নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক নির্মাণকাজের প্রকল্প প্রস্তাব পাস হয় ২০১৮ সালে। ২০১৯ সালে ঠিকাদার নিয়োগের পর ব্রিজ-কালভার্ট করার কাজ সম্পন্ন হলেও ১৯ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ আর এগোচ্ছে না। ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতির কারণে কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে এ প্রকল্পের মেয়াদ। তবে এই সময়ে জায়গা ও অবকাঠামোর মূল্যবৃদ্ধিতে শুধু এই প্রকল্পটিতে সরকারের গচ্চার পরিমাণ ১৪৮ কোটি টাকা। নাসিরনগরের ৯ ব্রিজ প্রকল্পের কাজও বন্ধ ভূমির জন্য। একবছর আগে ঠিকাদার নিয়োগ হলেও ভূমি অধিগ্রহণের জন্য কাজ শুরু হচ্ছে না ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর-নবীনগর সড়কের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি প্রকল্পই শুধু নয়, ভূমির জন্য স্থবির আরও ১৪টি প্রকল্প। জেলার ছোট-বড় মোট ১৭টি প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজ করছে জেলা প্রশাসন।
নাসিরনগর সদর থেকে ভলাকুট ও চাতলপাড় হয়ে সরাইলের অরুয়াইল পর্যন্ত সড়ক সংযোগ স্থাপনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ৯টি ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের কাজের দরপত্র হয় ২০২১ সালের নভেম্বরে। ঠিকাদার নিয়োগের পর এর মধ্যে দু’টি ব্রিজের কাজ ২০২২ সালে শুরু হলেও ড্রয়িং-ডিজাইনে ত্রুটি থাকায় নতুন করে পাঁচটি ব্রিজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০২৩ সালে পুনঃদরপত্র আহ্বানের পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এসব ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু অধিগ্রহণের ধীরগতিতে এখন ঝুলে আছে এসব ব্রিজ নির্মাণকাজ। নাসিরপুর, ভলাকুট, খাগালিয়া, দুর্গাপুর, চাতলপাড় চকবাজার, ফুলকারকান্দি, ইছাপুর, গুজিয়া ও কান্তার খালের ওপর ছোটবড় ৯টি ব্রিজ নির্মাণকাজের তিনটি মাত্র শেষ হয়েছে। ফলে এই প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত নাসিরনগর উপজেলার ভাটি অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। প্রকল্পের ১ নম্বর ব্রিজটি উপজেলা সদরের নাসিরপুরে। কিন্তু সেখানে ভূমি নিয়ে মামলার কারণে ব্রিজের এপ্রোচ রোডের কাজ বন্ধ। সরজমিন গেলে কথা হয় জায়গার মালিক আবদুল মোতালিব ও পান্ডব বিশ্বাসের সঙ্গে। পান্ডবের ভাই সপ্তরঞ্জন জায়গা নিয়ে আদালতে মামলা করেছেন। পান্ডব জানান, আমরার জায়গা আমরা কোনো কিছু পামু না। অ্যাকুয়ার করবো না, জিজ্ঞেসও করবো না।
আরও বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি। বলে সরকারি কাজে বাধা দিলে ১৪ সিরিরে ৮টা বান দিয়া চালান দিমু। এরপর নিরুপায় হয়ে আমার ভাই আদালতের আশ্রয় নেন। মোতালিবের জায়গার পরিমাণ পৌনে ২ কানি। জায়গা অধিগ্রহণের কোনো খোঁজখবরই তার জানা নেই। বলেন, খালি বলে পড়ছে পড়ছে। আমার ক্ষেতের ওপর দিয়ে জোরে পুল দিয়া লাইছে। আল্লাহ্-রসুলের দোহায় দিছি। আমরার কথা কোনো দামই দিছে না। ভলাকুটের মো. খেলু মিয়ার দাবি তার ১৬ ফুট জায়গা ব্রিজের ভেতরে পড়ছে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগও দিয়েছেন। তার বাধার কারণে ২ নম্বর ব্রিজের একপাশের গার্ডার ও স্ল্যাবের কাজ বন্ধ। কাজ বন্ধ হওয়ার পর তার ওপর ২/৩ বার অ্যাটাক হয়েছে বলেও জানান খেলু মিয়া। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ২৭৪ মিটার দৈর্ঘ্যের ব্রিজটি হচ্ছে বেমালিয়া নদীর ওপর দুর্গারামপুর ও চাতলপাড় চকবাজারের মধ্যে। এই ব্রিজের কাজ বন্ধ স্থানীয় জমির মালিকদের বাধাতে। সাবেক ইউপি সদস্য সাফি মাহমুদ বলেন, কাজের শুরুতে অ্যাকুয়ার হয়নি বলে আমরা বাধা দেই। উনারা বলছেন, অসুবিধা নাই কাজ করুক। আপনাদেরকে টাকা-পয়সা দেয়া হবে।
আমরারে বোগা দিতে দিতে এই পর্যন্ত অনেক ঘরবাড়ি সরাইছে। আবদুল হাসিম বলেন, ভেকু দিয়া বাড়িটা কাটছে। ৩-৪টা ঘর ভাঙা অইছে। টাকা-পয়সা পাইছি না। এলএ অফিস থেকে লোক আইয়া আরও দাতাইয়া (ধমক) গেছে আপনারা দিলেন কেন। আমরা ডিসি অফিস থেকে জায়গা বুঝাইয়া দিয়া গেছি। ব্রিজ করলো কেন এখানে। এ কারণে আমরা এখন বাধা দিয়া রাখছি। আমরা আগে টাকা-পয়সা পাইয়া লই। এরপর ব্রিজ করুক বাধা নেই। ৫ নম্বর ফুলকারকান্দি ব্রিজের গোড়াতেই বাড়ি খাদিজা বেগমের। বলেন, ব্রিজের কারণে আমাদের পুরা বাড়ি চইলা গেছে। সরকারের আপন বইলা জায়গা দিছি। আমরার অনেক ক্ষতি হইছে। এক জায়গায় গিয়ে যে ঘর কইরা থাকমু সেই জায়গা নাই। সবাই এক ঘরে বসবাস করি। এটা কোনো কাজ। গরিবের টাকা আগে দিয়া জায়গা নেয়া উচিত ছিল। টাকা-পয়সা দিবো দূরের কথা, কেউ আসে না। কাগজপত্রও দেয় নাই।
৯টি ব্রিজ প্রকল্পের ঠিকাদার মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজের খায়রুল হাসান জানান, প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২০ সালে। এরপর ডিজাইন-ড্রয়িংয়ের জটিলতার কারণে ২০২৩ সালের আগস্টে ৫টি ব্রিজের কাজের রি-টেন্ডার হয়। যার কার্যাদেশ হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু ১, ২, ৪, ৫, ৬, ৭ নম্বর ব্রিজের মধ্যে ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন নাই। সমস্ত জায়গা পাবলিকের। সেখানে টোটালি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। কাজ চলমান অবস্থায় আজকে ৬/৭ মাস ধরে বলা হচ্ছে ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন হবে, অধিগ্রহণের চিঠি আসতেছে। কিন্তু এখন আর তারা কোনো কিছু শুনতে রাজি না। কাজে বাধা প্রদান করে, দা নিয়ে আসে মারতে। এভাবে প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে আছে। মালের দাম এত বেশি বাড়ছে তাতে আমরাও দিশাহারা। যে রেটে কাজ নিয়েছিলাম তা থেকে এখন প্রত্যেকটা মাল ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট ভ্যারি করছে। যেহেতু আমার চুক্তির নির্দিষ্ট সময় দুই দুইবার অতিক্রম করেছে। এখন আমি এমন অবস্থায় পড়েছি কাজ করবো, কি করবো না- তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি।
গচ্চা ১৪৮ কোটি টাকা: ২০১৮ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক নির্মাণ কাজের প্রকল্প প্রস্তাব পাস হয়। এরপর ২০১৯ সালে ঠিকাদার নিয়োগ হয়। সড়ক ও জনপথ সূত্র জানায়,৭টি প্যাকেজের মধ্যে ৪টি প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে। যাতে ব্রিজ-কালভার্টগুলো নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণের কারণে মূল সড়কের কাজ শেষ হয়নি। এজন্য ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া ৩ দফা এই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হয়। কিন্তু এই কয়েক বছরে জমি ও অবকাঠামোর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন অধিগ্রহণ বাবদ সরকারকে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ১৪৮ কোটি টাকা। এরআগে ৬০৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ৯১.৫৯৩৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ধরা হয়েছিল ২৯৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের ৮টি এলএ কেইসের মধ্যে এখনো ৪টি এলএ কেইস প্যান্ডিং। প্রকল্প এলাকার লালপুরের শান্তিপুরের দেলোয়ার হোসেন বলেন, ৮ ধারার নোটিশ পাওয়ার পর আমরা গেছি। যাওয়ার পর বলছে, “কাগজপত্র এইটা লাগবো, ওইটা লাগবো। খারিজ লাগবো। সব কাগজপত্র ওকে কইরা দিছি, তারপর আবার বলছে, মূল দলিলের ফটোকপি লাগবো। টাকার জন্য গেলে শুধু আমাদের তাগাদা দেয়, বাড়িঘরগুলো ভেঙে দিতাম। আর মনে করেন এই ডেট দেই, ওই ডেট দেই। এই কাগজ, হেই কাগজ। কাগজ ঠিক করলেও শুধু ডেট দিয়া দেয়। কিন্তু আমাদের টাকা পয়সা দিতাছে না।” আবু কামাল বলেন, “২ মাস আগে আমরা ৮ ধারার কাগজ পাইছি। একমাস আগে কাগজপত্র জমা দিয়েছি। এরপর ৭/৮ বার যাওয়া হইছে। এহনো আমরার চেক পাস অইছে না।” গ্রামের রাশেদ মিয়া মাস্টার জানান, ৮ নম্বর ধারাটা আসছে ২ মাসের মতো হতে পারে। এখন কাগজপত্র জমা দিতে হবে রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজে। এরআগে ৪ধারা চারতলা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে টানিয়ে দিয়েছিল বলে আমি শুনেছি। তারপর ৭ নম্বর ধারাটা একবছর আগে মনে হয় সম্ভবত স্কুলের সামনে আঠা দিয়ে ওরা লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। দলিল হচ্ছে আমার আব্বার নামে। তিনি কিছুদিন আগে মারা গেছেন। সেজন্য কাগজপত্র রেডি করতে দেরি হচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর-নবীনগর সড়ক নির্মাণকাজের কার্যাদেশ হলেও অধিগ্রহণের কারণে ঠিকাদার এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি। এই প্রকল্পে ১৫২.৬৯৮০ একর ভূমি অধিগ্রহণে ১১টি এলএ কেসের মধ্যে ২টি শেষ হয়েছে। আখাউড়ার কৃষ্ণনগরে ২০৮ মিটার সেতুর কাজের জন্য ২০১৯ সালে দরপত্র আহ্বান করে এলজিইডি। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় এই কাজ এখনো শেষ হয়নি।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল মান্নান জানান, তাদের ২টি প্রজেক্ট আছে যেটা ল্যান্ড অ্যাকুইজিশনের জন্য সমস্যা হচ্ছে। এরমধ্যে বনগজ-কৃষ্ণনগর রাস্তার উপরে ২০৮ মিটার ব্রিজ নির্মাণে ল্যান্ড একুইজিশন প্রক্রিয়া ২০২১ সাল থেকে চলমান। ২০২৪ সালের দিকে ৪ ধারা জারি হয়েছিল তখন আবার সরকার টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর আবার ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে শুরু হয়। এখন কেবল ৪ ধারা জারি হয়েছে। এ জন্য কাজটা ডিলে হচ্ছে। নাসিরনগর উপজেলায় ৯টা ব্রিজের প্রকল্প। এরমধ্যে ৫টা ব্রিজের ল্যান্ড একুইজিসনে ২০২৩ সাল থেকে কার্যক্রম চলমান। এখন পর্যন্ত যৌথ পরিদর্শন শেষ হয়েছে।
আরও একদিন যেতে হবে। তারপর ৪ ধারা জারি হবে। এটা আরও কতোদিন লাগে আমরা বুঝতে পারছি না। এরজন্য আমরা ঠিকাদারকেও চাপ দিতে পারছি না। আমরা ডিসি অফিসে এলএ শাখায় যোগাযোগ করছি। উনারা বলছেন, দ্রুত হবে। আসলে লম্বা প্রসেস চলছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের কারণেই তো মেজরিটি পিছানো। আমরা মনে করি ৮০ পার্সেন্ট ওয়ার্কিং ডেইজ ভূমি অধিগ্রহণের কারণে পিছিয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ করে ঠিকাদারকে যতোক্ষণ কোনো প্রকল্প বুঝিয়ে না দেয়া যায় ততোক্ষণ পর্যন্ত ওরা কোনো কাজ করতে চায় না। লোকালি বাধাগ্রস্ত হই আমরা। ফলে ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যার কারণেই মুলত কাজটা পিছিয়ে আছে। তবে জনবল সংকটের কারণে অধিগ্রহণ কাজে আগে গতি না থাকার কথা স্বীকার করে এখন দ্রুততার সঙ্গে কাজ হচ্ছে বলে দাবি করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা আক্তার। তিনি বলেন, সম্প্রতি জনবল বৃদ্ধি পেয়েছি। গত সংসদ নির্বাচনের পর পুরোদমে কাজ চলছে।
পাশের অন্যান্য জেলার সঙ্গে কম্পেয়ার করলে দেখা যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অগ্রগতি অনেক ভালো। তিনি আরও বলেন, অধিগ্রহণের সঙ্গে শুধুই এলএ শাখা জড়িত এটা কিন্তু নয়, এর বাইরে গণপূর্ত, বনবিভাগ, সাবরেজিস্ট্র্রি অফিসও ইনভলব আছে। তাদের কাছ থেকে আমাদের ভূমির মূল্যটা সংগ্রহ করতে হয়। অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের জন্য গণপূর্তের কাছ থেকে প্রাক্কলন নিয়ে এসে বরাদ্দের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। সেক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের প্রাক্কলন প্রস্তুত করতে সময় চলে যায়। মানুষের ধারণা সব কাজ আমরা করি। গাছের ক্ষতিপূরণের জন্য বনবিভাগের প্রাক্কলন নিতে হয়। সেখানেও অনেক সময় দেরী হয়। সবমিলিয়ে কিন্তু ভূমি অধিগ্রহনের টোটাল প্রসেসটাতে দেরী হয়ে যায়। তারপরও নির্ধারিত সময়ের পর আমরা তাদেরকে তাগিদ দিচ্ছি, ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করছি।
