ইসরাইলের কি পারমাণবিক অস্ত্র আছে? এ নিয়ে ৬০ বছর ধরে গোপনীয়তা বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। কিন্তু এখন এই লুকোচুরি নীতি নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে মার্কিন কূটনীতিকরা হেলিকপ্টারে করে যাওয়ার সময় নেগেভ মরুভূমিতে একটি নির্মাণকাজ দেখতে পান। ইসরাইলি কর্মকর্তা অ্যাডি কোহেন তখন এটিকে একটি টেক্সটাইল কারখানা বলে জানান মার্কিনীদের। পরে মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পারেন, সেটি আসলে দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনা ছিল। পরবর্তীতে এটিই মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রাগারের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিতি পায়।
এই ঘটনার পাঁচ বছর পর মার্কিন কর্মকর্তারা টের পান, পেনসিলভানিয়ার একটি প্ল্যান্ট থেকে শত শত পাউন্ড অস্ত্র-গ্রেডের ইউরেনিয়াম নিখোঁজ হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা এবং সাম্প্রতিক একটি প্রামাণ্যচিত্রের মতে, এই ইউরেনিয়াম ইসরাইলি পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করার জন্য সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর থেকে গত ছয় দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এই পারমাণবিক অস্ত্রাগারের কথা স্বীকার করেনি। ইতিহাসবিদ অ্যাভনার কোহেনের মতে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বাজেভাবে রাখা গোপন বিষয়। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে এই অস্পষ্টতা বা গোপনীয়তার নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সাহায্য করেছে। একইসাথে ইসরাইলও কীভাবে পারমাণবিক বোমা পেয়েছে, সেই প্রশ্নের হাত থেকে বেঁচে গেছে।
তবে এই স্থিতাবস্থা এখন বদলাতে শুরু করেছে। ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পারমাণবিক চুক্তি কংগ্রেসে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মাঝে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবিচল সামরিক সমর্থনও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই বছরের শেষে ইসরাইলকে দেয়া প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৪৯ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা) সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, ইসরাইলের আর এই সহায়তার প্রয়োজন নেই। এছাড়া ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতারা দাবি করেন, ইসরাইলের পারমাণবিক বোমা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই লুকোচুরির অবসান হওয়া উচিত। সিএনএনের সাথে সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র ও গোয়েন্দা বিষয়ক কমিটির সদস্য জোয়াকিন কাস্ত্রো জানান, ইসরাইলের অস্ত্রাগার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্পষ্ট অবস্থান এখন বেপরোয়া ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তার মতে, ইসরাইলের পারমাণবিক ব্যবহারের চরম সীমা বা রেড লাইন না জেনে তাদের সাথে লড়াইয়ে নামা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই গোপনীয়তার পর্দা উঠলে অনেক পুরনো তথ্য সামনে আসবে। ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ থেকে পাওয়া তথ্য এবং ২০২৪ সালের হিব্রু ভাষার প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য অ্যাটম অ্যান্ড মি’ এর তথ্য অনুযায়ী, দিমোনার নিচে থাকা গোপন ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি মার্কিন পরিদর্শকরা কখনোই খুঁজে পাননি। পরিদর্শকরা আসার আগেই ইসরাইলি কর্মকর্তারা এর লিফট দেয়াল দিয়ে ঢেকে দিতেন। এই বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বা হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ইসরাইলি দূতাবাসও সিএনএন-এর কাছে কোনো উত্তর দেয়নি। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও জুনে কংগ্রেসের এক শুনানিতে জোয়াকিন কাস্ত্রোকে জানান, বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই জানে যে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তবে তারা কখনোই তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে না। অন্যদিকে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পারমাণবিক কৌশলবিদ ম্যাথিউ ক্রোয়েটিং সতর্ক করে জানান, ইসরাইল যদি নিজেদের পারমাণবিক শক্তিধর হিসেবে ঘোষণা করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটতে পারে, যা মার্কিন নীতির জন্য ভালো হবে না।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই গোপনীয়তা নীতির শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উভয়ই ভয় পেত যে এটি প্রকাশ পেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের মদদপুষ্ট আরব দেশগুলোও পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে ঝুঁকতে পারে। ১৯৬৫ সালে হেনরি কিসিঞ্জার যখন ইসরাইল সফর করে শিমন পেরেজসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে। তবে ১৯৬৮ সালে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত ইয়েতজাক রবিন মার্কিন কর্মকর্তাদের জানান, অস্ত্র পরীক্ষা ও প্রকাশ্যে ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত ইসরাইল এটিকে ওই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রবর্তন হিসেবে মনে করে না। ১৯৬৯ সালে রিচার্ড নিক্সন এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেইরের গোপন বৈঠকের পর এই অস্পষ্টতা নীতি চূড়ান্ত হয় এবং ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে।
১৯৮৬ সালে দিমোনা প্ল্যান্টের সাবেক টেকনিশিয়ান মোরদেচাই ভানুনু লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচির গোপন তথ্য ও ছবি ফাঁস করে দেন। সাংবাদিক পিটার হুনামের লেখা বই থেকে জানা যায়, ওই ঘটনার পর মোসাদ ভানুনুকে রোমে প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে এবং তাকে ইসরাইলে এনে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। নিউ ইয়র্কার পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইসরাইল বিল ক্লিনটনের প্রশাসন থেকে শুরু করে পরবর্তী মার্কিন সরকারগুলোর কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তা আদায় করে নেয় যে যুক্তরাষ্ট্র কখনো তাদের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য চাপ দেবে না। নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ-এর মতে, বর্তমানে ইসরাইলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। তবে এখন ইরান ও হুতি বিদ্রোহীদের সাথে উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পালটে যাচ্ছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর বিশেষজ্ঞ জেমস অ্যাক্টনের মতে, ইরানের হাতে প্রায় ১ হাজার পাউন্ড উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির অর্ধেক সম্ভাবনা রয়েছে। যদি ইরান পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে ইসরাইলকে হয়তো বাধ্য হয়ে তাদের এই লুকোচুরি নীতি থেকে সরে আসতে হবে।
সূত্র: সিএনএন
