তারেক রহমানের ‘দুঃখপ্রকাশ’ কি নির্বাচনী খেলায় গেমচেঞ্জার

ক্ষমা, রাজনীতি ও ভোটের সমীকরণ

তারেক রহমানের ‘দুঃখপ্রকাশ’ কি নির্বাচনী খেলায় গেমচেঞ্জার

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমা চাওয়া একটি বিরল ঘটনা। এখানে ভুল স্বীকার নয়, বরং ভুল অস্বীকারই বরাবর রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণে অতীতের ভুল-ত্রুটির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। নির্বাচনমুখী উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহে এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা—যার প্রভাব শুধু ভোটের অঙ্কেই নয়, রাজনীতির ভাষা ও সংস্কৃতিতেও পড়তে পারে। তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে অনেকেই নিছক নির্বাচনী কৌশল বলে উড়িয়ে দিতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন বক্তব্যই বা কৌশলবহির্ভূত? আসল প্রশ্ন হচ্ছে, এই কৌশল কার্যকর কি না এবং এর সামাজিক-রাজনৈতিক অভিঘাত কী। ক্ষমা চাওয়াকে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাধারণত দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। অথচ গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিপক্ব সমাজে ক্ষমা চাওয়া নেতৃত্বের নৈতিক শক্তির প্রকাশ। তারেক রহমান যখন বলেন, “দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি হয়েছে—সেজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি,” তখন তিনি আসলে একটি রাজনৈতিক ট্যাবু ভাঙছেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি একটি মধ্যপন্থী অবস্থান নিয়েছেন—ভুল হয়েছে, কিন্তু তা ইচ্ছাকৃত ছিল না; শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোনোর অঙ্গীকারই মুখ্য। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্র পরিচালনায় জটিল, বিভক্ত ও চাপপূর্ণ বাস্তবতায় এটি একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক বয়ান। আর এখানেই বক্তব্যটির কৌশলগত শক্তি।নির্বাচনী মাঠে জামায়াত ও তাদের সমর্থকরা দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপিকে ২০০১–২০০৬ সময়কার দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে তারেক রহমান সেই আক্রমণের ধার অনেকটাই ভোঁতা করে দিয়েছেন। রাজনীতিতে অভিযোগের সবচেয়ে কার্যকর জবাব অনেক সময় অস্বীকার নয়, স্বীকারোক্তি। কারণ স্বীকারোক্তির পর অভিযোগ আর ‘স্ক্যান্ডাল’ থাকে না—তা হয়ে যায় অতীত। সমালোচকদের ভাষায়, “লেট দ্য ক্যাট আউট অব দ্য ব্যাগ”—এখন আর লুকোনোর কিছু নেই। এখানে জামায়াতের জন্য একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আসে—যদি বিএনপি সরকার দুর্নীতির আখড়া হয়ে থাকে, তবে সেই সরকারের অংশীদার হিসেবে জামায়াত কেন সেই সময় কোনো নৈতিক প্রতিবাদ করেনি? কেন তাদের মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেননি? কেন তারা রাষ্ট্রক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেছেন? এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়, কিন্তু তারেক রহমানের বক্তব্য এগুলোকে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে। তারেক রহমানের ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ’ শব্দবন্ধের ব্যবহার। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বয়ানগত দাবি। তিনি ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে; ‘তথাকথিত ডামি নির্বাচন’   ;হিসেবে উল্লেখ করে বর্তমান নির্বাচনকে জনগণের পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

এখানে লক্ষ্যণীয়, তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি বা বিজয়োল্লাসে যাননি। বরং তিনি জবাবদিহিতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের শাসনের কথা বলেছেন। “দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায়, বিএনপি সরকার ততটাই কঠোর হবে”—এই বক্তব্য নির্বাচনী ভাষণে সাহসী অঙ্গীকার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্নীতিবিরোধী কথা বহুবার শোনা গেছে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তা প্রায়শই হারিয়ে গেছে। ফলে এই বক্তব্য নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে দুঃখ প্রকাশ করার ; মাধ্যমে তারেক রহমান যে নৈতিক উচ্চতার দাবি তুলেছেন, সেই দাবি বাস্তবায়নের চাপও তিনি নিজেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তারেক রহমানের ভাষণে ধর্ম নিয়ে দেওয়া বক্তব্যগুলোও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ;“ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”—এই বাক্যটি বাংলাদেশের সংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে এটি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা সব দলের পক্ষে সহজ নয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দেশের জনগণ ধর্মীয় চরমপন্থা ও উগ্রবাদ পছন্দ করে না। এই বক্তব্য একদিকে জামায়াত ও উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির প্রতি দূরত্ব তৈরি করে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু ও মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে একটি আশ্বাসের বার্তা দেয়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে “তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক”—এই আহ্বান কেবল আবেগ নয়, একটি রাজনৈতিক বিনিয়োগ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই দুঃখপ্রকাশ কি ভোট বাড়াবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, হ্যাঁ। কারণ বাংলাদেশের সাধারণ ভোটার নৈতিকতার প্রশ্নে পুরোপুরি উদাসীন নয়। ভুল স্বীকার করা, ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য অঙ্গীকার—এই তিনের সমন্বয় অনেক দ্বিধাগ্রস্ত ভোটারকে সিদ্ধান্তে আনতে পারে। বিশেষ করে যারা বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল কিন্তু সিদ্ধান্তহীন ছিলেন, তাদের জন্য এটি একটি ;‘নৈতিক ছাড়পত্র’ ;হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে এটাও সত্য, ক্ষমা চাওয়া নিজেই কোনো ম্যাজিক নয়। ক্ষমতার পর বাস্তব আচরণই হবে আসল পরীক্ষা। ইতিহাস সাক্ষী—বাংলাদেশের ভোটার ক্ষমা করতে জানে, কিন্তু ভুলে যায় না। তারেক রহমানের দুঃখপ্রকাশকে যারা নিছক নির্বাচনী কৌশল বলে খাটো করতে চান, তারা হয়তো রাজনীতির মানবিক দিকটি উপেক্ষা করছেন। আবার যারা এটিকে সার্টিফিকেট ভাবছেন, তারাও বাস্তবতাবিবর্জিত আশাবাদে ভুগছেন। তবু এটুকু বলা যায়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বক্তব্য একটি নতুন নজির। ক্ষমা চাওয়া যদি রাজনীতিতে দুর্বলতা না হয়ে দায়িত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক।

আগামী বৃহস্পতিবারের ভোট শুধু সরকার বদলের ভোট নয়—এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনার ভোটও। ক্ষমা, জবাবদিহিতা ও প্রতিশ্রুতি—এই তিনের পরীক্ষায় কারা উত্তীর্ণ হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমা, আত্মসমালোচনা ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ–এর ২০১৮ সালের প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তাঁর শাসনামলে কিছু সিদ্ধান্ত দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর ছিল। ৯২ বছর বয়সে রাজনীতিতে ফিরে এসে মাহাথির মোহাম্মদ বলেছিলেন—“I made mistakes when I was in power. If I want to correct them, I must first admit them. ”(আমি ক্ষমতায় থাকাকালে ভুল করেছি। সেগুলো সংশোধন করতে হলে আগে আমাকে সেই ভুল স্বীকার করতে হবে)। মাহাথিরের এই আত্মস্বীকার কেবল নৈতিক অবস্থানই ছিল না; এটি মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে একটি বাস্তব রাজনৈতিক টার্নিং পয়েন্ট তৈরি করেছিল। জনগণ দেখেছিল—একজন প্রবীণ নেতা ক্ষমা চেয়ে, ভুলের দায় নিয়ে আবার জনগণের সামনে দাঁড়াতে পারেন। ফলাফল ছিল ঐতিহাসিক: ছয় দশকের শাসক দল বারিসান ন্যাশনাল পরাজিত হয়, এবং মাহাথির নেতৃত্বে বিরোধী জোট ক্ষমতায় আসে।

এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, ক্ষমা চাওয়া রাজনীতিতে সব সময় দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং সঠিক সময়ে তা জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। তারেক রহমানের দুঃখপ্রকাশকে যদি এই এশীয় বাস্তবতার আলোকে বিচার করা হয়, তবে এটিকে নিছক আবেগী বক্তব্য বা কৌশল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং এটি এক ধরনের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের বার্তা—যেখানে অতীতের ভুল স্বীকার করেই ভবিষ্যতের জন্য নতুন দাবি তোলা হয়।

এখন শেষ বিচারে প্রশ্ন একটাই—মাহাথির যেমন ক্ষমা চাওয়ার রাজনীতিকে বাস্তব ক্ষমতায় রূপ দিতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান কি সেই নৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন? উত্তর দেবে সময়, আর রায় দেবে জনগণ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন