ আসন না পেলে সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সহায়তা নিতে বাধ্য থাকত। পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংস্কারের সুযোগ থাকায়, বিএনপি নিজ উদ্যোগে পরিষদ গঠন করত। সংসদে বিরোধীদের এমপি সংখ্যা মাত্র ৭৮। পরিষদেও তারা বিএনপিকে আটকাতে পারবে না। সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাওয়ায়, বিএনপি পরিষদকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছে। ফলে এখন রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া পথ নেই।
ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ইরানের ‘তেলকেন্দ্র’ খারগ দ্বীপে উপর্যুপরি হামলা। খবরে বলা হয়, ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপে উপর্যুপরি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই হামলার পরও দ্বীপটি থেকে তেল রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আরো হামলা হলে এর ‘ভয়াবহ প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে। ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে অবস্থিত খারগ দ্বীপে তেল কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং রপ্তানি ‘সম্পূণরূপে চলমান’। ইরানের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। বড় বড় তেলবাহী ট্যাংকার এখান থেকে তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, খারগ দ্বীপে ইরানের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালানো হয়েছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। তবে তেল অবকাঠামোর ওপর আঘাত করা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ট্রাম্প আরো দাবি করেন, চলমান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উত্পাদনকারী কারখানাগুলোতেও বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। তার দাবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানের বিরুদ্ধে এত বড় সামরিক আঘাত আর কেউ হানেনি এবং সামনে অভিযানের তীব্রতা আরো বাড়তে পারে।
এদিকে, খারগ দ্বীপে হামলার পর ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের তেল স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী তেল কোম্পানি ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে মার্কিন সেনা উপস্থিতি: এদিকে, সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। জাপানের ওকিনাওয়া ঘাঁটি থেকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন মেরিন সেনার একটি ইউনিট রওনা দিয়েছে বলে জানা গেছে। ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে রয়েছে উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি। এই জাহাজ থেকেই মেরিন সেনারা সরাসরি অভিযানে অংশ নিতে পারবেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রয়োজনে সমুদ্রপথে আক্রমণ বা বিশেষ সামরিক অভিযান চালাতেই এই বাহিনী ব্যবহার করা হতে পারে।
পালটাপালটি হামলায় বাড়ছে উত্তেজনা: এদিকে ইরান দাবি করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে তারা হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একাধিক দফা আক্রমণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
বণিক বার্তা
‘জ্বালানি সংকটের মধ্যেই দীর্ঘ ছুটির কবলে দেশ, মূল্যস্ফীতি আরো উসকে ওঠার শঙ্কা’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জ্বালানি সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পরিবহন ব্যবস্থায়। এমন নাজুক ও জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ১৭ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি। আনুষ্ঠানিকভাবে এর মেয়াদ টানা সাতদিন হলেও মার্চের বাকি দিনগুলোতেও দেশজুড়ে ছুটির আমেজ থাকবে । কারণ ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবস হওয়ায় শুক্র-শনিসহ আবারো টানা তিনদিনের ছুটি থাকবে। দীর্ঘ এ ছুটির প্রভাবে দেশে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি আরো উসকে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লম্বা ছুটি মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে উসকে দেয় সেটির উদাহরণ ছিল গত বছরের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ছুটি। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা নয়দিনের ছুটি ছিল। আর সে বছর ঈদুল আজহায় ছুটি বেড়ে ১০ দিনে গিয়ে ঠেকে। ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া সরকারি ছুটি শেষ হয়েছিল ১৪ জুন। এ ছুটির প্রভাবে বাজারে চাল, ডিম, মুরগি, সবজিসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। ঈদুল আজহার লম্বা ছুটির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায়ও উঠে আসে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারের তথ্য বলছে, গত দুই সপ্তাহে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দামই বেড়েছে। এর মধ্যে চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২-৫ টাকা। সোনালি মুরগির দাম কোনো কোনো বাজারে কেজিতে ৩৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। আর ব্রয়লার মুরগি ২৫০ টাকার বেশি। ঊর্ধ্বমুখী ডিমের দামও। বাজারে বাড়ছে সব ধরনের সবজির দাম। দীর্ঘ ছুটিতে বড় শহরের মানুষ ঈদ উদযাপন করতে গ্রামে যাচ্ছেন। এতে শহরের তুলনায় বেশি দূরত্বে থাকা গ্রামে পণ্য পরিবহন বেড়েছে। সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়।
অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর টানা ছুটি থাকলেও অর্থনীতি নিয়ে বাড়তি কোনো শঙ্কা ছিল না। কিন্তু এবার মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এরই মধ্যে জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন খাত নিয়ে বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশে অনেক ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় লাইনে থেকে চাহিদামতো জ্বালানি তেল মিলছে না। এরই মধ্যে পণ্য পরিবহন ব্যয় ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে বলে জানা গেছে। লম্বা দূরত্বে পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রাক মিলছে না। ঈদের ছুটি শুরু হলে এ সংকট আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, বিনিয়োগ খরা, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতাসহ দেশের অর্থনীতির পরিস্থিতি গত কয়েক বছর ধরেই নাজুক। এমন অবস্থায় দীর্ঘ ছুটি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সারা বছরই এ দিবস, সে দিবস বলে সরকারি ছুটি থাকে। তার মধ্যে উৎসবকে কেন্দ্র করে এত বড় ছুটি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই বিপদে ফেলে দিচ্ছে। দুই মাস পর দেশ আবারো একটি দীর্ঘ ছুটির কবলে পড়বে। আমার মনে হয় না, বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত সরকারি ছুটি হয়। চীনারা সারা বছর কাজ করে নববর্ষে দীর্ঘ ছুটিতে যায়। কিন্তু আমাদের সারা বছর এত ছুটি থাকার পরও উৎসব উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি অর্থহীন।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন: সময় শেষ, এখন কী হবে’। খবরে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এই পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবিতে ঈদের পর রাজপথে আসার আভাস মিলছে। গণভোটের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে এই পরিষদের অধিবেশন ডাকার সময়সীমা শেষ হচ্ছে আজ ১৫ মার্চ। অথচ এখন পর্যন্ত পরিষদই গঠিত হয়নি। ফলে পরিষদের অধিবেশন আহ্বানও অনিশ্চিত।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য আজ সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হলে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই দাবির সঙ্গে রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের দাবি যুক্ত করে ঈদের পর রাজপথে নামার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
তবে সরকারি দল বিএনপি বলেছে, বিষয়টি (সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন) নিয়ে সংসদ অধিবেশনে আলোচনা হতে পারে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপির ভাবনা সংসদে জানানো হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অহেতুক সমস্যা সৃষ্টি করল। এখানে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতা ব্যবহার করে গণভোটের পক্ষে রায় দিলেও তারা (সরকার) বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক। পরিণতি অমঙ্গলকর।’
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে কয়েক মাসের সংলাপের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়। এটি চূড়ান্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। নোট অব ডিসেন্টসহ (আপত্তি) গত বছরের ১৩ অক্টোবর এই সনদে স্বাক্ষর করে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল। দলগুলোর দাবির মুখে সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি করা হয়। ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক প্রস্তাবে আপত্তি রাখা হয়নি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিন সনদ বাস্তবায়নের আদেশ প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে চলতি জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মতো সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয়। সে অনুযায়ী পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ৩০ দিন শেষ হচ্ছে আজ ১৫ মার্চ।
দেশ রূপান্তর
‘পুরনো আমলাতন্ত্রেই আটকে সরকার’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশাসনে বড় সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রস্তাবিত ২০৮টি সুপারিশ সেই আশাকে আরও জোরালো করেছিল। কিন্তু বদলি, পদোন্নতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো দেখে অনেকেরই প্রশ্ন সংস্কারের আলোচনার আড়ালে কি আবারও শক্তিশালী হচ্ছে পুরনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো?
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার চেয়ার বদলালেও আমলাতন্ত্রে এখনো বহাল রয়েছে পুরনো চর্চা, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আস্থাই অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে।
এর আগে তিনবার রাষ্ট্র পরিচালনা করা বিএনপি শুরুতেই আগের সরকারগুলোর মতোই যাত্রা শুরু করেছে। প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন প্রতিমন্ত্রীকে। কার্যত মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেই রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী এখনই আগ্রাসী কোনো পরিবর্তনে যাবেন না। তবে তারা এও মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী সময় নিয়ে হলেও এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। তার ওপর ভরসা রাখতে চান সংশ্লিষ্টরা।
এসব বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের চেয়ে আমলাতন্ত্র ভয়ংকর। এখানে যে কৌশলী ফাঁদ পাতা আছে সেটা প্রধানমন্ত্রী যত দ্রুত ধরতে পারবেন প্রশাসন তত ভালো কাজ করবে। জনগণের কল্যাণের প্রশাসন তৈরি করতে কঠোর মনিটরিং লাগবে। দক্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে, সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারি কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি সার্ভিসের অধীনে থাকা সমিতিগুলোর কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা বা দাবি-দাওয়া আদায়ে বিক্ষোভ কিংবা প্রতিবাদ সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো বর্তমান সরকারও অন্তর্বর্তী সরকারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডি করার আগের প্রবণতাই বহাল এখনো। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস না হতেই এরই মধ্যে অন্তত ৭ জনকে সচিব বা সমমানের পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং একজনকে করা হয়েছে ওএসডি। আরও কয়েকজন সচিবকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ৯ সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
