জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্মেলন কপ (কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ)। এ বছর তুরষ্কে ৩১ তম কপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের আলোচনা করবে দেশগুলো। দশ বছর আগে কপ সম্মেলনে প্যারিস চুক্তি হয়েছিলো তাপমাত্রা কমানোর লক্ষ্যে। কিন্তু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির লাগাম টানা সম্ভব হয়নি। তারপরও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই চুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে। গত বছর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ৩০ সম্মেলনে একটি চুক্তি হলেও তা নিয়ে অনেকের অসন্তোষ ছিল। ব্রাজিল জাতীয় কার্বন নির্গমন কমানোর পরিকল্পনাগুলোকে আলোচনার টেবিল থেকে সরিয়ে নেয়ায় এই অসন্তোষ তৈরি হয়। ফলে তুরস্কে শুরু হতে যাওয়া এবারের কপ৩১ সম্মেলন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আদৌ এর কোনো কার্যকারিতা আছে কি না।
২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা। কিন্তু গত দুই বছর ধরে এই সীমা অতিক্রম করেছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক অনুমান অনুযায়ী তা এখন ১.৭ থেকে ১.৮ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, চীন ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো প্রায়ই জলবায়ু কার্যক্রমে বাধা দেয়। এমনকি উন্নত দেশগুলোও কার্যকর পরিকল্পনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এবারের কপ৩১ এর আয়োজক তুরস্ক এবং সভাপতি অস্ট্রেলিয়া উভয় দেশই জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি আগ্রহী। তাই জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ কমাতে এবারের সম্মেলন থেকে কার্যকর কোন পদক্ষেপ আশা করা কঠিন।
তবে এত হতাশার মাঝেও কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বন উজাড় কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। এছাড়া সার্বিয়া ও হাঙ্গেরিতে কর্তৃত্ববাদের পতনের মতো বিষয়গুলো জলবায়ু কর্মীদের আশাবাদী করছে। চীনের মতো বড় অর্থনীতি এখন সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ এখন মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ যোগান দিচ্ছে এবং ভিয়েতনামে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কপ৩১ সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট শক্তির ব্যবহারের ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে মেটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে, যা কার্বন নির্গমন কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হবে।
পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক জোহান রকস্ট্রম একে বৈশ্বিক ব্যর্থতা বললেও স্বীকার করেন, প্যারিস চুক্তি ছাড়া বিশ্বের আর কোনো উপায় নেই। অ্যাকশনএইড নেপালের নির্বাহী পরিচালক সুজিতা ম্যাথেমা হিমবাহ ধসের পর ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি জানান, ধনী দেশগুলোর সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে অসহায় মানুষ। তবে তিনি মনে করেন, কপ সম্মেলন নিজেদের দাবি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এবং কাগজে-কলমে থাকা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ নিলে এমন বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।
সূত্র: গার্ডিয়ান
